‘৫৭০ সাবান দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে গোসল করানো হলো। রেডক্রস থেকে চার ইঞ্চি পাড়ের সাদা শাড়ি এনে পাড় ছিঁড়ে ফেলে কাফনের কাপড় বানানো হলো’ এমনটাই লেখা রয়েছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী প্রয়াত সাংবাদিক বেবী মওদুদ সম্পাদিত জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট থেকে প্রকাশিত ‘১৫ আগস্ট ১৯৭৫’ বইয়ে।
১৫ আগস্টে ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তার পুরো পরিবারকে হত্যা করা হয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার ছোট বোন শেখ রেহানা তখন দেশের বাইরে বাইরে ছিলেন।
বেবী মওদুদ তার ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুর রক্তাক্ত লাশ সেদিন ৩২ নম্বর রোডের বাড়িতে পড়ে ছিল। তবে তা ছিল সৈন্যদের কঠোর পাহারায়। অন্য বাড়ির লাশগুলো এনে এ বাড়ির লাশগুলোর সঙ্গে একত্রে রাখা হয়। রাতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় লাশ কীভাবে দাফন করা হবে। অনেক রাতে গোসল ও জানাজা ছাড়া বঙ্গবন্ধুকে ছাড়া সব লাশ বনানীতে দাফন করা হয়। টুঙ্গীপাড়ার ওসিকে খবর পাঠানো হয়, পরদিন বঙ্গবন্ধুর লাশ যাবে সুতরাং কবর যেন খনন করা থাকে। রাতে বঙ্গবন্ধুর লাশ বরফ দিয়ে ৩২ নম্বর বাড়িতেই রাখা হয়। সারারাতে তা পাহারায় রাখে একদল সৈন্য। লে: ক: হামিদকে দায়িত্ব দেওয়া হয় হেলিক্প্টারে করে লাশ টুঙ্গিপাড়া নিয়ে গিয়ে দ্রুত দাফন করে, কবর পাহারায় রেখে চলে আসার জন্য। শনিবার দিনও ঢাকা শহর থমথম ছিল। সকালেই টুঙ্গীপাড়ার ওসি বঙ্গবন্ধুর বাড়ির মসজিদের ইমাম মৌলভী আবদুল হালিমের কাছে লাশ পৌঁছার খবর দেন।
বেলা দেড়টায় হেলিকপ্টার বঙ্গবন্ধুর বাড়ির কাছে থানার পাশে মাঠে নামে। প্যাকিং করা বরফ ঢাকা লাশ বহন করেন কর্নেল হামিদের নেতৃত্বে ১২ জন সৈন্য। সেদিন টুঙ্গীপাড়ায় কারফিউ জারি ছিল, জনগণকে আসতে দেওয়া হয়নি। বঙ্গবন্ধুর দুই মামা শ্বশুর শেখ মনসুরুল হক ও শেখ মনজুরুল হক কফিন বুঝে নেন তাদের থেকে।’
বেবী মওদুদ লিখেছেন, ‘লাশ থেকে বরফ সরানো হলে দেখা গেল, বরফ গলা পানির সঙ্গে রক্তও গড়িয়ে পড়ছিল মাটিতে। একটা ময়লা সাদা মার্কিন কাপড়ে লাশটা ঢাকা ছিল, যা কিনা বরফে ভেজা ছিল। বঙ্গবন্ধুর পরনে ছিল সাদা গেঞ্জি, পাঞ্জাবি ও কালো পাড়ের সাদা লুঙ্গি।পাঞ্জাবির পকেটে ছিল চশমা, সারা শরীর রক্তাক্ত।’
কর্নেল হামিদ ইমাম সাহেবকে দ্রুত লাশ দাফন করতে বলেন। তিনি উত্তর দেন দুঘণ্টা লাগবে শরীয়ত অনুযায়ী গোসল করাতে ও জানাজা পড়াতে। এসব ছাড়াই লাশ দাফন করানো যায় কিনা হামিদ সাহেবের এ প্রশ্নের জবাবে ইমাম বলেন, একজন মুসলমানের লাশ গোসল ছাড়াই দাফন করা যায় যদি সে শহীদ হয়। যদি লিখে দেন শহীদ করে এনেছেন, তাহলে তা করতে পারি। কিন্তু কর্নেল হামিদ বলেন, না সেটা লিখতে পারবো না। ঠিক আছে, গোসল করান। তবে দেরি করতে পারবেন না।
বেবী মওদুদ লিখেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুর মাথার পেছনে একটা গুলি করা হয়েছিল। নয়টা গুলি চক্রাকারে বুকের নিচে করা হয়। পায়ের রগ কাটা ছিল, একটা আঙ্গুলেও গুলি ছিল। খুব দ্রুত লাশ দাফন করে কবরের ওপরে মাটি চাপা দিয়ে উঠোনের বরই গাছের কাঁটাভরা ডাল চাপানো হলো। হেলিকপ্টার চলে যাবার আগে বাইগার নদীর পানিতে রক্ত ধুয়ে টুঙ্গীপাড়ার মাটিতে ফেলে যায়।’
বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দরজা সিল করে রেখে সৈন্যদের পাহারার ব্যবস্থা করা হয় জানিয়ে বেবী মওদুদ লেখেন, ‘বঙ্গবন্ধুর পিতাকে দেখাশুনা করার জন্য সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিল নির্মল। সেই নির্মল শুধু কান্নাকাটি করে সেখানে পড়ে রইলো। কিন্তু কবরের কাছে বঙ্গবন্ধুর কোনও আত্মীয় বা গ্রামের লোকজনদের যেতে দেওয়া হতো না।’
/জেএ/এবি/








