ভোলতেয়ার : অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর

Send
দিলওয়ার হাসান
প্রকাশিত : ০৮:২৯, নভেম্বর ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:৩১, নভেম্বর ২১, ২০২০

ভোলতেয়ারের প্রতিকৃতি অ্যামাজন ডট ইউকের সূত্রে প্রাপ্তভোলতেয়ার ছিলেন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক, কবি ও দার্শনিক। তাঁর একটিমাত্র বই ‘কাঁদিদ’ আধুনিক বিশ্বকে সমৃদ্ধ করে চলেছে। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা যেটিকে গ্রেট বুকস অব দ্য ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড-এ অন্তর্ভুক্ত করেছে। বিশ্বের নামকরা সব বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বই পাঠ্য। জোসেফ হেলার, টমাস পিনচন, টেরি সাউদার্ন, কুর্ট ভোনেগাটের মতো লেখককে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছে এ বই। অষ্টাদশ শতকের ইউরোপে রাষ্ট্রিক, সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনে ভোলতেয়ার যে সার্বিক অধঃপতনের নগ্ন ও বীভৎস রূপ প্রত্যক্ষ করেছিলেন, ‘কাঁদিদ’ বা ‘আশাবাদ’ তারই প্রতিচ্ছবি। সমালোচকগণ বলেছেন : জনাথন সুইফটকে অনুসরণ করে ভোলতেয়ার একটি আষাঢ়ে গল্পের পটভূমিকায় ফরাসি ক্ষয়িষ্ণু সমাজের মূঢ়তা, লোভ-লালসা আর স্বার্থপরতাকে প্রচণ্ড বিদ্রুপের সঙ্গে আঘাত করেছেন—যাতে মানুষ আত্মসমীক্ষায় উদ্ভুদ্ধ হতে পারে।

অলডাস হাক্সলির ‘ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড’, জর্জ অরওয়েলের ‘নাইনটিন এইট্টিফোর’ আর ইয়েভগেনি জামিয়াতিনের ‘উই’, ‘কাঁদিদ’ প্রভাবিত রচনা।

ভোলতেয়ার বিশেষজ্ঞ হেডেন ম্যাসন বলেছেন, স্যামুয়েল বেকেটের ‘ওয়েটিং ফর গোডো’ও ‘কাঁদিদ’ প্রভাবিত নাট্যকর্ম। বেকেট নিজেও স্বীকার করেছেন সে কথা। কাঁদিদের প্রভাবে রচিত হয়েছে বেশকটি উপন্যাস।

অর্থহীন আসাম্য, অসমাঞ্জস্য ও অবিচারপূর্ণ পৃথিবীর এই নিরাশাব্যঞ্জক বিবরণের ইতি টানতে গিয়ে ভোলতেয়ার বলেছেন, আসল সত্য কী, জীবনের রহস্য কী—এই সব গুরুভার বিষয় নিয়ে মানুষ মাথা না ঘামিয়ে যদি নীরবে তার নিজের কাজটি করে যায়, তাহলেই সে সুখী হতে পারবে। ‘কাঁদিদ’-এর শেষ কথা ছিল : নিজের বাগান চাষ করো।

ভোলতেয়ার নিজেও খুব কাজ করতেন। ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে বেঁচে ছিলেন দীর্ঘ চুরাশি বছর। সব সময় কাজ নিয়ে থাকতেন। তিনি বলে গেছেন : কাজ না করা আর বেঁচে না থাকা, দুয়ের মধ্যে কোনো তফাত নেই। যারা কাজ করে না তারা ছাড়া পৃথিবীর সবাই ভালো লোক। বয়স যতই বাড়ছে ততই দেখছি জীবনের সবচেয়ে বড় সম্বল কাজ, কাজে লেগে থাকা। যদি গলায় দড়ি দেয়ার লোভ সংবরণ করতে চাও তাহলে কোনো একটা কাজ নিয়ে মেতে থাক।...

জীবনে বিস্তর লিখেছেন ভোলতেয়ার। ইতিহাস, কমেডি, ট্র্যাজেডি, ছোট ও বড় কবিতা, গীত, কাহিনি, গল্প, উপন্যাস, সমালোচনা, নৈতিক ও সামাজিক বাস্তব কাহিনি, নাটক, দার্শনিক ও চিন্তামূলক রচনা, ও মহাকাব্য।

তাঁর লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য বিদ্রূপ আর শ্লেষ, পাঠককে কৌতুকে মাতিয়ে রেখে মোক্ষম কথাগুলো শুনিয়ে দেয়া। স্বচ্ছ ও ক্ষুরধার তাঁর ভাষা—বক্তব্য অব্যর্থ লক্ষ্যভেদী। ছোট আকারের লেখা ছিল তাঁর পছন্দ। বলতেন, ‘বড় বড় বই দিয়ে বিপ্লব ঘটানো যাবে না, হাতে নিয়ে ঘোরা যায় এমন ছোট ছোট কুড়ি পয়সার বই-ই ভয়ের। নীতিবাক্য রচনা করেছিলেন : একরাসোঁ লা ইনফেম—এসো জঘন্যকে ধ্বংস করি। তাঁর দৃষ্টিতে যা কিছু অবাঞ্ছনীয়—কুসংস্কার, কুযুক্তি, অসহিষ্ণুতা, অবিচার, সংগঠিত ধর্ম, সবই জঘন্য। সাহিত্য রচনা ছাড়াও সারা জীবনে নানা মানুষকে লেখা তাঁর চিঠির সংখ্যা ১০ হাজার। বৈচিত্র্যময় এ চিঠিগুলো পত্র-সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শনের অভিধা লাভ করেছে।

মানুষের সব ধরনের দুঃখ-দুর্দশা, বেদনা, যুদ্ধ, মহামারি, দুর্ভিক্ষ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাঁকে বিচলিত করেছে। বিচিত্র সব রচনার মাধ্যমে এগুলো তিনি শুধু লিখেই ক্ষান্ত হননি, নিজে উপস্থিত থেকে মানুষের দুর্দশা লাঘবে এগিয়ে গেছেন।

অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে ভোলতেয়ার সবসময়ই ছিলেন সোচ্চার। এ কারণে বরাবরই তাঁকে রাজরোষে পড়তে হয়েছে। ডাচ দ্য অরলেন্সকে ব্যঙ্গ করায় ১৭১৬ সালে তাঁকে গ্রেফতার করে তুলো শহরে নির্বাসন দেয়া হয়। বছরখানেক নির্বাসন দণ্ড ভোগের পর পারীতে ফিরে আসেন। ১৭১৭-তে আবার গ্রেফতার করা হয় তাঁকে, অভিযোগ—বিদ্রোহমূলক কবিতা রচনা। কিন্তু জেল ও নির্বাসন তাঁর ব্যঙ্গ বিদ্রূপে শাণিত কলমকে থামাতে পারেনি।

১৭২৬ সালে তাকে গ্রেফতার করে বাস্তিল দুর্গে অন্তরীণ করা হয়। তবে দেশ ছেড়ে ইংল্যান্ডে চলে যাবেন এই শর্তে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মুক্তি দেয়া হয় তাঁকে। তিনি পাড়ি জমালেন ইংল্যান্ডে। গিয়ে দেখলেন, মত প্রকাশ ও চিন্তার স্বাধীনতা আছে ও-দেশে। তারা জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে নয় মোটেও। ফ্রান্সের সঙ্গে ইংল্যান্ডের পার্থক্য আকাশ-পাতাল। সেখানে ইংরেজি সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটল। খুব অল্প সময়ের মধ্যে রপ্ত করে ফেললেন ইংরেজি ভাষা। তিন বছর নির্বাসনে থেকে ১৭২৯-এ আবার ফিরে এলেন ফ্রান্সে। লিখলেন ‘লেটার্স অন ইংল্যান্ড’। ফরাসি গির্জা ও সরকার ক্ষিপ্ত হলো তাঁর ওপর। পারী ছাড়তে বাধ্য করা হলো তাঁকে। বলা হলো বইটি কুৎসাপূর্ণ, ধর্ম আর নীতি-বিরোধী, রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধাহীন। পারীর পার্লামেন্টে প্রকাশ্যে বইটি পুড়িয়ে ফেলার হুকুম জারি করা হলো।

ভোলতেয়ার এবার চলে গেলেন ছোট্ট শঞর কিরেতে। আশ্রয় নিলেন বান্ধবী ও প্রণয়িনী এমিল দ্যু শাৎলের বাড়িতে। বিবাহিত নারী। ২৮ বছর বয়সের স্বামী মার্কুইস দ্য শ্যাটেল ছিলেন বেরসিক ধরনের এক মানুষ। দর্শন, অঙ্কশাস্ত্র আর পদার্থবিদ্যায় পারদর্শী স্ত্রীর জ্ঞান-গম্ভীর ধাতটা ভালো লাগত না তার। ফলে তার হাত থেকে মুক্তির পথ খুঁজতেন সব সময়। স্ত্রী ভোলতেয়ারের সঙ্গে ভিড়ে যাওয়ায় কিছুই মনে করলেন না তিনি। তাছাড়া নারীদের প্রেমিক গ্রহণ সে যুগে নীতিবিরুদ্ধ বলে বিবেচিত হতো না।

শাৎলে ছিলেন অসাধারণ এক নারী। নিউটনের প্রিন্সিপিয়া টীকা ভাষ্যসহ অনুবাদ করে পাণ্ডিত্য আর গভীর জ্ঞানের পরিচয় দিয়েছিলেন। ভোলতেয়ার তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন : তাঁর সবকিছুই সুন্দর—চেহারা, রুচি, চিঠি লেখার স্টাইল, তাঁর কথাবার্তা, তাঁর নম্রতা। তার আলাপ আলোচনা ছিল মধুর ও কৌতূহলোদ্দীপক।

শাৎলে বলতেন, ভোলতেয়ার ভালোবাসার জন্যে সবদিক থেকেই উপযুক্ত। এই দম্পতি মিলে বিজ্ঞান চর্চা করতেন। সাহিত্য রচনা, নাট্য প্রযোজনা আর ইতিহাস গবেষণা করে অতিবাহিত করতেন মূল্যবান সময়। ২১ হাজার বইয়ের একটা গ্রন্থাগার গড়ে তুলেছিলেন দু’জনে মিলে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, এতকিছুর পরও শেষ পর্যন্ত ভোলতেয়ারের প্রতি নিবেদিত রইলেন না শাৎলে। ১৭৪৮ সালে জঁ ফ্রাঁসোয়া সন্ত ল্যাম্বার্ট নামে এক যুবকের প্রেমে সমর্পিত হলেন। গর্ভবতী হলেন অল্পকিছু দিনের মধ্যে। ১৭৪৯ সালের ১০ সেপ্টেম্বর সন্তান জন্ম দেয়ার সময় মারা গেলেন। বয়স তখন ৪৩। তিনটি সন্তানের জননী।...

ভোলতেয়ার সম্পর্কে উইল ডুরান্ট তাঁর ‘স্টোরি অব ফিলসফি’ গ্রন্থে লিখেছেন : ‘তাঁর দেশ ও তাঁর কালের কোনো দোষ থেকেই মুক্ত ছিলেন না ভোলতেয়ার—অধিকন্তু ছিলেন অপ্রিয়, কুৎসিত, দাম্ভিক, বাচাল, অশ্লীল আর ন্যায়-অন্যায় বোধহীন, এমনকি সময় সময় অসাধু কর্মেও তাঁর আপত্তি ছিল না। অথচ এই ভোলতেয়ারই আবার ছিলেন অক্লান্তভাবে সদয়, বিবেচক, নিজের শক্তি আর অর্থের ব্যাপারে উদার আর অমিতব্যয়ী, শত্রু-দমনে যেমন ছিলেন অদম্য অধ্যবসায়ী তেমনি ছিলেন বন্ধুদের সাহায্যের ব্যাপারেও। কলমের এক খোঁচায় যেমন শত্রুকে করে দিতে পারতেন খতম তেমনি বিপক্ষ একটুখানি আপসের ভাব দেখালেই মুহূর্তেই গলে যেতেন। মানুষ এতই স্ববিরোধী।’...

১৬৯৪ সালের ২১ নভেম্বর পারীর এক সচ্ছল পরিবারে তাঁর জন্ম। দ্বার পরিগ্রহ করেননি। কোনো উত্তরাধিকারী না রেখেই মারা যান ১৭৭৮ সালের ৩০ মে।

অসাধারণ ভবিষ্যৎ বক্তা ছিলেন। ১৭৬৪-তে লিখে গেছেন : আমি যা কিছু দেখছি সবই এক বিপ্লবের বীজবপন। এ বিপ্লব অনিবার্যভাবে আসবে, কিন্তু তা প্রত্যক্ষ করার আনন্দ আমার জীবনে ঘটবে না।... 

//জেডএস//

লাইভ

টপ