দলীয় মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে নির্বাচিত হয়ে আসা সংসদ সদস্যদের সংসদীয় দলে ফিরিয়ে নেওয়ায় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতারা ক্ষোভ জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন কেন্দ্রীয় নেতা, স্বতন্ত্র এমপিদের সঙ্গে পরাজিতরা এবং বিভিন্ন জেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। দলের এ উদ্যোগ আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে হওয়ায় এ নিয়ে প্রকাশ্যে কেউ কথা বলছেন না। তবে ভেতরে ভেতরে তারা অসন্তুষ্ট।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্ষুব্ধ হওয়ার পেছনে অন্য একটি কারণও রয়েছে। তা হলো, স্বতন্ত্রদের দলে ফিরিয়ে নেওয়ায় স্বতন্ত্র এমপিদের এলাকায় যারা পরের নির্বাচনে মনোনয়ন পাবেন বলে আশা করছিলেন, তারা আর সে সুযোগ পাবেন না বলে মনে করছেন। তবে কেন্দ্রীয় যে ক’জন নেতা প্রকাশ্যে মুখ খুলেছেন তারা বলছেন, স্বতন্ত্র এমপি হলেও তারা আওয়ামী লীগেরই। তাদের জনপ্রিয়তার কারণে ‘ঘরের ছেলেদের ঘরে ফেরানো’ হয়েছে।
স্বতন্ত্র এমপি ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুনের দলে ফেরানোর সংবাদ পেয়ে কুমিল্লার মুরাদ নগরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যে ক্ষোভ দেখিয়ে বিরোধিতায় নেমেছেন। ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে তারা ইউসুফ আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ এনেছেন।
মুরাদনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সৈয়দ আহাম্মদ হোসেন আউয়াল অভিযোগ করে বলেন, ‘স্থানীয় স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুনের ছত্র-ছায়ায় এলাকার সকল সন্ত্রাসীদের নেতৃত্ব দেন উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক মাসুদ চেয়ারম্যান ও তার সঙ্গীরা। আর তারাই ২৮ মার্চ উপজেলা আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে বঙ্গবন্ধুর ছবি ভাংচুর করে।’
ক্ষুব্ধ ওই নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ এলাকায় আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ প্রকাশ করে নির্বাচিত হয়েছে। এটা দলের শৃঙ্খলা বিরোধী কাজ। তাই তাদের বিদ্রোহের শাস্তি না দিয়ে দলে ফেরানোর উদ্যোগ কতখানি যুক্তিযুক্ত, তা সবার অনুধাবন করা জরুরি।
তবে কেউ কেউ বলছেন, ঘরের লোকজন ঘরে ফিরে এসেছে। স্বতন্ত্র এমপিদের আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলে যোগদান নিয়ে দলটির ভেতরে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
স্বতন্ত্র পরিচিতি পাওয়া এসব এমপিরা মুলত আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী। আর বিদ্রোহের দায়ে অনেককে সাময়িক বহিষ্কারও করা হয়েছে। বিদ্রোহের অপরাধকে ক্ষমা করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে অপরাধ আরও বাড়বে বলে মনে করেন দলটির অনেক কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতা। তারা বলছেন, যোগ দেওয়া এমপিরা স্বতন্ত্র হলেও তারা মূলত বিদ্রোহী।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নওগাঁ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল মালেক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নওগাঁ-৩ থেকে স্বতন্ত্র নির্বাচিত এমপি ছলিম উদ্দিন তরফদার ছিল আমার রাজনৈতিক শিষ্য। ২০১৪ সালের নির্বাচনে দল থেকে আকরাম হোসেন চৌধুরীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। কিন্তু বিদ্রোহ প্রকাশ করে ছলিম নির্বাচন করায় আমি তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘নেত্রী (শেখ হাসিনা) যদি তাকে ক্ষমা করে দেন, আমাদের কিছু করার নাই।’
গাইবান্ধা জেলার সাধারণ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গাইবান্ধা-৪ আসন থেকে আবুল কালাম আজাদ বিদ্রোহ প্রকাশ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হন। এ আসনে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দেয় মনোয়ার হোসেনকে। এখন বিদ্রোহী কাউকে যদি কেন্দ্র থেকে ক্ষমা করে দেয়, তৃণমূলের কিছুই করার থাকে না।’
মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নেছার আহমদ বলেন, ‘মৌলভীবাজার-২ আসন থেকে আওয়ামী লীগ মনোনয় দেয় সৈয়দ ফজলুল করিমকে। এখানে বিদ্রোহ প্রকাশ করে নির্বাচন করেন আবদুল মতিন। তিনি নির্বাচিত হন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে। দল মনোনীত প্রার্থীর বিপক্ষে বিদ্রোহ প্রকাশ করেই নির্বাচিত হন মতিন।’ তিনি আরও বলেন, ‘দল কি মনে করে তাদের নিজেদের এমপি করে নিয়েছেন, সেটা দল ভালো জানে। এই নিয়ে কথা বলতে চাই না।’
কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী বলেন, ‘কুষ্টিয়া-১ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী ছিলেন আফাজউদ্দিন। কিন্তু ২০১৪ সালের নির্বাচনে রেজাউল হক চৌধুরী বিদ্রোহ প্রকাশ করে বিজয়ী হন। বিদ্রোহের অপরাধে কেন্দ্র শাস্তি না দিলে আমাদের কিছু করার নাই। সংসদ নেতা শেখ হাসিনা যা ভাল মনে করেছেন, সেটাই করেছেন।’
তবে ওই স্বতন্ত্র এমপিদের আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতারা বিদ্রোহী হিসেবে আখ্যায়িত করলেও, ওই কথিত বিদ্রোহীরা নিজেদের আওয়ামী লীগের নেতা বলেই দাবি করেন।
এ প্রসঙ্গে নরসিংদী-২ আসন থেকে স্বতন্ত্র নিবাচিত কামরুল আশরাফ খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি বিদ্রোহী নই। আমি আওয়ামী লীগের। দল আবার আমাদের ফিরিয়ে নিয়েছে। আগামী ৭ মে সংসদীয় দলের সভায় যোগ দেবো।’
নরসিংদী-৩ আসন থেকে নিবাচিত সিরাজুল ইসলাম মোল্লা বলেন, ‘আমি বিদ্রোহী নই, আওয়ামী লীগের। এতোদিন দলের সংসদীয় সভায় যোগ দিতে না পেরে খারাপ লাগতো। এখন যোগ দিতে পারব, তাই ভালো লাগছে।’
কুষ্টিয়া-১ আসন থেকে নির্বাচিত রেজাউল বলেন, ‘আমি নৌকার বিরুদ্ধে নিবাচন করিনি। প্রার্থীর বিরুদ্ধে নিবাচন করেছি। আমি বিদ্রোহী নই, আওয়ামী লীগের।’
নওগাঁ-৩ আসনের স্বতন্ত্র নির্বাচিত এমপি ছলিম উদ্দিন তরফদার বলেন, ‘আমি বিদ্রোহী নই, বিশেষ পরিস্থিতিতে নির্বাচন করেছি। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে নেতাকমীদের চাপে নিবাচন করেছি।’
/এসএ/








