কবে উদ্ধার হবে জবির বেদখল হলগুলো?

Send
সুবর্ণ আসসাইফ, জবি প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১৭:২১, অক্টোবর ২৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২৭, অক্টোবর ২৭, ২০২০

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ১৫ বছর পর ছাত্রীহল উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে অনাবাসিক তকমামুক্ত হয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। তবে এখন সুরাহা হয়নি বেদখল হয়ে থাকা ছাত্রহলগুলোর। প্রায় তিন যুগ ধরে প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছে হলগুলো। বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চেষ্টা চালালেও হলগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
২০০৯, ২০১১, ২০১৪ ও ২০১৬ সালে হলের দাবিতে রাজপথে নামে শিক্ষার্থীরা। এসব আন্দোলনে পুলিশ ও স্থানীয়দের সাথে সংঘর্ষে আহত হয় বহু শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। ২০১১ সালের আন্দোলনের পর ছাত্রীহল নির্মাণের ঘোষণা আসে। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের আন্দোলনে নিজামউদ্দিন রোডের পুরাতন কারাগারের জায়গায় হল নির্মাণের দাবি জানায় শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের এক পর্যায়ে নতুন ক্যাম্পাস নির্মাণের ঘোষণা আসে। বর্তমানে কেরানিগঞ্জের তেঘরিয়ায় ২০০ একর জমিতে নতুন ক্যাম্পাসের ২০০০ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ চলছে।
এরপর থেকে বেদখল হলগুলোর বিষয় আলোচনায় না আসলেও ছাত্রীহল উদ্বোধন হওয়ার পর আলোচনায় আসে বেদখল হলগুলো। গত ২০ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে জবির প্রথম ছাত্রীহল বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ছাত্রীহল উদ্বোধন করেন জবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান।
যেভাবে বেদখল হয় হলগুলো
বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে পুরান ঢাকার হিন্দুদের ফেলে যাওয়া কয়েকটি পরিত্যক্ত বাড়িতে তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের শিক্ষার্থীরা বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস শুরু করে। মূলত ছাত্রনেতাদের উদ্যোগে পরিত্যক্ত বাড়িগুলো ছাত্রাবাসে পরিণত করা হয়। বিভিন্ন সময় কলেজের অধ্যক্ষদের নাম জড়িয়ে হলগুলোর নামও দেন তারা।
হলগুলোর মধ্যে আরমানিটোলার শহীদ আব্দুর রহমান হলে সর্বপ্রথম দখলদারদের দৃষ্টি পড়ে। স্বাধীনতার পরপরই দাতব্য প্রতিষ্ঠান আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম জায়গাটির দখল নেওয়ার চেষ্টা করে। সে সময় শিক্ষার্থীরা হলটি রক্ষা করতে পারলেও ১৯৮৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি স্থানীয়দের সাথে এই হলের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ ঘটলে ৮টি হল বন্ধ করে দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পরবর্তীতে কলেজ সংলগ্ন শহীদ আজমল হোসেন হলটিও বেদখল হয়ে যায়।
১৯৮৮ সালের একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়, কেরানীগঞ্জে ‘রানা হল’ নামে একটি ছাত্রাবাস ছিল জগন্নাথের শিক্ষার্থীদের, পরে যা বেদখল হয়ে যায়।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির নামে যে সকল হল রয়েছে, বেশিরভাগই স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলে। অনেক হলের কাগজপত্র প্রভাবশালীরা নিজেদের নামে করে নিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকা হলগুলোর অবস্থা
৩৫ ও ৩৬ প্যারিদাস রোডের ১ নম্বর ঈশ্বরচন্দ্র দাস লেইনে ১০ কাঠার বাণী ভবনের কিছু অংশ বেদখল হয়ে গেলেও সিংহভাগ দখল করে এখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীরা সেখানে বসবাস করছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের স্থানে ‘মাহমুদা স্মৃতি ভবন’ নামের একটি হল ছিল। কলেজটির পুরাতন বিভিন্ন ছবিতেও হলটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ‘এরশাদ হল’ নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি আবাসিক হল ছিল। বর্তমানে হল দুটি কলা অনুষদের একাডেমিক কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে।
পরবর্তী বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার পর, ২০১১ ও ২০১৪ সালের হলের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামলে, মালিটোলার ‘ড. হাবিবুর রহমান হল’ ও গোপীমোহন বসাক লেইনের ‘নজরুল ইসলাম হল’ উদ্ধার হয়। তবে হলগুলো ব্যবহার উপযোগী করার প্রক্রিয়া এখনও শুরু করেনি কর্তৃপক্ষ।
আর্মানিটোলার আব্দুর রহমান হলটি ২০১৪ সালে ইজারা পায় বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে কিছু সংখ্যক ছাত্র সেখানে থাকে বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি কর্মকর্তা।।
বেদখল হলগুলোর বর্তমান অবস্থা
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০৫ অনুযায়ী বিলুপ্ত কলেজের সব সম্পত্তি বুঝিয়ে দিতে মুসিহ মুহিত অডিট ফার্মকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ফার্মটির অনুসন্ধানে দেখা যায়, তৎকালীন কলেজের ১২টি হল ছিল।
পাটুয়াটুলীর ওয়াইজঘাট ৮ ও ৯ নম্বর জিএল পার্থ লেইনের ৮ দশমিক ৮৮৯ কাঠার উপর তিব্বত হলটি দখলের অভিযোগ রয়েছে সাংসদ হাজি সেলিমের বিরুদ্ধে। ২০০১ সালে হলটির স্থানে স্ত্রীর নামে 'গুলশান আরা সিটি মার্কেট' নির্মাণ শুরু করেন তিনি। প্রতিবাদে কয়েক দফা আন্দোলনেও নামেন জগন্নাথের শিক্ষার্থীরা। তিনি অবশ্য বরাবরই জায়গাটি তার নিজস্ব বলে দাবি করেন।
আরমানিটোলার এসি রায় রোডে আবদুর রহমান হলটি এখন পুলিশ সদস্যদের আবাস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আরমানিটোলা মাহুতটুলির ১ নম্বর শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী রোডের ৪০ কাঠা জমিতে শহীদ আনোয়ার শফিক হলটি স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলে। যদুনাথ বসাক লেন, টিপু সুলতান রোডের সাইদুর রহমান হল ও রউফ মজুমদার হল দুটির বর্তমানে কোনও অস্তিত্বই নেই। পাটুয়াটুলীর ১৬ ও ১৭ নম্বর রমাকান্ত নন্দী লেনের শহীদ আজমল হোসেন হল দখল করে এক সময় পুলিশ সদস্যদের কিছু পরিবার থাকত। এর কিছু অংশে গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন সমিতি। ১৯৯৬ সালে এর একাংশ দখল করেন স্থানীয় মোশারফ হোসেন খান। বংশালের ২৬ নম্বর মালিটোলায় বজলুর রহমান হলের ভবনে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে শহীদ জিয়াউর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ১৯৮৫ সালে স্থানীয়দের সঙ্গে সংঘর্ষে ছাত্ররা হলটি ছাড়তে বাধ্য হয়। তাঁতীবাজারের ঝুলনবাড়ী লেনে শহীদ শাহাবুদ্দিন হল দুই যুগেরও বেশি সময় পুলিশের দখলে ছিল। ২০০৯ সালের জুনে আওয়ামী লীগ নেতা আমিনুল হক এর দখল নেন।

পাটুয়াটুলীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের ছয়তলা আবাসস্থলের জায়গায় তৈরি হয়েছে ক্রাউন মার্কেট। ওবায়দুল্লাহ নামের একজন মালিকানার দাবিদার।
হল উদ্ধারে গতি নেই
২০০৯ সালের ২৭ জানুয়ারি হলের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করা হলে নীতি-নির্ধারণী মহলের টনক নড়ে। একই বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক মাসের মধ্যে ১২টি হল ও বেদখল হওয়া অন্যান্য সম্পত্তি উদ্ধারে সুপারিশ করতে ৬ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়। ২০০৯ সালের মার্চে ৫টি হল (আনোয়ার শফিক হল, শাহাবুদ্দিন হল, আজমল হোসেন হল, তিব্বত হল ও হাবিবুর রহমান হল) বিশ্ববিদ্যালয়কে লিজ দেওয়ার সুপারিশ করে কমিটি।
একই বছরের ৫ মে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভূমি মন্ত্রণালয়ে ৫টি হলের দীর্ঘমেয়াদি লিজের আবেদন করে। ৯ জুলাই ভূমি মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে অর্পিত সম্পত্তি সংক্রান্ত প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেয়। ২০১০ সালের ২১ জানুয়ারি জেলা প্রশাসক আইনগত সুবিধার্থে বিশ্ববিদ্যালয়কে হলগুলো লিজের পরিবর্তে অধিগ্রহণের ব্যবস্থা নিতে বললেও একাধিক মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টতা ও আইনি জটিলতায় হল উদ্ধার কার্যক্রম থমকে থাকে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট কর্মকর্তা কামাল সরকার বলেন, ‘আমরা এখন নতুন ক্যাম্পাস নিয়ে ব্যস্ত, পুরাতন হলগুলোর বিষয়ে কোনও তথ্য দিতে পারছি না।’
মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কাগজপত্রের ঝামেলা আছে।’
মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন উপদেষ্টা দপ্তরের প্যানেল ল-ইয়ার এড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম শেখ বলেন, ‘মামলাগুলো চলছে। হল সংক্রান্ত মামলাগুলো সরকারীপক্ষ থেকে দেখছে। যেহেতু এগুলো সরকারি সম্পত্তি, সরকার মামলাটা চালাচ্ছে। মামলার সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও সম্পর্ক নেই।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার প্রকৌশলী ড. ওহিদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা কলেজ কর্তৃপক্ষ এ সংক্রান্ত কাগজপত্র আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে কিনা জানি না, তবে আমরা পাইনি। একটা কমিটি হয়েছিলো সরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে, তারা কোনও রিপোর্ট জানায়নি। এখন যেহেতু নতুন ক্যাম্পাসে হল হবে, এ জায়গাগুলোতে হল হওয়ার সুযোগ হবে বলে মনে হয় না।’

/এনএ/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ