ঢাকা মেডিক্যালের মর্গ থেকে কেমন করে একজনের লাশ আরেকজন নিয়া যায়? ছেলেটা মরে গেল, এখন যদি তার লাশটাও না পাই, তাহলে ওর বাবা-মার সামনে কেমন করে দাঁড়াবো? ওর মায়ের কাছে কি ছেলের লাশটাও নিয়ে যেতে পারবো না, এ প্রশ্ন টাম্পাকো দুর্ঘটনায় নিহত মামুনের স্বজনদের। ক্ষোভের সঙ্গে তারা বলেন,‘এখানে এসে লাশ না পেয়ে মর্গের লোকজনকে ছবি দেখালাম।অনেক টালবাহানার পরে তারা বলেন, ‘আপনাদের এই লাশতো নিয়ে গেছে। টাম্পাকো কারখানার ক্লিনার মামুনের লাশ মনে করে তার পরিবার জুয়েলের লাশ নিয়ে গেছে।’
আজ রবিবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে জুয়েলের লাশের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার পর তার স্বজনরা বাংলা ট্রিবিউনকে এসব কথা বলেন ।
‘জুয়েলের বাবা-মা অসুস্থ, তারা বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন, ছোটবোনও অজ্ঞান হয়েছে কয়েকবার।বোনটাকে যে বড় আদর করতো’ বলছিলেন জুয়েলের খালা রুনা আক্তার।তিনি বলেন, ‘‘লাশ এখন কেমনে পাবো জিজ্ঞেস করলে একজন জানাইছে, ‘যেহেতু একটা পরিবার নিয়ে গেছে, তাই এই লাশ ফেরত এলে তার ডিএনএ টেস্ট হবে’ তারপর আমাদের লাশ দেওয়া হবে। সেটাতো অনেক সময়ের ব্যাপার।ছেলের লাশ না দেখে ওর বাবা-মা কেমনে থাকবে।’’ ।
জুয়েলের বড় মামা মোহাম্মদ কাওসার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা জুয়েলের খোঁজে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরেছি।আহতদের মধ্যে খোঁজ নিয়েছি জুয়েল আছে কিনা।কিন্তু পোলাটা যে এভাবে ডোমঘরে শুইয়া আছে সেইটাতো বুঝি নাই, মাথায় আসে নাই। ছেলেডারে এমনে হারাইতে হইলো,এখন রলাশটাও পাচ্ছি না।আমার বোনরে এখন কী জবাব দেবো।’
জানা গেল, চাঁদুপরের জুয়েল টঙ্গীর নর্দার্ন কোম্পানিতে চাকুরি করতেন প্রায় সাড়ে পাঁচবছর ধরে। থাকতেন টঙ্গী বাজারের পাশে খালা-মামাদের বাসায়।
জুয়েলের মামী আমেনা বেগম বলেন, ‘‘ভোর ছয়টায় জুয়েলের ডিউটি ছিল।পৌনে ছয়টায় সে বাসা থেকে বের হয়ে ওই রাস্তার পাশ দিয়েই হেটে যাচ্ছিলো।টিভিতে কারখানার আগুনের খবর দেখার পর ফোন করলে ওর ফোন বন্ধ পাই। সেই ফোন আর খোলে নাই।তখন থেকেই আমরা টঙ্গীর সব হাসপাতালে খোঁজ নিয়েছি।কাল সারাদিন সব জায়গায় খুঁজছি। আজ সকালে ছবিসহ টঙ্গী থানায় গেলে ‘তারা বলে আপনারা ঢাকা মেডিক্যালের মর্গে যান, ওখানে লাশ আছে।’ কিন্তু এসে দেখি লাশ নিয়ে গেছে আরেক পরিবার।’’
রুনা আক্তার বলেন,‘আজ ওর বাড়ি যাবার কথা ছিল। দু’ভাই আর ছোট এক বোনের মধ্যে জুয়েলই বড়।পরিবারের দায়িত্বও ছিল তার ওপর, সংসারটা চালাতো জুয়েলই।ঈদে বাড়ি যাবে বলে ব্যাগ গোছাচ্ছে গত এক সপ্তাহ ধরে। বাবার চোখের অপারেশন করাবে সেজন্য টাকা জমাচ্ছিল। মায়ের জন্য ওষুধ কিনেছে। ছোট বোনের জন্য জামা, ভাইয়ের জন্য শার্ট।’
তিনি বলেন, ‘আমরা জুয়েলের লাশ না নিয়ে ফিরবো না।সকাল থেকে এখানে বসে আছি। যতদিন বসে থাকতে হয় থাকবো কিন্তু আমাদের ছেলেকে ফেরত নিয়ে যাবো।এসময় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার হেলালুদ্দীন আহমেদ উপস্থিত হলে স্বজনরা তাকেও জুয়েলের লাশের বিষয়টি অবহিত করেন।’
তাকে উদ্দেশ করে রুনা আক্তার বলেন, ‘ছেলেটাকে যেন বাড়ির পাশে কবর দিতে পারি, সে ব্যবস্থা আপনারা করে দেন।ওর বাবা-মা যেন কবরটা একটু দেখতে পারে।’ জবাবে হেলালুদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘মরদেহ দেওয়ার মালিকতো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তারপরও বিষয়টি মানবিক হওয়াতে আমরা খোঁজ নেবো।’
একজনের লাশ অন্য পরিবারকে দেওয়া প্রসঙ্গে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘লাশ হস্তান্তরের বিষয়টি আমাদের না। এটি পুলিশের কাজ। তারপরও বিষয়টি যেহেতু অত্যন্ত স্পর্শকাতর এ ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’
এপিএইচ/








