ভারী বর্ষণ আর তীব্র যানজট, দুইয়ে মিলে সড়কে জলজটে নাকাল হয়ে পড়েছেন রাজধানীবাসী। প্রতিদিনের যানজটের মতো মঙ্গলবার (১১ জুলাই) সকালের টানা বৃষ্টিতে বেড়েছে দুর্ভোগের মাত্রা। অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, ড্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়া, পানিনিষ্কাশন না হওয়া ও পুকুর, ডোবা ও খাল বেদখল হওয়ায় সড়কে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এসব কারণে যানবাহনের ধীরগতি থাকায় অফিসগামী মানুষকে পড়তে হয়েছে চরম ভোগান্তিতে।
মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টায় অফিসের কাজে রাজধানীর পান্থপথ থেকে গুলিস্তান যেতে সিএনজি ভাড়া করেছেন একটি হাউজিং কোম্পানির কর্মকর্তা ইয়াছিন আরাফাত। তখন বৃষ্টি হচ্ছিল মুষলধারে। স্বাভাব্কি অবস্থায় পান্থপথ থেকে গুলিস্তান পৌঁছাতে আধঘণ্টার বেশি সময় লাগার কথা নয়। কিন্তু গুলিস্তানে পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করে আবার পান্থপথে আসতে তার সময় লেগেছে পুরো তিন ঘণ্টা। এতে অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বকা শোনার পাশাপাশি তীব্র বিরক্তি সহ্য করতে হয়েছে তাকে।
এই চাকরিজীবী বাংলা ট্রিবিউনকে বললেন, ‘পান্থপথ থেকে যদি গুলিস্তানে যেতে আসতে তিন ঘণ্টা সময় চলে যায় তাহলে এই শহরে বাস করে লাভ কী! এই তিন ঘণ্টায় তো নোয়াখালী থেকে সায়েদাবাদে চলে আসা যেত। অথচ এই সময়ে পান্থপথ থেকে গুলিস্তানে যাওয়া-আসা করা যায় না! বড় আশ্চর্য লাগে যানজট মেটাতে কোনও উদ্যোগ নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। সামান্য বৃষ্টি হলে সড়কে জমে যায় হাঁটু পানি। এভাবে কোনও শহরের ব্যবস্থাপনা চলতে পারে না। এজন্য ঢাকার দুই মেয়রকে আরও বেশি উদ্যোগী হতে হবে।’
এদিন সকালের বৃষ্টির পর কারওয়ান বাজারের তিতাস ভবন মোড় থেকে রেলগেট পর্যন্ত তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা গেছে। এখান থেকে প্রতিদিন যাত্রী নিয়ে কয়েকশ’ মাইক্রোবাস হাতিরঝিল হয়ে রামপুরা বাজারে যায়। এসব বাহনে ওঠার জন্য যাত্রীরা ওই ভবনের সামনে অবস্থান নেন। কিন্তু মঙ্গলবার সকালে জলাবদ্ধতার কারণে বাসগুলো ওই স্থানের পরিবর্তে এফডিসি মোড় থেকে ছেড়ে গেছে। এতে মাইক্রোবাসের পাশাপাশি যাত্রীদের পড়তে হয়েছে সীমাহীন দুর্ভোগে।
একই অবস্থা দেখা গেছে মতিঝিলে। সকালে টানা বৃষ্টির কারণে এই এলাকার মূল সড়কের পাশাপাশি অলিগলিতেও হাঁটুপানি জমে যাওয়ায় দেখা গেছে জলাবদ্ধতা। মতিঝিলের স্থানীয় বাসিন্দা গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘বৃষ্টি হলে বাসা থেকে বের হওয়া দায় হয়ে পড়ে। বের হলেই সড়কের পানিতে চলাফেরা করা যায় না। তখন রিকশা ভাড়া বেড়ে যায়। তাছাড়া রাস্তাঘাটের অনেক ম্যানহোল খোলা। কোন স্থানে গিয়ে আবার ম্যানহোলে পড়ে ড্রেনে ভেসে যাই সেই ভয় হয়। এজন্য চলতে হয় সাবধানে।
পুরো নগরীর সর্বত্রই শুধু এ ধরনের ভোগান্তির চিত্র। উত্তর সিটির নতুন বাজার থেকে জোয়ার সাহারা, সাতরাস্তা থেকে কারওয়ান বাজার মোড়, গুলশান-১ ও গুলশান-২ এলাকার বিভিন্ন সড়ক, মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা, উত্তরা, খিলক্ষেত এলাকার প্রধান সড়ক, কালশী, ধানমন্ডি, লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর সায়েন্স ল্যাব থেকে নিউমার্কেট-নীলক্ষেত এলাকা, শান্তিনগর, পুরান ঢাকার আলাউদ্দিন রোড, নাজিম উদ্দিন রোড, শহীদ নগর এলাকার অলিগলি, মালিবাগ, মধুবাজার, গুলিস্তান, পুরান ঢাকার শাঁখারী বাজার, জুরাইন, যাত্রাবাড়ির বিভিন্ন সড়কে জলজটের খবর পাওয়া গেছে। এসব সড়কে রিকশা, সিএনজি, মাইক্রোবাস, বাস ও মোটরসাইকেলসহ যানবাহনগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেছে, রেহাই পাওয়া যায়নি যানজট থেকে। অপ্রস্তুত অনেকে একাকার হয়েছেন বৃষ্টিতে ভিজে। এ কারণে ওইসব এলাকার বাসিন্দাদের পড়তে হয়েছে সীমাহীন দুর্ভোগে।
বৃষ্টিতে নগরীর এমন পরিস্থিতির কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা গেছে, বর্ষাকাল প্রায় শেষ হয়ে গেলেও এখনও সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি শেষ হয়নি। নগরীর অধিকাংশ সড়কে চলছে বিভিন্ন সেবা সংস্থার উন্নয়ন কাজ। দুই সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি ঢাকা ওয়াসা, তিতাস, ডেসা, ডেস্কো ও বিটিসিএ-সহ অন্যান্য সেবা সংস্থাগুলো তাদের সার্ভিস লাইনের জন্য সড়কের বিশাল অংশগুলো কেটে রেখেছে। এ কারণে অধিকাংশ সড়ক হয়ে পড়েছে সরু। এ কারণে বাড়ছে যানজট, বৃষ্টিতে তা রূপ নিচ্ছে জলজটে।
তবে জলাবদ্ধতার জন্য অন্যান্য সংস্থার অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়িকেই দায়ী করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম। তার দাবি, নগরীতে বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি করপোরেশনের ইমার্জেন্সি টিম মাঠে নামে।
ডিএসসিসি’র এই কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতিটি ওয়ার্ডে স্থানীয় কাউন্সিলর ও আমাদের পরিচ্ছন্নতা পরিদর্শকদের নেতৃত্বে ১০ জন করে টিম রয়েছে। তারা বৃষ্টি হলে যেখানে জলাবদ্ধতা দেখা দেয় সেইসব স্থানের ম্যানহোলগুলো খুলে দেন। ড্রেন ব্লক থাকলে তা সচল করে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। প্রতিদিনের মতো আজও তারা কাজ করেছে।’
ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
/এসএস/জেএইচ/








