X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ
সমকালীন অস্ট্রেলিয়ান গল্প

দুনিয়ার মজদুর এক হও ।। জুলি কোহ

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২২, ২০:৫৫

বেকডেল টেস্ট পাস না করা অন্যসব গল্পের মতোই এই গল্পটাও শুরু হয়েছিল গত নভেম্বরে, যখন আমি একটা ছেলের প্রেমে উথাল-পাতাল অবস্থায় লন্ডন ত্যাগ করি। সে ছিল স্বর্ণ ব্যবসায়ী। ওর সাথে আমার দেখা হয়েছিল যখন ও সিডনি এসেছিল ওর বন্ধুদের সাথে দেখা করার জন্য। সে আমাকে দেখে চোখ টিপ দেয় আর বলে, ‘আসো একবার আমার দেশে, আমি তোমাকে সবকিছু ঘুরিয়ে দেখাব।’ ওকে ভালো লাগার কোনো কারণ ছিলো না যদি-না আমার হাতে প্রচুর সময় থাকত। আমার পরবর্তী বইয়ের জন্য কাজ করতে একদম ইচ্ছে করছিল না। মনে হলো, ধুর, একটা প্রেমই করি।

হেমন্তের সুন্দর সময় তখন। ব্রেক্সিট আসি আসি করছে। আমরা মার্ক্সের কবর দেখতে গিয়েছিলাম হাইগেট সিমেট্রিতে। মার্ক্সের কবরটা চোখে পড়ার মতই বড় আর এর ওপর মার্বেল পাথরের বেঞ্চটপে ওনার মস্তকমূর্তি। একজন জার্মান টুরিস্ট মার্ক্সের কবরের পাশে অন্য একটা কবর দেখিয়ে বলছিল যে, এখানে একজন প্রখ্যাত মার্ক্সসিস্ট চিরনিদ্রায় শায়িত।

‘সবাই চায় কার্লের পাশে তার কবর হোক’ সে বলল।

‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ আমি বললাম ওর কথার উত্তরে।

আমরা ব্রিটিশ মিউজিয়ামে গেলাম। নানা দেশ থেকে চুরি করে আনা শিল্পকর্ম দেখছিলাম যা ব্রিটিশরা ফিরিয়ে দিতে রাজি হয়নি কখনো। পার্থেনন মার্বেলের মূর্তিটার কাছে যেতেই বেনিয়া আমার দিকে ফিরে বলল, ‘এই মূর্তিটা এথেন্স থেকে যে চুরি করেছিল ওর নাম ছিলো লর্ড এলিগিন। ওর ছেলে যার নামও লর্ড এলিগিন, সে বেইজিংয়ের গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ পুড়িয়ে দিয়েছিল।’

‘এই এলিগিনদের বংশধর কেউ আছে নাকি এখানে?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম ওরে। ‘শোনো, একটা মজার কথা বলি, বেনিয়া আমারে বলল। আমার দাদার দাদার দাদা ছিল ব্রিটিশদের অফিসার, সে আসলে ছিল তোমাদের প্রাসাদ পুড়িয়ে দেওয়ার দলে। আমার আসলে এই জন্য নিজেরে কিছুটা অপরাধী লাগছে।’

ও আমার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন আমি ওর দাদার এই অপরাধের একটা সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করব। আমি কিছুই না বলে ক্রিস্টিয়ান রীতিতে ক্রসচিহ্ন আঁকলাম।

‘এটা খুবই মজার হতো যদি তোমার কোনো চায়নিজ বংশধর তখন ঐ প্রাসাদে থাকত।’

‘আমার মনে হয় না আমার বংশের কেউ প্রাসাদের কাছাকাছি থাকার মতো লোক ছিল।’

‘তুমি কি তোমার পরিবারের কিসসা-কাহিনি কিছু শুনছ কারো কাছে?’

‘আমরা তো হয় প্রাসাদে ছিলাম না হয় জেলখানায়, তাই না? আমি আমার দাদার আমলের পরিবার সম্পর্কে খুব একটা কিছু জানি না। আমার এক চাচাত দাদা ছিল, যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হারিয়ে গিয়েছিল। আমি শুনছি সে সম্ভবত খুন হয়ে গিয়েছিল, এটা মালেশিয়ার ঘটনা যদিও। ওনারই আমার দাদিকে বিয়ে করার কথা ছিল। যখন তিনি নিখোঁজ হয়ে গেলেন, তখন আমার দাদি তার ভাইকে বিয়ে করল মানে আমার দাদাকে। আমি এইটুকুই জানি। আমি ওনাকে নিয়ে ভাবি কখনো কখনো... কেমন ছিল ওনার জীবনযাপন।’

‘ও মনে হয় ব্রিটিশ মালয়া ছিল, ঠিক না?’ বেনিয়া বলল। ‘অবশ্য ১৯৫৭ সালের আগে তো মালয়েশিয়াই ছিল না।’

‘হ্যাঁ, ৬৩,’ আমি বললাম। ‘যাক বাদ দাও, এত চুলচেড়া বিচারের দরকার নাই।’

এরপর সে একটা ট্যাক্সি ডাকল আমাদের জন্য। ‘তুমি কোথায় নামবে?’ সে জিজ্ঞেস করল আমাকে। তারপর সে তার ফোন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আমাকে আমার হস্টেলের কাছে নামিয়ে দেওয়া হলো। এখানে এসেই ‘বেনিয়া পর্বের’ শেষ হয়েছিল।

এই শহরে আর খুব একটা কিছু দেখার আছে বলে মনে হচ্ছে না। আমার জন্য ভালো হয় যদি ঘুরে ঘুরে বিখ্যাত লোকদের সমাধিক্ষেত্রগুলো দেখি কিংবা তাঁদের পুরোনো বাসস্থান। আমি প্লাথ যেখানে ডুবে গিয়েছিল সেই জায়গা দেখতে গিয়েছিলাম, যেখানে অরওয়েল, ডিকেন্স আর ক্রিস্টি থাকত, যেখানে থলকেইন আর দালির কবর, যেখানে কেনট্ শুয়েছিল তার সবুজ বিছানায় অসুস্থ হয়ে। এই সব করছিলাম আর ভাবছিলাম বিখ্যাত লেখকদের শেষবিন্দুতে ঘুরে ঘুরে আমি আমার লেখার প্রতি ভালোবাসাকে ফিরিয়ে আনব।

আমি পুরোনো শহর স্পেইটাল বাজারে গিয়েছিলাম, যেখানে কবির নামের এক গণকের সাথেও দেখা করলাম। যে ‘টার্ট কার্ড’ পড়ে বলে দিতে পারে আপনার ভবিষ্যৎ। আমি তাকে বললাম, আমি লিখতে পারছি না। আমার ছেলের ভাগ্যও খুব খারাপ। এই দুঃখে আমি গোরস্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছি।

‘আমার সমস্যা কী বল তো?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম ওরে।

শেষ পর্যন্ত এগুলো সবই জাগতিক ব্যাপার। নোরা এপরনের কথা চিন্তা করো না কেন!

আমি নোরা এপরনের কথা চিন্তা করলাম। সেও পরলোকেই।

এই যে দেখ, কার্ড দেখিয়ে সে আমাকে বলল, ‘এখানে আমরা দেখছি হেরমিট কে, যে একইসাথে শয়তান, বাদশা এবং ন্যায় বিচারের প্রতীক। তুমি তোমার ইতিহাস জানার চেষ্টা করো, বোঝার চেষ্টা করো কে তোমাকে আছর করে আছে, সেটাকে ঝেড়ে ফেলে সামনে আগাতে হবে। আর এরমধ্যে তোমার যদি গোরস্থানে যেতে ভালো লাগে তবে তোমাকে বলি, তুমি অবশ্যই উইলিয়াম ব্লেইকের সমাধিতে যাও। যে কবি ফেরেশতাদের সাথে কথা বলত। এটা এখান থেকে খুব একটা দূরে না।’

আমি ওর কথামতো গেলাম সেখানে। ব্লেইক শুয়ে আছে ডিফোর কাছে একটা পাথরের রাস্তা তাদেরকে আলাদা করে রেখেছে। সমাধিক্ষেত্রের পাশেই রাখা কিছু লম্বা টুপি যা পেত্নিদের টুপি হিসেবে আমরা চিনি আর আগতদের কোর্ট রাখার জন্য খুবই চকমকে কিছু কোর্ট হ্যাঙ্গার রাখা কালো মতো কিছু খুপড়িতে।

আমি ব্লেইকের সমাধিক্ষেত্রের পাশের সরু রাস্তাটায় অনেকগুলো হলুদ ঝরাপাতাকে সাথে নিয়ে বসলাম। আমি নিজের ভিতর একটা দুঃখকে অনুভব করলাম ওর কোনো লেখা না পড়ার কারণে। তবে আমি নিশ্চিত ও ভালো লেখে। আমি দেখলাম যে আমি ব্লেইকের সমাধি থেকে বড়জোর হাত তিনেক দূরে বসেছি। আমি ক্ষমাপ্রার্থনা করলাম ওর সামাধিক্ষেত্রের ওপর রাখা নামাঙ্কিত পাথরখণ্ডটিকে উদ্দেশ্য করে।

ব্রিক লেইন দিয়ে আসার সময় আমি এক জাপানি কিমোনো দোকানে ঢুকলাম, দোকানের মালিকের সাথে দেখা হলো। সে পুরোনো একটা বিয়ার ফ্যাক্টরির সামনের জায়গাটায় একটা দোকান খুলে বসেছে। সে বলল, ‘আমি তো মনে করছি তুমি এনা সু,’ আমার সমকামী বন্ধু তার খুবই ভক্ত।’

‘কেন ভাবলে এটা তুমি! যাই হোক ধন্যবাদ তোমাকে, এই প্রথম আমাকে কেউ ভুল করে স্টাইলিস্ট ভাবল।’

দোকানের র‌্যাকগুলো নানা রঙের কিমোনো দিয়ে পূর্ণ ছিল। সেগুলোর মধ্যে খুবই বিসদৃশভাবে একটা পুরোনো জ্যাকেট ঝুলে ছিল, যা অন্যগুলোর তুলনায় ছোট। সেটা ছিলো কালো সুতি কাপড়ের মাঝে লাল এবং সাদা স্ট্রাইপ সাথে সাদা মোটা অক্ষরের লেখা। দোকানি বলল, এটা এক বুড়া অগ্নি-নির্বাপক কর্মীর জ্যাকেট ছিল, এটাকে বলে ‘Shoubou Happi’ যা গায়ে দিলে তোমার আধ্যাত্মিক শক্তি বৃদ্ধি পাবে।

কলারের নিচে ডান দিকে জাপানিজ ভাষায় লেখা, ‘LEADER’ বামদিকে ‘Matsodo City Fire Brigade’ আর পেছনের লেখা ছিল বড় করে ‘MATSODO’

আমি জ্যাকেটটা গায়ে চাপালাম। পকেট থেকে ম্যানিব্যাগ বের করে যা ছিল সব দিয়ে দোকানিকে বললাম, যা আছে সব তোমাকে দিয়ে দিলাম।

দোকান থেকে বের হয়ে আমি আমার গন্তব্যের দিকে হাঁটতে থাকলাম। এক সাদা লোকের সাথে দেখা হলে সে আমাকে চোখ টিপ দিলো আর বলল, ‘Ni hao’।

সিডনি ফেরত এসে দেখলাম, বুশ ফায়ারের ধোঁয়ায় আকাশ অন্ধকার হয়ে আছে। শরীরে আমার এক ধরনের র‌্যাশ দেখা দিলো। বোগলের নিচ থেকে শুরু হলো লাল হয়ে ওঠা তারপর সারা শরীরে ছড়াতে থাকল একদম পায়ের পাতা পর্যন্ত।

ততক্ষণে রাত হয়ে গেছে। আমি আমার বাড়ির পাশের জরুরি বিভাগেই গেলাম। জরুরি বিভাগে পৌঁছাতেই চায়না থেকে আগত এক খাঁটি চায়নিজ দম্পতির সাথে দেখা হলো। মেয়েটির পরনে ডোরাকাটা শার্ট আর হাতে বুলগেরির ব্যাগ। ওর ছেলে বন্ধুটি ওর পেছন পেছন এমনভাবে আসল যেন লেজ ধরে আছে, ওর পরনে জিন্স আর বিবারের টি-শার্ট, টি-শার্টের গায়ে সাদা অক্ষরে লেখা ‘STAFF’

মেয়েটি তার তর্জনি আঙুলের যত্ন নিচ্ছিল আর কেন্টোনিজে ফিসফিস করে ছেলেটাকে ঝারি দিচ্ছিল। একজন জুনিয়র ডাক্তার এসে আমাদেরকে একটা ছোট্ট রুমে নিয়ে বসতে দিলো। তাঁরা আমাকে এন্টিহিস্টামিনের একটা মিক্সচার খাওয়াল।

বুলগেরি তখনো বিবারকে গালি দিয়ে যাচ্ছে। আমার পাশের সিটটা খালি কিন্তু বিবার আমাদের পাশে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল যেন সে আমাদের চোখের সামনে থেকে পালাতে চায়। আমার উপস্থিতি যেন তাদের মধ্যে একটা সমতা এনে দিয়েছে, আমি নিরীহ এশিয়ানদের মতই চুপচাপ ব্লেইকের কবিতা পড়ছিলাম।

আধা ঘণ্টা হয়ে গেল র‌্যাশ কমার কোনো লক্ষণ নাই। ডাক্তারও বুঝতেছিল না ঘটনা কী। সে আরো কিছু ঔষুধ আর কিছু টেস্ট ধরিয়ে দিলো।

আমার নিজের ডাক্তারও এই সম্পর্কে কিছু বলতে পারল না। সে আমাকে ব্লাড টেস্ট করতে বলল। আমাকে সে শহরের নামকরা এলার্জিস্টের কাছে রেফার করে, গ্রীষ্মের ছুটি কাটানোর জন্যে থাইল্যান্ডে চলে গেল।

এটা ছিল ডিসেম্বরের সবচেয়ে গরমের সময়টা। ব্লাড টেস্টের পর অবস্থা এত খারাপ হলো যে আমি আর বিছানা থেকে উঠতেই পারছিলাম না। সর্দি-জ্বর, মাথাব্যথা সাথে র‌্যাশের চুলকানির যন্ত্রণায় নিজেকে আর সামলাতে পারতেছিলাম না। আমি ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করছিলাম কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছিল না। সাথে একগাদা এন্টিহিস্টামিন খাচ্ছিলাম যা আমাকে আরো বেশি অসুস্থ করে ফেলছিল।

আমার মাথা কাজ করছিল না, আর এত ক্লান্ত ছিলাম যে লেখার কোনো শক্তিও ছিল না। কিন্তু টাকা তো লাগবে, সেই জন্য আমি কিছু প্রুফরিডিংয়ের কাজ করছিলাম। আমার ফ্ল্যাটমেট অন্য শহরে গেছে, কবে আসবে তার কোনো ঠিক নাই। আমার জন্য সে একটা সিলভার কালার ক্রিসমাস ট্রি রেখে গেছে। সেটা আবার মধ্য দিয়ে বাঁকা। সে নাকি এটা অফিস পার্টি থেকে মেরে দিয়েছে।

মাসাধিক পাড় করে দিলাম এই অসুস্থতা নিয়ে। নতুন বছর আসলো এবং চলেও গেল। এরমধ্যে আমি বাসা থেকে বের হইনি, মাঝেমধ্যে একটু এসির বাতাস খাওয়ার জন্য আশপাশের শপিং সেন্টারগুলোতে ঢু মেরেছি। বাইরে গেলেই আমি আমার ফায়ারম্যানের জ্যাকেটটা পরছি, এটা এখন আমার পছন্দের তালিকার সর্বাগ্রে। কখনো-বা গ্রোসারি কিনতে গিয়েছি আর নানা রকম ক্রিম, ত্বকের জন্য যার কোনোটাই কাজে লাগেনি, মাঝেমধ্যে কে-মার্ট বা টারগেটেও ঢু মেরেছি মাফিন খেতে খেতে। বাকি সময় বাসায় বিছানায় শুয়ে শুয়ে বিভিন্ন সিরিজের এপিসোডের পর এপিসোড দেখেই পার করেছি।

একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার সারা শরীরে রক্তের দাগ, বগলে, পায়ে, গলায়, মুখে সব জায়গায়। আমি ঘুমের মধ্যে কখন যে চুলকিয়ে চামড়া ছিঁড়ে ফেলছি টেরও পাইনি। আমি অনলাইনে সাদা সুতি কাপড়ের হাত মোজার অর্ডার করলাম যেন তা ঘুমের সময় পরে ঘুমাতে পারি।

হাতমোজা পরে ঘুমানো শুরু করার পর আবার শুরু হইল নতুন সমস্যা– দুঃস্বপ্ন, একই দুঃস্বপ্ন লাগাতার দেখতে থাকলাম। দেখি কী, সারা দুনিয়াতেই আগুন, তার মাঝে একটা ঘরের মধ্যে একটা কাঠের প্রকোষ্ঠে আমি আটকা পড়ছি সারা গায়ে কাঁপুনি নিয়ে আমার ঘুম ভাঙত, তারপর আর ঘুমাতে পারতাম না। প্রত্যেক দিন ভোর ২ থেকে ৪ পর্যন্ত পত্রিকার আর্টিকেল পড়তে আমি অভ্যস্থ হয়ে গেলাম। একটা আর্টিকেলে দেখলাম লন্ডন শহরের হিউস্টন স্টেশনে নতুন লাইন করার জন্য খোঁড়াখুড়ি করতে গিয়ে আবিষ্কৃত হয়েছে ম্যাথু ফ্লিন্ডারসের কবর। মনে মনে ভাবি এই ছাতার মাথা পড়ার লোকও আছে দুনিয়াতে। এই লোক রবিনসন ক্রুশোর সাথে সমুদ্র পাড়ি দিয়েছিল।

কয়েকদিন পর আমাদের ফ্ল্যাটের যে মালি সে মারা গেল। বিল্ডিংয়ের কোথাও কোনো একটা ইট যা খুবই বাজেভাবে গাঁথা ছিল তা খুলে পড়ে সে মারা গেল। এই লোকের বদলে আর একজনকে চাকরি দেওয়া তো বেশ সময়ের ব্যাপার তাই আমার জানালার পাশের ঝোপ একদম জঙ্গলে পরিণত হচ্ছে। নতুন ডাল-পাতা দ্রুত বেড়ে একদম আমাকে অন্ধকার করে দিচ্ছে।

মধ্য ফেব্রুয়ারিতে এলার্জি স্পেশালিস্ট তার চেম্বার ওপেন করল। এরিমধ্যে আমার র‌্যাশগুলো অনেকগুলো গোল বৃত্ত তৈরি করল কিন্তু চুলকানি আগের মতই থাকল। স্পেশালিস্টের চেম্বারের দেয়ালের মধ্যে একটা হাতে আঁকা ছবি ঝুলে আছে তার ওপরের ভাগে লেখা “OXFORD”। সে আমার ব্লাড টেস্ট করে দেখল, তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু পেল না। ‘এই চুলকানি মনে হচ্ছে না সহজে তোমাকে ছেড়ে যাবে’ সে বলল।

‘এক কাজ করো প্রেম করো ওর সাথে তারপর বিয়ে করে ফেলো।’ সে আমাকে তার দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে মজা করে বলল।

আমি তো দেখি আমার অসুখের সাথে প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গেলাম।

সেই রাতে অন্য আর এক চুলকানি শুরু হলো। ৩টার দিকে আমার ঘুম ভেঙে গেল এক অজানা আওয়াজে। তেলাপোকা বা ইঁদুর হলে এত আওয়াজ হওয়ার কথা না, মনে হচ্ছে যেন মানুষ তার বড় বড় নখ দিয়ে কোনো কিছু আঁচড়াচ্ছে। বেডরুমের লাইট জ্বালালাম। আঁচড়ের আওয়াজটা আসছিল আমার ওয়ারড্রোবের ভিতর থেকে। মনে হচ্ছে কেউ একজন হামাগুড়ি দিয়ে আগাচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে। আমি ওয়ারড্রোবে ধাক্কা দিলাম, থেমে গেল। কিছুক্ষণ পর আবার শুরু হলো। আবার ধাক্কা দিলাম, থেমে গেল।

তারপর থেকে প্রত্যেক রাতে একই সময়ে এই বাজে আওয়াজটা আমার ঘুম ভেঙে দিতে লাগল। আওয়াজটা ক্ষণে ক্ষণে জায়গা বদল করছিলে, কখনো দরজার পেছনে, কখনো ড্রেসিং টেবিলের মধ্যে, কখনো-বা ড্রয়ারে আওয়াজ হতে থাকল। আমি ভালো করে সবকিছু দেখলাম, ড্রয়ারে তো কাপড়ের গাট্টি ছাড়া আর কিছুই দেখলাম না।

তারপর এটা শুরু হলো আমার ম্যাট্রেসের ভিতর। যাই থাকুক ভিতরে মনে হচ্ছে স্প্রিংগুলোকে তুলে ফেলার চেষ্টা করছে।

আমি বিছানা ছেড়ে সোফায় গেলাম। এবার মনে হচ্ছে আমার ফ্লোরের নিচে কেউ আঁচড়াচ্ছে। আমি সবগুলো লাইট জ্বালিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। এটা যাই হোক আমি ওটাকে দেখতে চাই। তারপর শুরু হলো লাইট ফিউজ হওয়া, একটার পর একটা। প্রথমে গেল আমার বেডরুমমেট, তারপর গেল আমার ফ্ল্যাটমেটের রুমেরটা। বাথরুম আর রান্নাঘরেরটা দুই বার করে গেল। চার রাত পর দেখলাম একমাত্র আমার সোফার পাশের লাইটটা ছাড়া সবই ফিউজ হয়ে গেছে।

আবার বাল্ব কিনে আনলাম, সাথে ব্যাটারি দিয়ে চলে এমন চড়ুই পাখির মতো ডিমলাইটও। চড়ুইপাখির চোখগুলো যেন আমাকে দেখছিল। ধাম করে ল্যাম্প জ্বলে গেল, একই সাথে ডিমলাইটও।

একটা থিউরি আবিষ্কার করে আমি খুবই মজা পাচ্ছি, হয় আমাকে ভূতে ধরছে না হয় আমার ছোটবেলার সুপারহিরো আমার স্কন্ধে ভর করছে। আমি এই কথা আমার বন্ধু কাজুমিকে বললাম। সে বুধবার কাজের শেষে আমার বাসায় আসলো কিছু লোশন নিয়ে তার ধারণা এইগুলো কাজে লাগতে পারে। সে আবার ফার্মেসিতে কাজ করে। তার একটা সাদা বস আছে যে ওকে জাপানিজ স্টাইলে বো করতে পছন্দ করে আর ‘ম্যাডাম মাও’ বলে ডাকে।

‘তুমি কি কোনো শ্মশান-টশানে গিয়েছিলে নাকি?’ রান্নাঘরের টেবিলে তার সিগারেট রোল করতে করতে আমাকে জিজ্ঞেস করল। আমার তো মনে হচ্ছে তুমি কাউকে সাথে করে নিয়ে আসছ তোমার ট্রিপ থেকে।

‘হ্যাঁ, কোনো কোনো গোরস্থানে গিয়ে আমার খারাপ লাগছে কিন্তু সবগুলোতে না।’

‘তুমি গিয়েছ ছুটি কাটাতে, সেখানে গিয়ে তুমি গোরস্থানে সময় কাটিয়েছ?’

‘যদি মার্ক্স আমাকে ফলো করে থাকে তো ব্যাটা ধরা খেয়েছে।’

‘জ্যাকেট যেটা পরে আছ এটার কাহিনি কী? কত পুরান এটা?’

‘হট, তাই না? আমি এটা লন্ডনের একটা পুরান জিনিসের দোকান থেকে কিনেছি।’

‘ও মাই গড, জুলি!’

‘তোমার কি মনে হয় এটার মধ্যে ভূতের আছর আছে?’

‘ধুর্ আমি তা কীভাবে বলবো, আমি জানি নাকি!’

‘এই হলো আমার ভাগ্য বুঝছ, চাইলাম একটা জ্যান্ত জোয়ান, পাইলাম এক ঘাটের মরা।’

জাপান থাকে এমন এক ফ্রেন্ডের গল্প বলছিল কাজুমি। তারা একজন আর একজনকে চিনে যখন তাদের বয়স চার।

সে পুরোনো পুতুল আর জাপানিজ ড্রেস ‘কিমনো’ সংগ্রহ করত। সে বুঝতে পারে যদি কোনো কিছুতে কোনো খারাপ নজর থাকে। এই দেখো না কয়েকদিন আগে সে একটা কিমোনো কিনছে ই-বে থেকে। সেটা আসছে একটা কাচের বাক্সে করে। জিনিসটা দেখে ওর ভালো লাগেনি। ও চেষ্টা করছিল ফেরত দিতে কিন্তু বিক্রেতা সেটা ফেরত নিল না।

কাজুমি ওর গ্লাসেই সিগারেটের ছাই ফেলল।

‘একবার সে একটা ‘ইচিমাতসু’ পুতুল কিনল, তুমি চেন এটা? ওটা দেখতে শিশু পুতুলের মতো এবং পরনে থাকে কিমোনো ড্রেস এবং এই পুতুল খুবই দামি শুধু বড়লোকরাই এটা কিনতে পারে। ফালতু এক কিম্ভূতকিমাকার পুতুল, দেখলেই ভয় লাগে। পুতুলটা একটা বাক্সে করে আসছিল। সে যখন পুতুলের চোখের দিকে তাকাল তখনই বুঝতে পারল যে খারাপ একটা কিছু আছে এটার সাথে। সে পুতুলটার কিমোনো খুলতেই দেখল বুকের মধ্যে একটা ভূতুড়ে নখ বিঁধে আছে। সে এটা একজনকে দিয়ে দিলো, এটা ভূতুড়ে জানা সত্ত্বেও তারা এটা নিতে আগ্রহী হলো। তাঁরা ওকে টাকাও দিতে চেয়েছিল কিন্তু সে টাকা নেয়নি। আমার বন্ধুটা কিন্তু ভূত ভয় পায় না, সে নিজেও একটা ভূত পালে ছোটবেলা থেকেই। একবার সে টের পেয়েছিল একটা পুরুষমানুষের হাত তাকে স্পর্শ করতেছে ওর বিছানায়। এই কথা যে তার মাকে বছরখানেক বলেনি। এক বছর পর যখন ওর মাকে বলল, তখন ও মা বলল যে এই একই হাত ওনাকেও স্পর্শ করেছিল।

‘চুলায় যাক্ কাজুমি, আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে, বুঝছি আমার আর ঘুমানো হবে না।’

কাজুমি ওর ফোন বের করে গুগুল করল ‘মাতসুডু সিটি ফায়ার ব্রিগ্রেড।’

‘এটা প্রতিষ্ঠিত হইছে ১৯৪৮ সালে, যুদ্ধের পর। জ্যাকেটে কিন্তু কোনো সন তারিখ লেখা নাই। কোনো ব্যাটা যে তোমাকে ধরছে বোঝা মুশকিল। এই সময়ে তো পাশে থাকার মতো কাউকে পাওয়াই যায় না। এই লোক নিশ্চয়ই তোমাকে সহজে ছাড়বে না।

আমার এক চাচা ব্যবসার কাজে কুয়ালালামপুর থেকে সিডনি আসছে। সে আমার সাথে দেখা করতে চায়। আমি ফ্ল্যাট থেকে নিজেকে কোনো রকমে বের করে সিটিতে যাওয়া একটা ট্রেনে উঠে বসলাম মধ্যরাতে কফি খেতে তার হোটেল লাউঞ্জে।

‘আমার মনে হয় আমি একটা ভূত নিয়ে আসছি লন্ডন থেকে’ আমি তাকে বললাম যখন সে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে দেখছিল আমার বাহু চুলকানো। এটা আমি একটা জ্যাকেটের সাথে ফ্রি পেয়েছি।

বিষ্ময়ে তার চোখ গোল হয়ে গেল।

‘হ্যাঁ! লন্ডন, তোমার উচিত এটা জি জংকে জিজ্ঞেস করা’ সে চায়নিজ গডের কথা বলল। তোমার চাচি আজকে প্রার্থনালয়ে যাবে। আমি তাকে হোয়াটস্ আপে জানাচ্ছি। সে তোমাকে কল করবে যখন গডের কাছাকাছি যাবে।

চাচা মোবাইল বেক করে তখনেই টেক্সড পাঠাল।

এরিমধ্যে সে আমাকে বলল, ‘তোমার জন্য আমি একটা জিনিস এনেছি।’

তার হাতে একটা মোড়ানো কাগজ। সে এটা খুলে কফি টেবিলে রাখল। আমরা সবদিক থেকে টি-লাইট ফেললাম ওটার ওপর। এটা মালয়েশিয়ায় আমাদের পারিবারিক গোরস্থানের নামফলকের ফটোকপি, যা সে কিছুদিন হলো লাগিয়েছে। এই নামফলকে আছে আমার মাতার দিকের ৫ হাজার বছরের চায়নিজ ইতিহাস।

‘তুমি পশ্চিমে এসে যুদ্ধ করছো’, চাচা বলল আমাকে। ‘তুমি তো জানই না ওরা তোমার ফ্যামিলিকে কী করছে।’

সে তার রিডিং গ্লাস পরলো, আমরা খুব মনোযোগসহ দেখতে লাগলাম। সে আমাকে বোঝাচ্ছিল, রাজা এমন একটা কিছু, সিল্করোড সাথে একটা কিছু, মিলিটারি জেনারেল সাথে অন্যান্য এভাবে চলতে থাকলে পুরোরাতেও শেষ হবে না।

আমরা কি শেষের দিকে দেখতে পারি? আমি চাচাকে জিজ্ঞেস করলাম। সে আমারে তার চশমার ফাঁক দিয়ে দেখল। মনে হলো খুশি হয়নি। ‘আমার হারিয়ে যাওয়া দাদার সম্পর্কে এখানে কি কিছু আছে?’

চাচা আঙুল একদম শেষের দিকে নিয়ে গেল।

সে শিশু বয়সে চায়না থেকে এসেছিল ব্রিটিশ মালয়ে। কিন্তু যখন সে বড় হচ্ছিল তখনই জাপান চায়না দখল করে নেয়। সে তখন হাইস্কুলে পড়ে। সে একটা ফান্ড রেইজিং করছিল চায়নাকে সাহায্য করার জন্য, যেন চায়না তার ফাইট চালিয়ে যেতে পারে। ব্রিটিশ মালয়ের সমস্ত লোকজনই ওর এই উদ্যোগটাকে খুব পছন্দ করল এবং তাকে ছাদখোলা গাড়ির মধ্যে বসিয়ে তারা ডোনেশন কালেক্ট করতে শুরু করল। ব্রিটিশ, যারা ব্রিটিশ মালয় কন্ট্রোল করতো তারা তোমার দাদার মতো লোকজনকে এরেস্ট করা শুরু করল।

‘এই সামান্য চুনোপুঁটিদের প্রটেস্টে ওরা এত বিরক্ত হলো কেন?’ আমি জিজ্ঞেস করি ওনাকে। ‘প্রতিবাদ তো আর ওদের বিরুদ্ধে ছিল না আবার জাপানকে ওরা পছন্দও করত না।’

চাচা আমার দিকে তাকাল।

তারা খুবই অদূরদর্শী, ওরাও তো সব সময় ভয়ের মধ্যে থাকত যদি আবার ওদের রাজ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। শেষমেশ ওরা তোমার দাদা আর সাথের চায়নিজদেরকে মালাক্কা নদীতে একটা নৌকার মধ্যে বন্দি করে রাখে। তোমার দাদা তার মাকে বলছিল, মা তুমি আমার জন্মধাত্রী, কিন্তু আমি চায়নার সন্তান। আমার জন্য দুঃখ পেয়ো না। চায়নিজ কখনো চায়নাকে অন্যের হাতে তুলে দেবে না। আমি আমাকে কোরবানি দেবো, এটা খুব বীরত্বব্যাঞ্জক যে আমি আমার দেশের জন্য জীবন দিচ্ছি।

নৌকাটি চায়নিজে ভর্তি। সবাই চায়নিজ গান গাইছিল। গান যখন শেষ হচ্ছিল তখন ওরা চিৎকার করে ওদের মা-বাবাকে বলছিল, ‘তোমরা কোনো চিন্তা করো না, আমার জাপনিদেরকে হারিয়ে বাড়ি ফিরব।’

সারা রাতে নৌকাটা সিংগাপুরে গিয়ে পৌঁছাল। সেখানে তাদের জেলে পোরা হলো। তারপর তাদেরকে হংকংয়ে পাঠানো হলো। সেখানে তোমার দাদা যুক্ত হয়েছিলে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে। নৌকায় যারা ছিল তাদের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হলো। তোমার দাদাকে পাঠানো হয়েছিলো চংগিং জেলায়, সেখানেই তিনি জাপানিজদের সাথে যুদ্ধরত অবস্থায় শহিদ হন।

আমার চাচা তার আঙুলটা একটা চরিত্রের ওপর এনে রাখল।

‘উনি ছিলেন, কিভাবে আমি তোমাকে বলি?’ সে ট্রান্সলেশন অ্যাপস ওপেন করল সঠিক শব্দটা খুঁজে পাওয়ার জন্য। ‘An anomymous Martyr’ উনি শহিদ হয়েছিলেন অজ্ঞাত এবং অখ্যাত অবস্থাতেই। কেউ কোনো দিন জানতে পারেনি যে উনি শহিদ হয়েছিলেন ওনার দেশের জন্য। ক্রমান্বয়ে জাপানিরা ব্রিটিশ মালয়ও দখল করে নিল। ওরা চায়নিজ শিশুদের শূন্যে ছুড়ে মেরে বল্লম দিয়ে গাঁথত।

আমি দেখছিলাম আমাদের সাদা ওয়েট্রেস পাশের টেবিলে চা পরিবেশন করছে। আমার মনে হচ্ছিল আমি বোধ হয় এখনই কেঁদে ফেলব।

‘যাই হোক, অন্তত দুটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি লেগেছিল ওনাকে হত্যা করতে’, আমি বললাম।

আমার চাচার ফোন বেজে উঠল, যা ছিল ভিডিওকল। সে আমার চাচিকে বুঝিয়ে বলল, তারপর ফোনটা আমাকে দিলো হেডফোনসহ। উনি আমাকে হাত নাড়িয়ে শুভেচ্ছা জানাল। উনি ক্যামেরা ফোকাস করল উপাসনালয়ের মধ্যখানে। সেখানে দেখা যাচ্ছে একজন লোক চোখবুজে মোরাকাবার ভঙ্গিতে বসে আছে যে কিনা জি জংয়ের সাথে ডাইরেক্ট যোগাযোগ করবে।

‘তাড়াতাড়ি, তুমি তোমার প্রশ্ন জিজ্ঞেস করো’ উনি বলল, ‘আমার পিছনে কিন্তু লম্বা লাইন।’

আমাদের জন্য দ্বিতীয় দফায় ফ্ল্যাট হোয়াইট কফি নিয়ে আসলো ওয়েটার, যখন আমি হোয়াটস্ অ্যাপে কথা বলছিলাম গডের সাথে। আমি আমার এই অদ্ভুত অসুখের কথা জিজ্ঞেস করলাম। আমার চাচি তা চায়নিজে রূপান্তর করে দিচ্ছিল।

‘জ্যাকেটটাই নিশ্চিত সমস্যার মূলে’ সে বলল। তোমার একটা সিক্স-সেন্স আছে কিন্তু এটা এখনো পুরো মাত্রায় পোক্ত হয়নি। তুমি বড় রকমের বোকাই রয়ে গেছ, যেখানেই যাও সেখান থেকেই ভূত নিয়ে আসো যা তুমি নিজেই দেখতে পাও না। যা তোমার না তা তুমি আন কেন?

‘জিনিসটা জোশ ছিল,’ আমি মৃদুস্বরে বললাম।

সে কিভাবে এই শয়তানের আছর থেকে মুক্ত হওয়া যাবে তার পথ বাতলে দিচ্ছিল। ওনারা দুইজনই খুব মনোযোগের সাথে কথা বলছিল।

‘আমি কি এটা নিয়ে একটা গল্প লিখতে পারি?’

‘গল্প! তুমি কি খালি এটাই চিন্তা করতে পার?’

গড চুকচুক করতেছিল।

‘আসলে আমি একটু বেশিই দেরি করে ফেলছিলাম,’ আমি বললাম। এখন আমি মরিয়া এই ভূতের কবল থেকে বের হওয়ার জন্য। আচ্ছা আর একটা কথা, উইলিয়াম ব্লেইক ফেরেশতাদের সাথে কথা বলতে পারে, আমি কেন পারি না?’

‘আমি শুধু ভূতের দেখা পাই আর কেবল দেরি করে ফেলি,’ এই বলে চাচি আমাকে ভেঙালো। তুমি কি নৌকাতে করে চায়না যাচ্ছ মরার জন্য? তা তো না।’

উনি আমার দিকে একটা তীক্ষ্ণদৃষ্টি দিলো ফোনের মধ্যে দিয়ে আর চেহারায় ফুটিয়ে তুলল একটা বিরক্তি।

‘শোনো উনি তোমাকে দুই বছর কোনো গোরস্থানে যেতে নিষেধ করেছে। তোমার জাপানিজ ফায়ার ফাইটার তো আছেই। আর কোনো ভূত আনতে চাও?’

এবার একটা দক্ষিণ আমেরিকান চাই।’

এটা মার্চের প্রথম সপ্তাহ, চরম গরম পড়ছে। আমার চামড়া খুব যন্ত্রণা করতেছে। মনে হচ্ছে সাপের মতো চামড়া বদলিয়ে ফেলি, পুরাতনটা ফেলে দিয়ে একটা নতুন লাগিয়ে নেই। আমার চাচির নির্দেশ মোতাবেক বাইরে লনের ওপর জ্যাকেটাকে ওপর দিকে মুখ করে শোয়ালাম।

‘এটা তুমি না, এটা আমি,’ বললাম আমি।

আমি এটা সাতদিনের জন্য এখানে রাখলাম। যত ঝড়বৃষ্টিই আসুক এটা সরাবো না। যদি জ্যাকেটটাকে আর এখানে দেখা না যায় আমি তাকে খুঁজতেও যাব না।

প্রথমদিন ওটা রোদে পুড়ল। কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করল না, এই যন্ত্রণা এখানে কেন? একটা ফেডেক্সের খাম আসলো আমার চাচির কাছ থেকে। যেটার ভিতর ছিলো তিনটা কাগজের (তালিসম্যান) টুকরা যার ম্যাজিক পাওয়ার আছে। আমি একটা কাগজ পোড়ালাম এবং তার ছাই এক বালতি পানির মধ্যে মেশালাম, তারপর কাগজিলেবু আর পাঁচ রঙের ফুল মেশালাম। সেই এক বাতলি পানি আমি আমার গোসলের সময় মাথায় ঢাললাম, ঠান্ডায় মনে হচ্ছিল জমে যাচ্ছি। আমি দ্বিতীয় তালিসম্যান পোড়ালাম তারপর খেয়ে ফেললাম পানি দিয়ে। ঘড়ির কাঁটা ধরে ঠিক তিনটার দিকে আমার ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল কিন্তু আওয়াজটা নাই।

একরাতে খুব ভারি বৃষ্টি হলো। আমি ঔষুধ কিনতে যাওয়ার সময় জ্যাকেটটা ডিঙিয়েই গেলাম। যখন ফিরে আসছিলাম দেখি ঐটা বিল্ডিংয়ের প্রবেশ পথে পড়ে আছে যেন আন্ডার কভার হয়ে ঢুকতে চাইছে। আমি একটা কঞ্চি দিয়ে ওটাকে তুলে আবার আগের জায়গায় ফেলে দিয়ে আসলাম। আমি আশা করছিলাম যে ওটা বাতাসের সাথে মিশে যাবে, হামাগুড়ি দিয়ে আর আসতে চাইবে না। আমার চাচি বলে দিয়েছে যদি এটা না পালায় তাহলে আমি তৃতীয় তালিসম্যানটা জ্যাকেটের ওপর রাখবে, তিনটা বড় বড় সার্কেলের ওপর ঘুরাবে, তারপর কাগজটাকে রাস্তার মধ্যে পোড়াবে। আর জ্যাকেকটা যার কাছ থেকে কিনেছিল তার কাছে পাঠাবে, প্রেরকের কোনো ঠিকানা না দিয়ে।

আমি কল্পনা করছিলাম, কেমন দেখাবে যদি আমি তালিসম্যান পোড়াই আমার ফ্লাটের সামনে, বিশাল গাড়িটার পেছনে যে ডুপলেক্স বানানোর কাজ করছে। ডুপ্লেক্সের মালিক অলরেডি চলে আসছে। আমি তাদের সামনের জানালায় রাখা ভার্জিন মেরির মূর্তি দেখতে পাচ্ছি, যে তার মৃণাল বাহু প্রসারিত করে আছে সবার জন্য।

সাতরাতের শেষরাতে আমি নিয়মমতোই ঘুম থেকে উঠলাম। সদর দরজায় গেলাম, লাইট জ্বালালাম, এবং লনের দিকে তাকালাম।

দেখি জ্যাকেটটা উঠে বসল। এবং উঠে দাঁড়িয়ে আস্তে আস্তে চলে যাচ্ছে গেটের দিকে যেন একজন অদৃশ্য মানুষ পরে আছে জ্যাকেটটা। জ্যাকেটের দুইটা হাত হাঁটার তালে দুলছে, জ্যাকেটটা উড়তে উড়তে রাস্তায় মোড়ে গিয়ে রাতের সাথে মিশে গেল।

‘জিজাস ক্রাইস্ট’ আমি বললাম।

ভার্জিন মেরি রাস্তা পাড় হচ্ছে একটা চমৎকার আলো ছড়িয়ে কিন্তু মুখে কোনো উচ্ছ্বাসের আভা নাই।

আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিলাম সেখানে জ্যাকেটটা চলে যাওয়ার পরও। তারপর আমি আমার নোটবুকটা খুঁজে নিলাম এবং লিখতে থাকলাম সকাল পর্যন্ত।

সকাল ৯টায় আমি কাজিমুর সাথে নাশতা করতে একটা রেস্টুরেন্টে মিলিত হলাম। আমার চুলকানি আর নাই।

মেলবোর্ন
২৬/০৪/২০২১

/জেডএস/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির মামলায় পশ্চিমবঙ্গের শিল্পমন্ত্রীকে ৩ ঘণ্টা জেরা 
শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির মামলায় পশ্চিমবঙ্গের শিল্পমন্ত্রীকে ৩ ঘণ্টা জেরা 
এনআইডির বয়স সংশোধনে ৩০ হাজার টাকা দাবির অভিযোগ
এনআইডির বয়স সংশোধনে ৩০ হাজার টাকা দাবির অভিযোগ
গাড়ি তল্লাশিকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও র‍্যাবের হাতাহাতি, তদন্ত কমিটি গঠন
গাড়ি তল্লাশিকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও র‍্যাবের হাতাহাতি, তদন্ত কমিটি গঠন
জলবায়ু অভিযোজন অর্থায়ন বাড়ানোর আহ্বান ডিএনসিসির মেয়রের
জলবায়ু অভিযোজন অর্থায়ন বাড়ানোর আহ্বান ডিএনসিসির মেয়রের
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত