ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ইংরেজি বিভাগের শ্রেণিকক্ষে নিকাব পরা এক ছাত্রীকে নিয়ে মন্তব্যের ঘটনায় নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুব। একই সঙ্গে বেনামী ফোন, ইমেইল, আপত্তিকর বার্তা ও হুমকির কারণে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।
শনিবার (১০ অক্টোবর) দুপুরে নিজের ফেসবুক পেজে লাইভে এসে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন তাসনিম সিরাজ মাহবুব।
বক্তব্যে তিনি বলেন, গত ৭ অক্টোবর মাস্টার্স ফাইনাল সেমিস্টারের ক্লাসে এক শিক্ষার্থীর চোখসহ পুরো মুখমণ্ডল ঢাকা থাকায় তাকে তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করতে অসুবিধা হচ্ছিল। চোখে চোখ রেখে যোগাযোগ করতে না পারায় শিক্ষার্থী তার বক্তব্য কীভাবে গ্রহণ করছেন এবং শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রমে কীভাবে অংশ নিচ্ছেন, তা বুঝতে সমস্যা হচ্ছিল। পাঠদানের সময় স্বস্তি বোধ না করার বিষয়টি থেকেই তিনি এ নিয়ে কথা বলেন।
তাসনিম সিরাজ মাহবুব বলেন, তার প্রায় ৩৪ বছরের শিক্ষকতা জীবনে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও অনুশাসন মেনে চলেছেন। কোনো শিক্ষার্থীর ধর্মীয় বিশ্বাস বা পোশাককে অবমাননা করার প্রশ্নই ওঠে না বলে দাবি করেন তিনি।
ক্লাসে ইসলামে পর্দার বিধান নিয়ে নিজের ব্যাখ্যা তুলে ধরেছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, কোরআনের অনুবাদ পড়ে তার বোঝাপড়া অনুযায়ী, শরীরের গঠন স্পষ্ট না হয় এমন শালীন পোশাক পরেও মুখমণ্ডল দৃশ্যমান রাখা যায়। এ বিষয়ে ধর্মীয় ব্যাখ্যা এবং হজের সময় নারীদের ইহরাম অবস্থায় নেকাব না পরার হাদিসের কথাও আলোচনা করেন তিনি।
তাসনিম সিরাজের দাবি, ওই শিক্ষার্থীর পোশাক পরিবর্তন করতে, নেকাব খুলতে কিংবা ক্লাস ত্যাগ করতে তিনি নির্দেশ দেননি। ধর্মীয় পোশাকের কারণে তাকে কোনো শাস্তি দেওয়া বা ভবিষ্যতে ক্লাসে আসতে নিষেধও করা হয়নি। তার বক্তব্য ছিল চোখ ঢাকা থাকার কারণে শিক্ষার্থীকে শনাক্ত করতে অসুবিধা হওয়া নিয়ে।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থী ক্লাস থেকে চলে যাওয়ার পর সহপাঠীদের কাছ থেকে জানতে পারেন, তার কথায় ওই শিক্ষার্থী কষ্ট পেয়েছেন। এরপর তার কাছে দুঃখ প্রকাশ করতে সহপাঠীদের মাধ্যমে তিনবার খবর পাঠান এবং করিডোরে প্রায় ১০ মিনিট অপেক্ষা করেন। তবে শিক্ষার্থী তার সঙ্গে কথা বলতে আসেননি। ফলে সরাসরি দুঃখ প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।
বক্তব্যে তাসনিম সিরাজ আরও বলেন, ঘটনার দিন পরিবারের একজন গুরুতর অসুস্থ সদস্যের অস্ত্রোপচারের কারণে তাকে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হয়েছিল। এর মধ্যেই তার বক্তব্য বিকৃতভাবে প্রচার করা হচ্ছে বলে জানতে পারেন তিনি।
ইংরেজি বিভাগের সিদ্ধান্তের বিষয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তার বক্তব্য গ্রহণ না করেই সব কোর্স অন্য শিক্ষকদের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে। নিজের ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ পাওয়ার আগেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তিনি মর্মাহত হয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগগুলোর বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ চেয়ে তাসনিম সিরাজ বলেন, সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য ও প্রাসঙ্গিক তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনাটি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হোক। এ প্রক্রিয়ায় তিনি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ঘটনার পর বেনামী ফোন, ইমেইল, আপত্তিকর বার্তা ও হুমকি পেয়েছেন। সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীসহ সবার মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হুমকি ও হয়রানি প্রতিরোধে কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার ইংরেজি বিভাগের একদল নারী শিক্ষার্থী এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানীর কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাসনিম সিরাজ মাহবুবকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার, সংশ্লিষ্ট ব্যাচের শিক্ষার্থীদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের একাডেমিক মূল্যায়ন ও পাঠদান থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি জানান। পাশাপাশি কোনো শিক্ষার্থী যেন একাডেমিক ক্ষতি, হয়রানি বা প্রতিহিংসার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করার দাবি তোলেন তারা।
পরে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রী সংস্থার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতা-কর্মীরা শিক্ষকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে মানববন্ধন করেন।
ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তাজিন আজিজ চৌধুরী জানান, শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে জরুরি একাডেমিক কমিটির সভা হয়েছে। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তাসনিম সিরাজ মাহবুবের নেওয়া কোর্সগুলো অন্য শিক্ষকদের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে। আপাতত তিনি কোনো কোর্সের ক্লাস নিতে পারবেন না বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তাসনিম সিরাজ তার বক্তব্যে বলেন, শ্রেণিকক্ষ শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের জন্য সম্মানজনক ও নিরাপদ স্থান হওয়া প্রয়োজন। পরিচয় যাচাইয়ের প্রয়োজন হলে ধর্মীয় বিশ্বাস, ব্যক্তিগত মর্যাদা ও গোপনীয়তার প্রতি সম্মান রেখে সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালার মাধ্যমে তা করা উচিত।