রাবি ক্যাম্পাসে অনুমোদনহীন ভ্রাম্যমাণ দোকান, বিঘ্নিত হচ্ছে শিক্ষার পরিবেশ

Send
তৌসিফ কাইয়ুম, রাবি
প্রকাশিত : ১৫:২৩, নভেম্বর ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৮, নভেম্বর ১৯, ২০১৯

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে ভ্রাম্যমাণ ও অস্থায়ী দোকান। দোকানগুলোর অধিকাংশেরই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেই। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এসব দোকান বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য নষ্টের পাশাপাশি পড়ালেখার স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত করছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের টুকিটাকি চত্বরে অনুমোদন ছাড়াই এভাবে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ভ্রাম্যমাণ দোকান
বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন হলে তা সামগ্রিক হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। অথচ যেখানে সেখানে গড়ে ওঠা ভ্রাম্যমাণ ও অস্থায়ী দোকানগুলো শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে সেদিকে লক্ষ নেই।’ সৌন্দর্য বর্ধনের পাশাপাশি শিক্ষা সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতে ভ্রাম্যমাণ ও অস্থায়ী দোকানগুলো একটি নিদিষ্ট স্থানে স্থানান্তর করা প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।
সরেজমিনে দেখা যায়, টুকিটাকি চত্বর থেকে শুরু করে পুরাতন ফোকলোর চত্বর, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির পেছনে, শহীদুল্লাহ কলা ভবন, মমতাজ উদ্দীন কলা ভবন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শের-ই বাংলা হলের মধ্যবর্তী স্থান, সৈয়দ আমীর আলী হল, জিয়া হল, মাদারবক্স হল, সোহরাওয়ার্দী হলের সামনে অন্তত অর্ধশতাধিক ভ্রাম্যমাণ ও অস্থায়ী দোকান গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে টুকিটাকি চত্বর থেকে পুরাতন ফোকলোর চত্বর পর্যন্ত এক নাগাড়ে অনেকগুলো খাবারের দোকান। এসব দোকানে সারাদিনই শিক্ষার্থীদের হইচই, গান বাজনা চলতে থাকে। ফলে পার্শ্ববর্তী একাডেমিক ভবনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ক্লাসে মনোযোগে বিঘ্ন ঘটে বলে দাবি শিক্ষার্থীদের।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সানজানা শ্রুতি বলেন, ‘রবীন্দ্র ভবনে আমাদের ক্লাস হয়। প্রথমত রাস্তার ধারে হওয়ায় নিয়মিত যানচলাচলে হর্ন, তার ওপর একাডেমিক ভবন সংলগ্ন দোকানগুলো হওয়ায় এখানকার হইচইয়ে আমাদের মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে নিয়মিত।’ একাডেমিক ভবনের কাছে যদি প্রশাসন দোকান তুলতে না দিতো অথবা যদি দুই একটি দোকান হতো, তবে পরিবেশ এতোটা খারাপ হতো না বলে দাবি শ্রুতির।
বিশ্ববিদ্যালয়ে যত্রত্র গড়ে ওঠা এসব দোকান নিয়ে প্রশাসনের নিরবতার সমালোচনা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদেড় (রাকসু) সাবেক ভিপি রাগিব আহাসান মুন্না। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে খালি জায়গা একটি সৌন্দর্য। এখানে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান চর্চা করবে। কিন্তু এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের যেখানে সেখানে ভ্রাম্যমাণ দোকান গড়ে উঠেছে। অথচ প্রশাসন এসব দোকান উচ্ছেদ না করে সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য ঘাস লাগাচ্ছে।’
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, কিছুদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে শিক্ষকদের একটি প্রোগ্রামে প্রশাসনের নির্ভিকার ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করেন ইতিহাস বিভাগের সিনিয়র শিক্ষক অধ্যাপক চিত্ত রঞ্জন মিশ্র। তিনি বলছিলেন, ‘আমি শিক্ষকদের একটি প্রোগ্রামে ক্যাম্পাসে অস্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলো বন্ধের দাবি জানিয়েছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য বিষয়টি ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছিলেন।  কিন্তু এখন পর্যন্ত দৃশ্যত কোনও পদক্ষেপ দেখা যায়নি।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসমাঈল হোসন সিরাজী ভবনের সামনে অনুমোদন ছাড়াই এভাবে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ভ্রাম্যমাণ দোকান

বিশ্ববিদ্যালয়ের দোকান বরাদ্দের বিষয়টি দেখাশোনা করে এস্টেট দফতর। দফতর সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোথাও জায়গা বরাদ্দ পাওয়া জন্য প্রথমে এস্টেট দফতরের প্রধান কর্মকর্তা বরাবর আবেদন করতে হয়। এস্টেট দফতর এ আবেদন তাদের উন্নয়ন কমিটির সভায় তোলেন। উন্নয়ন কমিটি হচ্ছে এস্টেট দফতরের নীতিনির্ধারণী কমিটি। যার সভাপতি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ। এর সদস্য থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েজন শিক্ষক। উন্নয়ন কমিটি অনুমোদন দিলে তা প্রকৌশল সেকশনে পাঠানো হয়। সেখান থেকে উপাচার্যের দফতরের পাঠানো হয়। উপাচার্য তা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পাস করিয়ে দেন। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুমোদিত দোকান রয়েছে ৩৮৭টি। এর মধ্যে কাজলা মার্কেটে ২৬টি, বিনোদপুর ৫০টি, পরিবহণ মার্কেটে ২৬টি, প্রথম ও চতুর্থ বিজ্ঞান ভবনের মাঝে ৮টি, টুকিটাকিতে ৮টি, স্টেশন মার্কেটে ২০৮টি এবং আবাসিক হলগুলোর সামনে ৫৩টি।
তবে কিসের বিবেচনায় এ দোকানগুলো অনুমোদন দেওয়া হয় সে বিষয় নিয়ে সুস্পষ্ট ধারণা নেই খোদ উন্নয়ন কমিটির সদস্য ও এস্টেট দফতরের প্রধান জাহিদ আলীর। অনুমোদনের ক্ষেত্রে কোনও নিদিষ্ট মানদণ্ড নেই বলে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে যারা দোকান বরাদ্দের জন্য আবেদন করে তাদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি এবং শিক্ষকদের সম্পর্ক ভালো হলে দোকানের অনুমোদ পাওয়া যায়।’
এস্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবনগুলোর সংলগ্ন ভ্রাম্যমাণ দোকান যাতে গড়ে না উঠে সে বিষয়টি মাথায় রেখে বিগত প্রশাসনের ভিসি মিজান উদ্দীনে আমলে দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিজ্ঞান ভবনের মধ্যবর্তী লেকে দুই পাশে চারটি, ফোকলোর চত্বর সংলগ্ন পুকুরের পাড়ে ৫টি এবং ডিনস্ কমপ্লেক্সের পিছনে ১টি দোকান নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেয় প্রশাসন। প্রকল্পটি ২০১৪ সালের ২০ নভেম্বর সেসময়ের এস্টেট উন্নয়ন কমিটির সভায় অনুমোদনও দেওয়া হয়। কিন্তু পরে নতুন উপাচার্য আসার পর প্রকল্পটি সিন্ডিকেট থেকে অনুমোদ না হওয়া প্রকল্পটি আটকে আছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়ন শিক্ষকরা বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিদিষ্ট কোনও জায়গায় ভবন নির্মাণ করে যদি সকল দোকান সেখানে স্থানান্তর করা যায়, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য বাড়বে।
ভ্রাম্যমাণ ও অস্থায়ী দোকানের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শ্রী নষ্ট হচ্ছে স্বীকার করে এস্টেট উন্নয়ন কমিটির সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান আল-আরিফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন সময়ে ভ্রাম্যমাণ ও অস্থায়ী দোকানগুলো তোলার চেষ্টা করেছি। কিন্তু ছাত্রদের বাধার কারণে তোলা সম্ভব হয়নি। বিকল্প ব্যবস্থা করা ব্যতীত দোকানগুলো তুলে দেওয়া মুশকিল।’ মাস্টার প্ল্যানের আওতায় বিশ তলা ভবনে এসব দোকান স্থানান্তর করা হবে বলেও জানান তিনি।
বিকল্প ব্যবস্থার জন্য ভিসি অধ্যাপক মিজান উদ্দীনের সময় একাডেমিক ভবন সংলগ্ন কয়েকটি স্থায়ী দোকান নির্মাণে যে প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল তা পাস না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান এবং বলেন, বিভিন্ন সময় নানা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয় সব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। নতুন করে গড়ে ওঠা দোকানগুলোর ব্যপারে এস্টেট কমিটির পদক্ষেপ জানতে চাইলে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘নতুন করে ক্যাম্পাসে অস্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ দোকান গড়ে ওঠছে কিনা আমার জানা নেই। তবে যদি আমরা এ ধরনে অভিযোগ পাই তবে পদক্ষেপ নেব।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য চৌধুরী মো. জাকারিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতে আমরা ৫০ বছর মেয়াদী মাস্টার প্ল্যান হাতে নিয়েছি। এর আওতায় অনুমোদিত দোকানগুলোকে একটি নিদিষ্ট মানদণ্ডের মধ্যে নিয়ে আসা হবে। ভ্রাম্যমাণ ও অস্থায়ী দোকানগুলোর ব্যাপারে প্রক্টরের সঙ্গে কথা বলে খুব শীঘ্রই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

/এনএ/

লাইভ

টপ