বিস্ফোরক ও আগ্নেয়াস্ত্র আনার সুবিধা ও অভিযান চললে সহজে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ এ তিন বিষয়কে মাথায় রেখে দেশের সীমান্ত এলাকাগুলোতে আস্তানা গড়ে তুলছে জঙ্গিরা। গত কিছুদিন ধরে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় একাধিক জঙ্গি আস্তানার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া ও সেগুলোতে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর অভিযানে অস্ত্রসহ বিস্ফোরক উদ্ধারের পর এ তথ্য পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও ঝিনাইদহের সীমান্ত এলাকায় একাধিক জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালিয়েছে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)। কর্মকর্তাদের ধারণা, দক্ষিণাঞ্চলসহ উত্তরবঙ্গ এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহ এলাকার সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোতে আরও জঙ্গি আস্তানা থাকতে পারে। এগুলোতে অভিযানের জন্য কড়া গোয়েন্দা নজরদারি চলছে।
কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেছেন, ‘সহজেই আত্মগোপন ও অস্ত্র-বিস্ফোরক সংগ্রহের জন্য সীমান্তবর্তী এলাকায় জঙ্গিরা আস্তানা তৈরি করছে একথা সত্য। তবে সম্প্রতি জঙ্গিদের মধ্যে বাসা ভাড়া নেওয়ার বদলে স্থানীয় অনুসারীদের বাসায় আস্তানা গড়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কারণ, আশপাশের লোকজন যেন সহজেই তাদের চিহ্নিত করতে না পারে। এছাড়া সীমান্ত এলাকাগুলোতে অবস্থান নিয়ে বড় ধরনের হামলা করা সুবিধা বলে জঙ্গিরা এসব এলাকা বেছে নিয়েছে।’
গত বছরের ১ জুলাই হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার পর রাজধানীতে কড়া নজরদারি শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঢাকা ও আশেপাশের এলাকায় একাধিক অভিযানও পরিচালনা করা হয়। একই সঙ্গে ঢাকার বাসিন্দাদের প্রতিবেশী ও ভাড়াটিয়াদের বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজখবর নেওয়া, অপরিচিত লোকজন সম্পর্কে পুলিশকে তথ্য দেওয়া এবং বাধ্যতামূলকভাবে ভাড়াটিয়া ফরম পূরণ করানোর নিয়ম চালু করা হয়। এ কারণে ঢাকায় আস্তানা তৈরি করতে হিমশিম খাচ্ছে এখন জঙ্গিরা।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ‘ঢাকায় ধারাবাহিক অভিযানের পর জঙ্গিরা দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। মফস্বল শহর এবং সীমান্তবর্তী গ্রাম বা শহরতলীতে আস্তানা বানাতে শুরু করেছে।’
সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা জানান, বোমা ও গ্রেনেড তৈরিতে জঙ্গিরা যেসব বিস্ফোরক ব্যবহার করে এর মধ্যে প্লাস্টিক জেল ও ডেটোনেটরগুলো ভারত থেকে নিয়ে আসে। এ কারণে সীমান্ত এলাকায় আস্তানা গড়ার চেষ্টা চালায় তারা। এছাড়া আগ্নেয়াস্ত্রও আনা হয় ভারত থেকে। আবার, চল্লাশি চালানোর সময় শীর্ষ জঙ্গিদের অনেকেই সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতের বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপন করে থাকে।
সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা জানান, নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা সোহেল মাহফুজ ওরফে হাতকাটা মাহফুজ, হাদীসুর রহমান সাগর, আব্দুস সামাদ আরিফ, পুরানো জেএমবির দুই শীর্ষ নেতা সালাউদ্দিন ওরফে সালেহীন এবং বোমা মিজানও ভারতে আত্মগোপন করে রয়েছে।
অনুসারী বাড়িওয়ালাদের ব্যবহার করছে জঙ্গি নেতারা
জঙ্গিরা যেসব বাড়িতে আস্তানা গড়ছে সেগুলোর বাড়িওয়ালারাও জঙ্গিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত! সম্প্রতি কয়েকটি আস্তানায় অভিযানের পর এ তথ্য জানান সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা। ঝিনাইদহে জঙ্গি আব্দুল্লাহ নিজেই বাড়ি করে বাসায় সহযোগীদের নিয়ে আস্তানা গেড়েছিল। সিটিটিসির অভিযানের আগেই সে ওই আস্তানা ছেড়ে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক আস্তানায় পুলিশের অভিযানে সে নিহত হয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের ধারণা।
সবশেষ রবিবার (৭ মে) ঝিনাইদহের মহেশপুরে যে জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালানো হয়েছে, ওই বাড়ির মালিক জহির এবং তার ছেলে জসিমও জঙ্গিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানান। এই আস্তানার সন্ধান পাওয়ার আগে শামীম জোয়ার্দার নামে স্থানীয় এক বাসিন্দাকে গ্রেফতার করা হয়। ওই ব্যক্তিও আস্তানা সংশ্লিষ্ট বাড়ির মালিক বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সিটিটিসির প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেছেন, ‘সাধারণত নিজের বাড়িতে থাকলে কেউ সন্দেহ করে না। যেহেতু জঙ্গিদের অনুসারীদের কারও কারও নিজেদের বাড়ি রয়েছে, তাই তারা সহযোগী জঙ্গি সদস্যদের নিজেদের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। কেউ যেন তাদের নিয়ে সন্দেহ করতে না পারে।’
গুলশান হামলাকারী নিবরাসের আশ্রয়দাতা ছিল শামীম
শামীম দীর্ঘদিন ধরে পুরনো জেএমবির কর্মী হিসেবে কাজ করে আসছিল। পরবর্তীতে সে নব্য জেএমবির মধ্যম সারির নেতা হিসেবে কাজ করতো। নব্য জেএমবির দক্ষিণাঞ্চলের শীর্ষ নেতা হিসেবে কাজ করতো আব্দুল্লাহ। তারই সহযোগী ছিল শামীম। গত বছর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলাকারী দলে থাকা নিবরাসকে ঝিনাইদহের জঙ্গি আস্তানায় থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল এই শামীম। তাকে গ্রেফতারের পরই মহেশপুরের জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পায় কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট।
সিটিটিসির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, ঝিনাইদহসহ সীমান্তবর্তী আস্তানাগুলোতে নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা মাইনুল ইসলাম ওরফে মুসা, সোহেল মাহফুজ, আব্দুস সামাদ ও হাদীসুর রহমান সাগরের যাতায়াত ছিল বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। তবে জঙ্গিরা ঘন ঘন আস্তানা পরিবর্তন করায় তাদের গ্রেফতার করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
/জেএইচ/টিএন/








