X
রবিবার, ১৬ জুন ২০২৪
২ আষাঢ় ১৪৩১

প্রিয় দশ

মোস্তাফিজ কারিগর
১৭ মে ২০২৪, ১২:১৯আপডেট : ১৭ মে ২০২৪, ১২:১৯

সীতার গহনা ধোয়া রোদ

শুকনো কাশি, জবজবে সর্দি, থার্মোমিটারের মেজাজ পাশে রেখে
সীতার গহনা ধোয়া রোদ এসে পড়ছে
বিজন মাঠের থানে, পক্ষাঘাতগ্রস্ত অন্তিম আয়ুর গ্রন্থে

বয়স্ক তেঁতুল-বট, সাতভাই চম্পার লালিম লেজের পালক
কাঠবিড়ালির মলমলে ডোরাকাটা সকাল
অন্তিম সেই আয়ুর গ্রন্থ থেকে অক্ষর তুলে খাচ্ছে
মৃত্যুর ভুভুজেলা কারখানা বন্ধের হুইসেলের মতো অবিরাম
শহরের শিরা বেয়ে গ্রামান্তরে—হুজুগে রবরবে চা-ঘরের দূরদর্শনে
ধানক্ষেতের দিকে চলে যাওয়া মেঠোপথের মোবাইলে
লাফিয়ে উঠছে আর্তের ক্যানেস্তারা—
মঙ্গোলয়েড দস্যুর মতো মৃত্যুর জাড়কাটা
মানুষের রক্তে বরফকালের হিমবাহ ফেলে যাচ্ছে

মাঠের বিজনে তবু ঐ যে শ্যালোমেশিনের নির্ঝরে
দুলে দুলে রবীন্দ্রসংগীত হয়ে আছে পয়োমান্ত ধানেদের বেলা

বিজন মাঠের এই থানে, হুইলচেয়ারে বসে মৃত্যু
সীতার গহনা ধোয়া রোদ হয়ে আছে


কুমারীসীমা

হীরের দোয়াতে আঁকা কুমারীসীমা গ্রাম—রয়েছে
কন্যার কাজলের মতো, পৃথিবীর যে কোনো উপকণ্ঠেই;
আর থাকে ঘুঘু-দুপুরের মতো ভাঙা এক ব্রিজ
কুমারীসীমার সিঁথি ধরে চলে যাওয়া নদীর সাগরশ্যাওলা জড়ানো
সবুজ ক্ষতের ওপর—

বন্ধ বালিকা বিদ্যালেয়র মাঠে বাতাস একা উড়ছে...

চুপি চুপি দুপুর অনেক হলে
ভাঙা ব্রিজ পার হয়ে হিজরে ফেরিওয়ালা আসে;
চুরি কেনে, আলতা, টুকটুকে বক্ষবাস
মাপ বুঝে বুকে তুলে নেয়—
শহরে চাকরিতে যাওয়া পুলিশের অন্ধ বউ;

নিমজ্জিত দুপুরের একদিন, কুমারীসীমা গ্রাম
সিঁদকাটার শব্দ শুনে ফেলে, জেনে যায়—
হিজরে ফেরিওয়ালার চুপি চুপি বাজানো বাঁশি

তবুও দুপুর অতল হলে পুলিশের অন্ধ বউ
কুমারীসীমা গ্রাম সাথে নিয়ে রাজহাঁসের গ্রীবার মতো
দুলতে দুলতে তলিয়ে যায় বাঁশবনের অবাধ ছায়ায়


বাঁশপাতার বুকমার্ক 

রোদ হয়ে ওঠা সূর্যের আগেকার পেখম;—
হাড়ি নামানোর পরেও খেজুর গাছের কাটা জিহ্বা চুঁইয়ে
অনন্ত রস, খইফুলের মতো, ঝরে ঝরে
ঘাসেদের নিয়েরে ধোয়া পাত্রে পিঁপড়ের আহার;
রয়েছে নিঝুম গ্রন্থের পৃষ্ঠাতে তেঁতুলপাতার ঝিরি ঝিরি বর্ণমালায়
                                                   লিখিত দুপুর—
দূরান্তের ঘুঘুস্বর, ইরিবনের দুধ-ধান থেকে
বর্ণমালা শিখে
নির্ভার পৃথিবীর অবসর পড়তে পড়তে
বাঁশপাতার বুকমার্ক দিয়ে রাখলাম

খিড়কি পুকুরের ঘাটে—
সূর্যের বিকেল স্বর্ণলতা হয়ে ঝুঁকে পড়ছে,
শাড়ি-ব্লাউজ খোলা কলা থোরের মতো পিঠ
ভুস করে জেগে উঠলো

বুকমার্ক সরিয়ে
ব্রেইল পদ্ধতিতে
                    পড়ে যাচ্ছি
ঘাট থেকে কেঁপে কেঁপে আসা ঢেউ


জ্যোৎস্নার গোলাপি শিং

একশ বছর পরে গোলাপি জ্যোৎস্নার শিং বেয়ে
অনিবার্য মৃতের জন্যে খোঁড়া কবরে—রক্তচোষার মতো, লকলকে
রুপালি সরীসৃপ গা এলিয়ে ডিম ফোটাচ্ছে—বিধূর;
কানা কোনো বক, মাজারশালার ঘুমন্ত বাঁশের মাথায়
বিল-মাঠ ঘুরে খুটে সারাদিন, এনে রেখেছে কান্নার এতো এই অন্ধকার

অন্ধকার ক্ষুধার্ত হয়ে কলতলা থেকে হিস হিস করতে করতে
মাগুরমাছের খাদে, মধ্যরাতময় সামান্য জলে
নেমে যাচ্ছে—হাঁটুর গভীরতায়, খেলছে বিষময়;
কাশতে কাশতে পেয়ারাগাছের পাতা জলে পচে
ভেসে উঠবে সকাল বেলা;
সন্তানের কপালে জলপট্টি নিয়ে পৃথিবী রাত হয়ে
হা-হুতাশে কামড়ে দিচ্ছে চারিপাশ

মৃত্যুর হিম মেখে রাত বারোটার বিবিসি
পৃথিবীর সমুদ্রে সমুদ্রে ডলফিন আর ঝাউঝোপের বাতাসে উতল

হাজার বছর পরেও তবে যেন জ্যোৎস্নার গোলাপি এই তাঁত
মৃত্যুর মুখে মধু দিয়ে দেবে


অন্ধকারের ভেতর হারমোনিয়াম

অন্ধকারের ভেতর কে হারমোনিয়াম রেখে গেছে?
কে বাজায় এই আঁধারপ্রহর?

দূরবর্তী না ঘুমানোদের কিছু কোলাহল এখনো
গভীর কানাকুয়োর রাতে ভাসছে
না নেভা মাটির ঘর, জ্বলছে—
পৃথিবীর আলোর একমাত্র ধ্রুবক যেন এই;
আর কোনো এক মুঠোফোনে ভীত ও গোপন তরুণ তাপ
ছলকে ঝড়ছে
                  পৃথিবীর রাতের শিয়রে
শিউলির শাদা নিয়ে, থর থর বিন্দুরা;
বন্ধ কারখানার দিকে কে ঐ ছয় পেটের চালক
অভ্যাসে ভাঙছে সাইকেলের প্যাডেল

বার বার চেইন পড়ে যাওয়া সাইকেলের
চেইন তুলে দিচ্ছে বাতাস?
ক্যারিয়ারে বাজারের থলি ঝুলিয়ে দিয়েছো
দীর্ঘশ্বাসের উনুন?

দুধের শিশুটির সহজাত ক্ষুধার বাঁশি
মায়ের ঘুমন্ত জেগে থাকার ভেতরে বাজছে


বীজ ও শস্যক্ষেত্র

নদীর নির্জনে পথ, গহিন, গুল্ম-বৃক্ষময়; ছিল সাপের শ্বাস
বাতাসে উড়ন্ত আঁধারে, প্রেতভয় নয়—ডাকাতের ছায়ারা
হাঁটার প্রতিযোগী ছিল, রাত হয়েছিলো জ্যোৎস্নাদি নিয়ে;

বন্ধুর সাথে সেই পথ হেঁটে এসেছো সেদিন, বিগ্নহীন; বালিচকের
বাবলার দাঁতে রেখে এসেছিলে মৃত্যুর পরিচিত নাম

আজ এই অবরুদ্ধ ঘড়ির শব্দের ভেতরে বসে
সেই পথের কথা ভাবছো তুমি
আর ছিঁড়ে যাওয়া রঙিন মোজা রিপু করে যাচ্ছো

রিপু হতে হতে অবলুপ্ত সূর্যভ্রমণের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছো
আঁধার হয়ে, আধেয় হয়ে

সেই নির্জন পথ, প্রমগ্ন নদী, বালিচকের অনন্তমূলে
কোনো বন্ধু নেই, তুমি একা, বীজ ও শস্যক্ষেত্র;
বাতাসে অবিরাম দুলছো সূর্যের নিত্য ডানার দিকে


মনসামঙ্গল

তোমার ঘুমের পাশে, বালিশে
কিছু ডানাহীন অভিমান শুইয়ে রেখে
পাশের ঘরে, রাতের অনন্তে
বেশ কিছুদিন মনসামঙ্গলে আছি

তোমার ঘর থেকে আমার অভিমানের দূরত্ব
সামান্য কয়েক গজের;
মাঝখান দিয়ে একটা খোঁড়া ঘড়ি
আমাদের রাতের বয়স কাঁধে
ফোঁপাতে ফোঁপাতে চলে যায়

মাঝে-মাঝেই, নিশুতি-নির্জনে, মনসা—
নাভিপদ্মে ফণা জাগিয়ে তোলে;
তোমার ঘুমের পালক থেকে
আমার বিষণ্ন পাথরের দূরত্ব সামান্য কয়েক নিশ্বাস—
মাঝখানে বিরাট বঙ্করাজের জিহ্বা
চৌদিশ কম্পিত করে লাফিয়ে ওঠে

বিষহরির গান গেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি আমি


ইশারা

ঘোড়া এসেছিল, মাঝরাতে—ঘুম যখন শরীরে রেখেছে
আলুলায়িত মোম, হেমন্তের উড়ন্ত পুষ্কর-ক্ষীর

টের পেলাম—শায়িত শরীরের পশ্চিমে, মাথার দিকে
ঘন-নিরেট, ভারী, স্থিতপ্রজ্ঞ দাঁড়িয়ে আছে কালো ছায়া;
হৃৎপিণ্ড থেকে ভয় বলক দিয়ে উঠে
পিচ্ছিল আঠায় কণ্ঠকে শাসন করে যাচ্ছে;
শরীর বোবা মালগাড়ি—শতাব্দী অতীত পরিত্যক্ত ইস্টিশনে পড়ে আছে

নিদ্রানীত নয়ন স্ফুরিত তাকালাম উপরে
আশ্চর্য—মশারির উপর হেঁটে বেড়াচ্ছে ধবধবে ঘোড়া;
ঘড়ির প্রতাপসন্নিভ কাঁটাকে দৌড়ে যাওয়ার সুযোগ না দিয়ে
খপ করে ধরে ফেললাম ঘোড়ার পেছনের দুটি পা;

ভাষার অতীতে ঢুকে কথা তার সাথে—
দু-চারটে অবলুপ্ত সভ্যতার ইতিহাস শেষে
লাসকো গুহার দেয়াল থেকে তোলে আনা পাখির চোখ
নক্ষত্র বৃষ্টির মতো ছড়িয়ে দিলো ঘরময়

আরো শক্ত করে ধরতে গেছি পা দু-টি;
বলল—আনত হও
জেনে নাও সমুদ্রে ভাসতে হলে কতটা হালকা হতে হবে

বলতে বলতে ঘরের ছাদ ফুঁড়ে সচন্দ্র আকাশের দিকে
ধবধবে ডানা ছড়িয়ে উড়ে গেলো

সকালে—বিছানায় হাড়হীন, মজ্জাহীন আমার শরীর
পোড়োবাড়ির মতো পড়ে আছে;
দূর-অচেনা দেশের রঙিন পালকের পাখিরা এসে
অন্ধ-কুঠুরিগুলোতে কুশবীজ ছড়াচ্ছে


খোলস 

লাঙলের ফলা নেই
লুপ্ত গো-পুজো, ধলেশ্বরীর শীর্ণাঙ্গ থেকে হুহু
শীতের বাতাস এসে বন-পারিজাতের বুকে
বরফ জমিয়ে যাচ্ছে

শিমফুলের ব্রাহ্মমুহূর্তে
গো গো করে এসেছে ইঞ্জিন-শকট;
অতিকর্মী পাওয়ার টিলারের
দাঁতাল দাঁতের আঘাতে মাটির মোলায়েম কণারা 
নিবিড়-সম্পর্কচ্যুত, ছিটকে পড়ছে অতি-উৎপাদনশীল মাঠে

উঠে এসেছে গাঙের শালিক
হেমন্তের মেঘ থেকে যুদ্ধক্লান্ত উড়োজাহাজ অবতরণের মতো
নেমে এসেছে বকেরা—খাদ্যান্বেষু;
                                    অনাহত তারা—
মাঠে মাঠে কীটনাশকের খালি প্যাকেটের নিচে ক্রমলুপ্ত
                                          অণুজীব বিজ্ঞান
মানুষের পায়ে চলার পথে
খোলস রেখে যাচ্ছে অভুক্ত হেলেসাপ


সন্তান

বাকুম পায়রার পেখম ফুলিয়ে
নতুন লেখা কবিতা নিয়ে কবির শিশুকন্যা
চাঁদের বাটি উপুড় করে দিয়েছে ঘরের মেঝেয়,
বিছানায় আঁকা প্রজাপতির বনে;

কবিতার এগালে ওগালে চুমু
প্রিয় পুতুলের শরীর থেকে রেশমি খুলে
পরিয়ে নিয়েছে;
অলকাতিলক এঁকে,
বনান্তরে পাখির নির্জন চোখের নদী পেরিয়ে যাচ্ছে
ব্রহ্মডাঙার মেলায়;
আলতায় আঁকা পরি কিনতে

ফেরার সময় কাঁকালে মেলার রসুই ভরা কলস
সাথে চন্দনকাঠে বাঁধানো আয়না
আর এনেছে সোনালি কাঁকই

সকালে আমলকী বনের ঝালর টপকে
রোদ প্রতিমা গড়ছে উঠোনের মৃন্ময়ী জুড়ে

দূরে, বয়স্ক চেয়ারে বসে কবি দেখছেন—
চন্দনকাঠে বাঁধানো আয়নায়
রাখিপূর্ণিমার চাঁদে ভেসে বেড়াচ্ছে কন্যা ও কবিতার মুখ

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
ঈদসংখ্যামেঘদূতের খাতা খুলেছি ।। আনিকা ইনতিসার  
ঈদসংখ্যাভিন্ন ভিন্ন মুখ ।। জুয়েইরিযাহ মউ
ঈদসংখ্যাডুবহীন, এ ভরা বাদর ।। মারুফা মিতা
সর্বশেষ খবর
এ বছর বরিশাল রুটে লঞ্চে চাপ বেড়েছে
এ বছর বরিশাল রুটে লঞ্চে চাপ বেড়েছে
বিশ্ব বাবা দিবস আজ
বিশ্ব বাবা দিবস আজ
নামিবিয়াকে হারিয়ে অস্ট্রেলিয়ার জয়ের অপেক্ষায় ইংল্যান্ড
নামিবিয়াকে হারিয়ে অস্ট্রেলিয়ার জয়ের অপেক্ষায় ইংল্যান্ড
টিভিতে আজকের খেলা (১৬ জুন, ২০২৪)
টিভিতে আজকের খেলা (১৬ জুন, ২০২৪)
সর্বাধিক পঠিত
রেমিট্যান্সের পালে স্বস্তির হাওয়া, রিজার্ভেও উন্নতি
রেমিট্যান্সের পালে স্বস্তির হাওয়া, রিজার্ভেও উন্নতি
আমরা আক্রান্ত হলে ছেড়ে দেবো না: সেন্টমার্টিন নিয়ে ওবায়দুল কাদের
আমরা আক্রান্ত হলে ছেড়ে দেবো না: সেন্টমার্টিন নিয়ে ওবায়দুল কাদের
কেমন থাকবে ঈদের দিনের আবহাওয়া?
কেমন থাকবে ঈদের দিনের আবহাওয়া?
বেনাপোলে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়, পেট্রাপোল ইমিগ্রেশনে ভোগান্তি
বেনাপোলে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়, পেট্রাপোল ইমিগ্রেশনে ভোগান্তি
‘মাস্তান’ গরুটির জন্য কাঁদছে দর্শক
‘মাস্তান’ গরুটির জন্য কাঁদছে দর্শক