‘আলেয়া কাথারেনা আইদরী খজকানালে’

উদিসা ইসলাম
০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০৭:৪২আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১৪:১৩

‘আলেয়া কাথারেনা আইদরী খজকানালে’ সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর এক উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “আপনাদের ভাষায় ‘আমি ভাষার অধিকার চাই’কে কী বলবেন?” তিনি সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্নটির উত্তর দিতে পারেননি। এক বড় ভাইয়ের সাহায্য নিয়ে কিছুক্ষণ পর বললেন, ‘আলেয়া কাথারেনা আইদরী খজকানালে'। ওই ব্যক্তি জানালেন, নিজেদের ভাষায় কথোপকথনের সময় সমস্যা হয় না, কিন্তু অনুবাদের ক্ষেত্রে তাদের বেশ বেগ পেতে হয়।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বর্ণমালা রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করা হয় না। তারা নিজ ভাষায় শিক্ষা গ্রহণের অধিকার থেকে বঞ্চিত। তাদেরকে লেখাপড়া করতে হয় বাংলা ও ইংরেজি ভাষায়। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষরা বলছেন, নিজ ভাষায় শিক্ষা নেওয়ার অধিকার না থাকায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে তাদের বর্ণমালা। এমনকি বর্তমানে তাদের মুখের ভাষাতেও বাংলা শব্দের ব্যবহার প্রচুর। তাদের আশঙ্কা, ভবিষ্যত প্রজন্ম হয়তো কথ্যভাষাও ভুলে যাবে।

এ বছর প্রথমবারের মতো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু পার্বত্য এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের হাতে এখনও বই পৌঁছায়নি। এ প্রসঙ্গে সাংবাদিক ও নারী অধিকার কর্মী মুক্তাশ্রী চাকমা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাঙামাটি শহরসহ আশেপাশের এলাকায় বইয়ের হদিশ পাওয়া যায়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘পাহাড়ে মাতৃভাষায় শিক্ষা দানের ফলে এখানকার সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় লাভবান হবে। কিন্তু তুলনামূলকভাবে সংখ্যায় যারা কম, তারা হবে না। কারণ যে স্কুলে ১০ জন চাকমার বিপরীতে একজন মারমা শিশু লেখাপড়া করে, সেই স্কুলে মারমা শিক্ষার্থীর জন্য মাতৃভাষায় শিক্ষার আলাদা ব্যবস্থা করা হবে না। মারমা শিশু লেখাপড়া করে, সেই স্কুলে মারমা শিক্ষার্থীর জন্য মাতৃভাষায় শিক্ষার আলাদা ব্যবস্থা করা হবে কি হবে না সে ব্যাপারেও সরকারের তরফ থেকে এখন পর্যন্ত কোনও দিকনির্দেশনার কথা আমরা শুনিনি।'

‘আলেয়া কাথারেনা আইদরী খজকানালে’ মুক্তাশ্রী চাকমা বলেন, ‘এত বছর ধরে নিপীড়নের মধ্য দিয়ে আমরা যে নিজেদের সংস্কৃতি হারিয়েছি, সেই বোধও আমাদের অবশিষ্ট নেই। তবে আশার কথা হলো, ইদানীং চাকমা হরফে দোকানের নাম ও পোস্টার হওয়ার কারণে নতুন করে এগুলো পরিচিত করে তোলার প্রচেষ্টা দেখা দিয়েছে, যেটা আমরা ছোটবেলায় দেখিনি।’

জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ১৯৫৭ সালের ৫ জুন ৪০তম অধিবেশনে ১০৭ নং কনভেশনে আদিবাসী ও উপজাতীয় ভাষা বিষয়ে প্রাধান্য দিয়ে কিছু নীতিমালা তৈরি করে। বাংলাদেশ এ কনভেশনে স্বাক্ষর করা অন্যতম দেশ। কনভেশনের ২৩(১) অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, ‘সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর ছেলেমেয়েদের তাদের মাতৃভাষায় পড়তে ও লিখতে শিক্ষা দান করতে হবে। কিংবা যেখানে এটা সম্ভব নয়, সেখানে তাদের সমগোত্রীয়দের মধ্যে সাধারণভাবে বহুল প্রচলিত ভাষায় শিক্ষা দান করতে হবে।’ অনুচ্ছেদ ২৩(২)এ উল্লেখ রয়েছে, ‘মাতৃভাষা বা আদিবাসী ভাষা থেকে জাতীয় ভাষা কিংবা দেশের একটি অফিসিয়াল ভাষায় ক্রমান্বয়ে উত্তরণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’

কিন্তু এর সঠিক প্রয়োগ এখনও সম্ভব হয়নি উল্লেখ করে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের নেত্রী ইলিরা দেওয়ান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ছোটবেলায় নিজের বর্ণমালায় পড়া তো দূরে থাক, বর্ণমালা শেখানোও হয়নি আমাকে। যে কারণে এখন নিজের বর্ণমালায় লেখার প্রসঙ্গ আসলে কুঁকড়ে যাই। তবে আমার মনে হয়, এজন্য আমি বা আমরা দায়ী নই। বাংলা আমার মাতৃভাষা নয়, এজন্য আমাকে সিক্স/সেভেন পর্যন্ত সংগ্রাম করে বাংলা শিখতে হয়েছে। আমি মনে করি, নিজের ভাষায় পড়ার সুযোগ হলে আমাদের মেধা আরও সুন্দরভাবে বিকশিত হতে পারতো।’

‘আলেয়া কাথারেনা আইদরী খজকানালে’ এ বিষয়ে প্রাবন্ধিক ও গবেষক সালেক খোকন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট আইন ২০১০ এ উল্লেখ আছে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও ক্ষুদ্র জাতিসমূহের ভাষা সংরক্ষণ, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ এবং যে সব জাতিগোষ্ঠীর ভাষার লেখ্যরূপ নেই, সে সব ভাষার লেখ্যরূপ প্রবর্তন করা। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট ২০১০ সালে সে লক্ষ্য সামনে রেখেই যাত্রা শুরু করে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির তেমন কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়েনি।’

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. ইমতিয়াজ আলী অবশ্য আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করছেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা নতুন একটি প্রতিষ্ঠান। ধীরে ধীরে সবই করা হবে।’ সংখ্যাগুরুদের ভাষা সবসময়েই আধিপত্যশীল কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ভাষিক ঔপনিবেশিকতা যুগে যুগেই ছিল।’

আদিবাসী বিষয়ক গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের শিক্ষক মেসবাহ কামাল বলেন, ‘বৃহত্তর যোগাযোগের জন্য সংখ্যালঘু ভাষাভাষীকে সংখ্যাগুরুদের ভাষা শিখতেই হয়। কিন্তু বাংলাদেশে যে বাংলা ছাড়াও আরও অনেক ভাষা রয়েছে, তার খবর সাধারণ মানুষ জানে না৷ বাংলাদেশে যে বহু জাতি ও বহু ভাষার মানুষ রয়েছে, সেটা সংবিধানে প্রতিফলিত হয়নি৷’ বাংলাদেশে ১৩/১৪টি ভাষা এমনই শোচনীয় পর্যায়ে রয়েছে যে, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে এদের বেশ কয়েকটি হারিয়ে যাবে।’ 

/ইউআই/এএআর/আপ-এমডিপি/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
অধিনায়ক হিসেবে ফিরেই জয় দেখলেন কুশল মেন্ডিস
অধিনায়ক হিসেবে ফিরেই জয় দেখলেন কুশল মেন্ডিস
মার্কিন সেনা হত্যা করলে যুদ্ধবিরতি শেষ, উপদেষ্টাদের জানালেন ট্রাম্প
মার্কিন সেনা হত্যা করলে যুদ্ধবিরতি শেষ, উপদেষ্টাদের জানালেন ট্রাম্প
ময়মনসিংহ মেডিক্যালে হাম উপসর্গে আরও এক শিশুর মৃত্যু 
ময়মনসিংহ মেডিক্যালে হাম উপসর্গে আরও এক শিশুর মৃত্যু 
বিক্রির জন্য নিলামে উঠছে এই আধুনিক দুর্গটি
বিক্রির জন্য নিলামে উঠছে এই আধুনিক দুর্গটি
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম