'সত্যায়ন' যেখানে ভুয়া!

রশিদ আল রুহানী
০৯ জুন ২০১৭, ০৭:৫৪আপডেট : ০৯ জুন ২০১৭, ১৬:৫০

ভুয়া সিল দিয়ে সত্যায়িত করছেন একজন চাকরি প্রার্থী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করেছেন ফজলে রাব্বী (ছদ্মনাম)। গত সপ্তাহে বাংলাদেশ টেক্সটাইলস মিলস করপোরেশনের প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে তিনি আবেদন করেন। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির চাহিদা অনুযায়ী সব সনদের কপি ও ছবি সত্যায়ন করে জমা দিতে হবে। চাকরি প্রত্যাশী অন্য তরুণদের মতো তিনিও সহজ রাস্তা ধরলেন। সোজা নীলক্ষেতের সিল-প্যাডের দোকানে গিয়ে অনেক গেজেটেড কর্মকর্তার সিল-প্যাডের মধ্য থেকে একটা বাছাই করে বাকি কাজটা সেরে ফেললেন নিজেই।

নিজেই কেন সত্যায়িত সিল মেরে স্বাক্ষর করলেন জানতে চাইলে রাব্বী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘একজন প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তাকে খুঁজে বের করে অনুনয়-বিনয় করে কাগজগুলোর সত্যায়ন করা বেশ কঠিন ও শ্রমসাধ্য কাজ। অনেক কর্মকর্তা আছেন যারা প্রকৃত কাগজপত্র নিয়ে গেলেও প্রচণ্ড জেরা করেন, ঘোরান, অনেকে চেনেন না বলে সত্যায়ন করতেও অস্বীকৃতি জানান। অনেকে নানা অজুহাত দেখিয়ে বলেন, ‘সময় নেই, পরে আসো’। তাই বাধ্য হয়ে নিজের কাগজ অন্যের নামসহ সিল ব্যবহার করে নিজেই সত্যায়িত করতে হয়।’’

নীলক্ষেত এলাকায় গড়ে উঠেছে সিল প্যাডের দোকান

অন্যের সিল-প্যাড তার অনুমতি ছাড়া ব্যবহার চরম অন্যায় কাজ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও চাকরিদাতাদের অযৌক্তিক দাবি পূরণে চাকরি প্রত্যাশীদের বেশিরভাগই এমন কাজ করে যাচ্ছেন অবলীলায়, যা কয়েক দশক ধরেই নিয়মিত চিত্র বলে জানিয়েছেন বয়োজ্যেষ্ঠরাও।

এভাবে ভুয়া সত্যায়িত করে আবেদন করলে আবেদন বাতিল হয় কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি এখন পর্যন্ত অন্তত ১৫ টি চাকরির আবেদন করেছি এভাবেই। যার প্রতিটিরই লিখিত পরীক্ষার জন্য মনোনীত হয়েছি। শুধু আমিই না, আমার ভার্সিটিতে যত বন্ধু-বান্ধব এবং পরিচিত মহল আছে সবাইকেই দেখেছি এভাবেই সত্যায়িত করেছে। তবে চাকরির আবেদন যদি নলাইনে করা যেত তাহলে আমাদের এমন ভোগান্তি হতো না এবং ভুয়া সত্যায়ন করারও প্রয়োজন হতো না।

নীলক্ষেতে বেশ কয়েকটি সিল-প্যাডের দোকান ঘুরে দেখা যায়, ইডেন কলেজ, ঢাকা কলেজ, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজসহ বেশ কিছু কলেজের শিক্ষকের নামে ভুয়া সিল বিক্রি করছেন নীলক্ষেতের সিল-প্যাড ব্যবসায়ীরা। যে সব শিক্ষকের নাম ব্যবহার করে ওইসব সিল প্যাড তৈরি করা হচ্ছে তারা নিজেরাও তা জানেন না।

ইডেন কলেজের মার্কেটিং বিভাগের এক শিক্ষক শারমিন জাহান তানিয়ার নামে সিল-প্যাড দেখা যায় নীলক্ষেতের এক দোকানে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওই শিক্ষক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি তো জানিই না আমার নাম পরিচয় ব্যবহার করে সিল তৈরি করা হয়েছে। এগুলো চরম অন্যায় ও প্রতারণা।’

এদিকে বর্তমানে দেশে প্রায় ২৬ লাখ বেকার যুবক রয়েছে বলে গেল সপ্তাহে এক পরিসংখ্যানে জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। অর্থাৎ প্রায় প্রতি ঘরেই রয়েছে অন্তত একজন করে বেকার যুবক। তারা সবাই কোথাও না কোথাও প্রতিদিনই চাকরির আবেদন করছেন। আর তার বেশিরভাগ কাগজপত্র সঠিক হলেও এগুলোর সত্যায়ন একেবারেই ভুয়া অর্থাৎ প্রকৃত প্রথম শ্রেণির গেজেটেড অফিসার দ্বারা সত্যায়িত নয় বলেই মনে করেন অনেকেই।

তারা বলছেন, সনদের কপিতে ভুয়া সত্যায়িত করে সেটা জমা দেওয়ার পর চাকরির পরীক্ষায় বসতে পারার সুযোগ পাওয়া মানেই ওই আবেদনটি সঠিক কি না তা যাচাই-বাছাই হয়নি। এছাড়া এখন ডিজিটালের সময়, তাহলে কেন শতভাগ নিয়োগ প্রক্রিয়া অনলাইনে আবেদন নয়?

ভূয়া-সীল

শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এই পদ্ধতির সমালোচনা করে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মূল সনদ যাচাই না করে কেউ কাউকে চাকরি দেয় না। তাহলে আবেদন করার সময় কেন সত্যায়িত সনদের কপি লাগবে? আবার সত্যায়িত করতে গেলে যে কত হয়রানি হয়, কত সময় নষ্ট হয় এমনকি কতগুলো কাগজও নষ্ট হয় বেকারদের। এই ধরনের বাড়তি বোঝা বেকারদের ঘাড়ে এখনও চেপে আছে, যদিও বাংলাদেশ এখন ডিজিটাল হয়েছে। এই ডিজিটালের সঠিক সুবিধা তো দিতে হবে সবাইকে। অন্য সবাইকে না পারা যায় অন্তত বেকারকে তো দেওয়া অবশ্যই আগে দরকার। যত দিন যাচ্ছে ততই মানুষ ব্যস্ত হয়ে পড়ছে, ফলে এসব কাজ যদি অনলাইনে করা হয় তাহলে কাজ আরও সহজ হবে। চাকরির আবেদন করতে হলে ব্যাংক ড্রাফটের টাকা এখনও ব্যাংকে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে দিতে হয়। কিন্তু এটাও অনলাইনে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা উচিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘সত্যায়িত করা নিয়ে সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত হন গ্রাম ও মফস্বল এলাকা থেকে আসা চাকরি প্রত্যাশীরা। সাধারণত তাদের জানাশোনা গেজেটেড কর্মকতা থাকেন না, গ্রাম পর্যায়ে ভুয়া সিলের ব্যবস্থা বা ব্যবহারও খুব একটা নেই। ফলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয় তাদেরই।’

এদিকে জানা যায়, ২০১৫ সালে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সচিব পর্যায়ের একটি বৈঠকে সরকারি চাকরির আবেদনে কোনও সনদের সত্যায়িত কপি ও সত্যায়িত ছবি জমা দিতে হবে না বলে একটি সিদ্ধান্ত হয়। ওই সিদ্ধান্তে বলা হয়, আবেদনকারীরা অনলাইনে যোগ্যতার ভিত্তিতে আবেদন করবেন এবং পরীক্ষায় বসার অনুমতি পাবেন। কেবল যারা পাশ করবেন তাদেরকে পরবর্তীতে মৌখিক পরীক্ষার সময় মূল সনদ দেখাতে হবে।

তবে এমন সিদ্ধান্ত হলেও তা এখনও পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। যদিও বিসিএস পরীক্ষা, ব্যাংকের চাকরির আবেদন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি আবেদনসহ বেশ কিছু নিয়োগ পদ্ধতিতে অনলাইন আবেদন গ্রহণ পদ্ধতি চালু হয়েছে কয়েক বছর আগেই। তবে এখনও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিজের হাতে আবেদন লিখে সত্যায়িত সনদসহ জমা দিতে হয়। ফলে সনদ সত্যায়িত করতে চাওয়া চাকরিপ্রার্থীদের ভোগান্তি যেমন বাড়ে, তেমনি ভুয়া সত্যায়নের সংখ্যাও পৌঁছে  নব্বুই ভাগের কোঠায়।  

সরকরি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক এ বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা ৩৩তম বিসিএস থেকে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করছি। আবার ২০১৫ সাল থেকে নন ক্যাডারে আবেদনও অনলাইনেই নিচ্ছি—যেখানে সত্যায়িত সনদের কপি জমা দেওয়ার ঝামেলা নেই। তবে ভাইভা বোর্ডে প্রার্থীকে সব সনদের মূল কপি দেখাতে হয়, যা আমরা যাচাই বাছাই করি।

/আরএআর/টিএন/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মাজারের কুমিরটি পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিবিড় পর্যবেক্ষণে
মাজারের কুমিরটি পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিবিড় পর্যবেক্ষণে
শিশু রামিসা হত্যা মামলার যুক্তিতর্ক আজ, আদালতে আনা হয়েছে আসামিদের
শিশু রামিসা হত্যা মামলার যুক্তিতর্ক আজ, আদালতে আনা হয়েছে আসামিদের
৫৩০০ বছর পরও মমিতে জীবিত অণুজীব
৫৩০০ বছর পরও মমিতে জীবিত অণুজীব
কথা বলার সময় স্মার্টফোন দ্রুত গরম হয়ে যায়? কারণ ও প্রতীকারের উপায়
কথা বলার সময় স্মার্টফোন দ্রুত গরম হয়ে যায়? কারণ ও প্রতীকারের উপায়
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের