X
মঙ্গলবার, ২৮ মার্চ ২০২৩
১৪ চৈত্র ১৪২৯

নাম ছিল রাজনীতি

সিদ্দিক বকর
০৫ জুন ২০২২, ১৭:০৪আপডেট : ০৫ জুন ২০২২, ১৭:০৪

লম্বা ও ফাঁকা একটি চত্বর। মনে হয় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। একপাশে চত্বরের লম্বা অংশে অনেকগুলো গাছ সারিবাঁধা, আরেকপাশে একটু ঝোপ মতন, মাঝে মাঝে যা কি না পুরো এলাকাটিকে আড়াল করে।

প্রস্থের একপাশে লম্বা মতন ছোটখাটো দুটো সোফা পাশাপাশি বসানো। সোফার কোনো আসনই খালি নেই। কেউ হেলান দিয়ে মাথায় দুহাত বন্ধনী করে রাখা, কেউ মাথা কাত করা, কেউ সামনের দিকে ঝোঁকা, কেউ গাছের দিকে তাকানো, কারো মাথা সোফায় ফেলানো―যা দেখে মনে হবে সবাই ভেতরে ভেতরে গলাকাটা তড়পানো ষাঁড়, চোখেমুখে অন্ধকারে তাকানোর দৃষ্টি।

চত্বরজুড়ে অনেকগুলো জটলা। সবকটা জটলাই আলাদা আলাদা। একটা থেকে অন্যটার আকৃতিও ভিন্ন। কখনো মনে হতে পারে এক একটা দ্বীপদেশ―কখনো মনে হতে পারে, আকাশজুড়ে খণ্ডখণ্ড কালো মেঘ জমেছে। ঐ মেঘের চক্করে বজ্রনাদ আছে। কোনোটায় হয়তো জঠরাগ্নি―হয়তো কোনোটা আবার শোকাগ্নিতে জ্বলছে―কোনোটা হয়তো প্রচণ্ড ক্রোধযুক্ত। এমনও হতে পারে―ভুলপথে হাঁটতে হাঁটতে খাপের ভিতর তলোয়ারের বহুদিন আর খোঁজই করা হয়নি, বারবার তার ঔজ্জ্বল্য হারায়।

এর মাঝে কেউ একজন কিছু বলছে, অন্যরা সবাই শুনছে। জটলা অনেকগুলো হলেও সবমিলে মনে হয় এক। সবাই হাঁটু ভাঁজ করে উবু হয়ে বসা যেন একেকটা থুথুর দলা। হামিং বার্ডের আয়তনে যার যার ভিতর সকলে ম্রিয়মাণ। যা দূর থেকে দেখলে অজানা পোকার জটলা বলে ভুল করতে পারে যে কেউ। সবারই মাথা ন্যুব্জ, ঝুলে আছে ঝুলবারান্দা ঠোঁট, প্রায় শ’তিনেক ছেলে তো হবেই। উগোল মাছের চোখ সবার, শূন্যদৃষ্টি প্রায় সবার মাটির দিকে, বাঁকা মেরুদণ্ড, কেউ ডান হাত দিয়ে ন্যুব্জ অবস্থায় কপালের ডান পাশের বিক্ষিপ্ত চুল টানছে, কেউ চাপা-না-পড়া নিকটতম ঘাসের কণ্ঠ বরাবর ছিঁড়ে চিবুচ্ছে, কেউ জামার কোনা ধরে মোচরাচ্ছে, কেউ তর্জনী দিয়ে মাটি খুঁড়ছে। সজাগ প্রজাপতি দৃষ্টি সবার উড়ে উড়ে বসছে এঁর ওপর ওঁর ওপর।

এর মাঝে দু-একজন জটলার একেবারে প্রস্থের আরেক পাশে বসে মাঝে মাঝেই যারা কথা বলে উঠছে―একমাত্র তাদের চোখমুখই অকস্মাৎ, অতর্কিতে চকমক করে একটু পরিমাণে বিজলি দিয়ে ওঠে―তুমুল মুষলধারায় বৃষ্টি হয়ে যাওয়ার পর, গুমোট অন্ধকার আকাশ চতুর্দিকে একের-পর-এক পালা করে বিদ্যুৎ চমকায় যেভাবে।

পুরো চিত্রটা গুয়ের্নিকা চিত্রের মতো দমমারা স্তব্ধ হয়ে থাকা দৃষ্টির সামনে। সবার ভিতরে সারা পৃথিবীর তুমুলতা ও বিশালতা নিয়েও এই মুহূর্তে সবাই নীরব। সবার মাঝেই যেন কোনো ন্যায্য দাবি-দাওয়া আদায়ের শূন্যতা আছে―তীব্রতা আছে, ক্ষোভ আছে। তারপরও সবাই নীরব, নিস্তব্ধ, ন্যুব্জ। ব্যবহার হওয়ার পূর্বে নুয়ে-ন্যূব্জ থাকা কোনো এক চিলেকোটায় অপেক্ষমাণ বসে থাকা বোমার মতো। প্রত্যেকটা বোমাই তরতাজা তরুণ। দেখলে বোঝা যায়―যেকোনো মুহূর্তে এঁরা হাঙর মূর্তি ধারণ করতে পারে। এর মাঝে যে দু-একজন কথা বলছিল―ঠিক তাঁর পাশ থেকে একজন টগবগে তরুণ বোমা ওঠে চলে আসে গদগদ করতে করতে অন্য পাশে। এসে বসে। উঠে আসার মাঝে লক্ষ করা যায় তাঁর একটি হাত কনুই থেকে কবজির দিকে খাটো এবং চিকন। অন্যপাশ থেকে আরেকজন। এঁদের ভাব-লক্ষণ দেখে মনে হচ্ছে এঁরা ওদের মতের সাথে একমত হতে পারছে না।

এমতাবস্থায় যে দু-একজন কথা বলছিল―তাঁদের একজন উঠে দাঁড়ায়। তাঁর চোয়াল শক্ত। চোখ যেন একেকটা পোড়া কড়াইয়ের রূপ। লোহাভারী দৃষ্টি। হাতের থাবা একেকটা গোপাটের পেটসদৃশ প্রশস্ত। নাক যেন তাঁর তাক করা কাটা রাইফেলের নল। একটুখানি পাঞ্জাবির সাথে টুটাফাটা জিন্সের প্যান্ট। দাঁড়িয়ে, একটু থেমে―ক্ষুরধার দৃষ্টি দিয়ে সবাইকে বিক্ষত করে। দৃঢ়পায়ে একেবারে চলে আসে অন্যপাশের সোফার সামনে। তাঁর নাম হাকিম।

হাকিম এসে দাঁড়ায় সোফার সামনে, সেই ছেলেটার সামনে―যে ছেলেটা মাথায় দুই হাতবন্ধনী করে বসেছিল। সবাই চুপচাপ।

একটু হয়তো সমূহবিপদ-সংকেত বুঝে কানকোমাছের চঞ্চল দৃষ্টি ঘোরাঘুরি করে। হাকিম যার সামনে এসে দাঁড়ায়―সে হলো শামীম। শামীমও উঠে দাঁড়ায় তখন। মাথার ওপর থেকে দুই হাতের বন্ধনী এখন খুলে পড়ে তাঁর। দুই হাত এখন ঝুলে থাকে―যেন কাঠালগাছের ডালে খাশির কাটা দুই রান। দেখে বোঝা যায়―কী যেন সে বলে চলে চাপাক্ষোভে। শোনে―হাকিম তাঁর ক্ষোভের জ্বলন্ত সিগারেট পায়ের তলায় পিষ্ট করে।

হাকিম হলো হাল-আমলের আনোয়ার কঙ্গো। ঠান্ডামাথার দুর্ধর্ষ খুনি।

হাকিম মাথা ঈষৎ নিচু করে শোনে। কোনো কথা বলার চেষ্টা করে না। শুধু চোখদুটো তাঁর পোলোর মতো ঝাঁপ মারে সন্তরণশীল চাপা ক্ষোভগুলোর ওপর।

এমন একটি পরিস্থিতিতে সোফার ডান পাশের ছেলেটি, মানে―খায়রুল সোহান উঠে দাঁড়ায়। কিছু কথা বলার চেষ্টা করে। হয়তো পরিস্থিতিকে একটু সমঝোতার মাঝামাঝি নিয়ে আসার নিমিত্তে।

কিন্তু হাকিম এতে খুব সন্তুষ্ট না হয়ে খায়রুল সোহানকে বিদ্রুপের ভঙ্গিতে দুহাত তাঁর কাঁধে, মাথায়, বুকে, মুখে, ঊর্ধ্বাংশে―সারা শরীরে খামখেয়ালিরূপে চলাচল করে বাবাখোর নেশাগ্রস্তের উত্তেজনায়।

শামীম ফের নিরুপায় সোফায় গা এলিয়ে বসে পড়ে কাছিম হয়ে―গলা মাথা ভিতরে ঢুকিয়ে। দৃষ্টি তাঁর কোনোদিকেই নয়। চোখ খোলা―আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা ধ্যানমগ্ন ডিশ।

হাকিম খায়রুল সোহানের শরীরটা বাঁ হাতে বুকে চেপে জড়িয়ে ডান হাত পকেটে ঢুকিয়ে অস্ত্রটি হাতে নেয়। একটু সামনের দিকে ঝুঁকে গা এলিয়ে বসে পড়া শামীমের বুকে অস্ত্র ঠেকিয়ে ধরে খেলার ছলে, খামখেয়ালিপনায়। অস্ত্রটি একটুক্ষণ ধরে রাখে বুকে, এদিক-ওদিক তাকায়, খেলাচ্ছল করেই খুব স্বাভাবিক আচরণের ভিতর দিয়ে অস্ত্রটি চালনা করে দেয়।

শামীম নামের ছেলেটি ঈষৎ নড়ে চুপ হয়ে যায়।

পার্থক্য শুধু এতটুকুই―আগে মাথাটা ছিল ঘাড়ের ওপর খাড়া, মেরুদণ্ডটি সোজা। এখন মেরুদণ্ডটি ভেতরের দিকে বাঁকা হয়ে―মাথাটা ঘাড় থেকে ডান দিকে কাত হয়ে পড়ে।

এ সময়টা পর্যন্ত অস্ত্রটি বুকে ধরে রেখে আবার তুলে নিয়ে আসে। খায়রুল সোহানের দেহটা হাকিমের বাঁ হাতের দখল থেকে মুক্ত করে হাতের অস্ত্রটি পকেটে ঢুকিয়ে ঘুরে দাঁড়ায়―যেন কিছুই ঘটেনি।

ঘটে শুধু―ছেলেটির শরীর থেকে তাঁর সমস্ত রক্ত প্রবল রোষে গলগল করে বেরিয়ে পেট বেয়ে দুই উরুর ফাঁক দিয়ে পড়ে সোফায়―সোফা থেকে লাফিয়ে পড়ে মাটিতে। মাটিতে পড়তেই―ছোপমারা সাপ যেন দৌড়াতে থাকে অস্থির হয়ে।

সবাই আরো চুপ হয়, সোফায় সার ধরে বসা ছেলেগুলোও চুপ। কোনো কিছুর আওয়াজে যেন সবার আত্মা ভেতর থেকে বেরিয়ে―একসাথে উড়ে গিয়ে উপরে স্থির হয়ে থাকে। শরীরগুলো পড়ে থাকে যার যার জায়গায়।

ঠিক আগের মতো আর একটি আওয়াজের অপেক্ষায়।

/জেডএস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
টিভিতে আজকের খেলা (২৮ মার্চ, ২০২৩)
টিভিতে আজকের খেলা (২৮ মার্চ, ২০২৩)
‘সাদা কাপড়ে জড়িয়ে গেলে, ভালোবাসার মানুষের অভাব হয় না’
‘সাদা কাপড়ে জড়িয়ে গেলে, ভালোবাসার মানুষের অভাব হয় না’
আয়ারল্যান্ডকে হারাতে ঘাম ছুটলো ফ্রান্সের
আয়ারল্যান্ডকে হারাতে ঘাম ছুটলো ফ্রান্সের
‘গাজীপুর সিটির মাস্টারপ্ল্যানের কাজ ৫৫ শতাংশ সম্পন্ন’
‘গাজীপুর সিটির মাস্টারপ্ল্যানের কাজ ৫৫ শতাংশ সম্পন্ন’
সর্বাধিক পঠিত
‘ব্রয়লারের দাম ১৯০ টাকা ঘোষণা দিয়ে ১৬০ টাকা কীভাবে হলো গোয়েন্দা সংস্থা দেখছে’
‘ব্রয়লারের দাম ১৯০ টাকা ঘোষণা দিয়ে ১৬০ টাকা কীভাবে হলো গোয়েন্দা সংস্থা দেখছে’
চ্যাটিং অ্যাপ থেকে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার স্থপতি ইমতিয়াজ!
চ্যাটিং অ্যাপ থেকে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার স্থপতি ইমতিয়াজ!
‘বিরল ভাষণে’ যে হুঁশিয়ারি দিলেন মিয়ানমার সেনাপ্রধান
‘বিরল ভাষণে’ যে হুঁশিয়ারি দিলেন মিয়ানমার সেনাপ্রধান
হুইপকে নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট: বরখাস্ত পুলিশ কর্মকর্তার ৫ লাখ টাকা জরিমানা
হুইপকে নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট: বরখাস্ত পুলিশ কর্মকর্তার ৫ লাখ টাকা জরিমানা
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সংশোধন হচ্ছে মোটরসাইকেল নীতিমালা
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সংশোধন হচ্ছে মোটরসাইকেল নীতিমালা