সিটিং সার্ভিসের বৈধতা দিতে মালিকদের চাপ ও কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে তৈরি হয়েছে আইনি জটিলতা। তাই এ নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছে না বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। তাদের দেওয়া রুট পারমিটে এর কোনও বৈধতা না থাকায় সিটিং সার্ভিস নিয়ে গঠিত কমিটির সুপারিশটি সাংঘর্ষিক। এ কারণে বেকায়দায় রয়েছে বিআরটিএ।
সূত্র জানিয়েছে,সিটিং সার্ভিস চালু হলেও কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে বিআরটিএ’র সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ কারণে সিদ্ধান্ত নিতে গড়িমসি করছে সংস্থাটি।
রাজধানীতে বিআরটিএ’র রুট পারমিটে সিটিং সার্ভিস চালানোর কোনও বৈধতা নেই। তবুও দীর্ঘদিন ধরেই চলছে এ ধরনের বাস। গণপরিবহনে সিটিং সার্ভিস চালুর পর এ নিয়ে নানা অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এসব বাস বন্ধে চলতি বছরের ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়।
গত ১৬ এপ্রিল থেকে সড়কে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে নামে বিআরটিএ। ওইদিন থেকে রাস্তায় বাস নামানো বন্ধ করে দেন মালিকরা। এ কারণে সড়কে দেখা দেয় পরিবহন সংকট।
টানা চারদিন যাত্রীদের দুর্ভোগের পর ১৯ এপ্রিল বাস মালিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসে বিআরটিএ। সভা শেষে সিটিং সার্ভিসের বিরুদ্ধে অভিযান স্থগিত করে এটি চলবে কিনা তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আট সদস্যের কমিটির গঠন করে দেওয়া হয়। এতে আছেন বাস মালিক ও শ্রমিক সমিতি,বিআরটিএ কর্মকর্তা, সুশীল সমাজ ও সাংবাদিকরা। কমিটিকে তিন মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছিল।
গত ১৭ অক্টোবর বিআরটিএ’র কাছে প্রতিবেদনটি জমা দিয়েছে ওই কমিটি। এরপর গত ২৫ অক্টোবর সচিবালয়ে এক সভায় সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের জানান, সিটিং সার্ভিসের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে এক সপ্তাহের মধ্যে। কিন্তু তার এ ঘোষণা শেষের এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও কোনও সিদ্ধান্তেই পৌঁছাতে পারেনি মন্ত্রণালয়।
বাংলা ট্রিবিউনকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিআরটিএ’র একটি সূত্র জানিয়েছে, একদিকে মালিকদের চাপ ও কমিটির সুপারিশ,অন্যদিকে বিআরটিএ’র রুট পারমিটে সিটিং সার্ভিসের কোনও বৈধতা না থাকায় বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কমিটির প্রধান ও বিআরটিএ পরিচালক (রোড সেফটি) শেখ মো. মাহবুব-ই-রববানী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা গত ১৭ অক্টোবর বিআরটিএর চেয়ারম্যানের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। এটি নিয়ে এখন বিআরটিএ ও মন্ত্রণালয় বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেবে। সেখান থেকে সিদ্ধান্ত জানানো হবে সিটিং সার্ভিস থাকবে কিনা।’
তবে এ নিয়ে এখনও কোনও বৈঠক হয়নি। বিষয়টি নিয়ে বিআরটিএ চেয়ারম্যান ও মন্ত্রণালয়ই বেশি বলতে পারবে বলেও জানান মাহবুব-ই-রববানী। বিআরটিএ’র রুট পারমিটে সিটিং সার্ভিসের কোনও বৈধতা নেই। বিষয়টি বিবেচনায় কোনও সুপারিশ গ্রহণ করার সুযোগ আছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাব নেই এই কর্মকর্তার কাছে।
এদিকে গঠিত কমিটির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন যাবৎ সিটিং সার্ভিসের মাধ্যমে যাত্রীগণ চলাচলে অভ্যস্ত হওয়া এবং পরিবহন মালিকগণ সিটিং সার্ভিস পরিচালনায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করায় সময়ের চাহিদা অনুযায়ী নিয়ম-নীতির আলোকে সিটিং সার্ভিস ব্যবস্থা বহাল রাখা যায়। এক্ষেত্রে একটি কোম্পানি সবগুলো বাস সিটিং সার্ভিস হিসেবে না চালিয়ে কিছু সংখ্যক গাড়ি সিটিং হিসেবে পরিচালনা করতে পারে। এ ধরনের গাড়িতে পৃথক রং থাকতে হবে। এর জন্য পৃথক ভাড়া হতে পারে, তবে তা হবে সরকার নির্ধারিত। এছাড়া সম্পূর্ণ রুটকে কয়েকটি স্লাবে বিভক্ত করে স্লাব ভিত্তিক ভাড়া নির্ধারণ করা যেতে পারে। সিটিং সার্ভিসের জন্য সীমিত সংখ্যক স্টপেজ থাকতে হবে।
অপরদিকে কমিটি,গণপরিবহন বিষয়েও সুপারিশ করেছে। এরমধ্যে রুট পুনর্বিন্যাস করে ঢাকা শহরের সকল বাসকে নির্দিষ্ট কয়েকটি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে চলাচলের ব্যবস্থা করা, রুট ফ্র্যাঞ্চাইজিং পদ্ধতিতে গণপরিবহন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা, ভাড়া নৈরাজ্য,যাত্রী হয়রানি ও একচেটিয়া ব্যবসা রোধে প্রাইভেট অপারেটরদের মাধ্যমে নতুন করে রুট পারমিট প্রদান বন্ধ রেখে বিআরটিসির মাধ্যমে অধিক সংখ্যক নতুন ডাবল ডেকার বাস চালু করার পরামর্শ রয়েছে।
এছাড়া কমিটি আরও সুপারিশ করেছে, প্রয়োজনে আন্তঃজেলা থেকে প্রত্যাহার করে ঢাকা সিটিতে স্থানান্তর করা। বিআরটিসি বাসের লিজ প্রথা বাতিল করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাস সার্ভিস পরিচালনা করা। পৃথক ভাড়া নির্ধারণ করে অধিক সংখ্যক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস চালু, ট্রাভেল কার্ড প্রবর্তন, বাস র্যা পিড ট্রানজিট সিস্টেম চালু,আন্তঃজেলা বাস ও ট্রাক টার্মিনাল শহরের বাইরে স্থানান্তর করা। ফিটনেসবিহীন অযোগ্য মানহীন মোটর যান চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। সব মিলিয়ে ২৬টি সুপারিশ করেছে কমিটি।
তবে কমিটির সদস্য ও দৈনিক সমকালের উপ-সম্পাদক অজয় দাশগুপ্ত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের দেশে তো অনেক কমিটি হয়,তার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সুপারিশ বাস্তবায়ন হয় না। আমরা একটা সুপারিশ করেছি। আমরা এই সুপারিশগুলোকে বাস্তব সম্মত রাখার চেষ্টা করেছি। এখন বিআরটিএ বিষয়টি অনুমোদন দিয়ে সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ‘এই কমিটিতে শুধু আমরা নয়, মালিক ও পরিবহন শ্রমিকরাও ছিলেন। বাস্তবতা হচ্ছে তারা যখন মানুষের সামনে বসেন তখন অনেক সুন্দর সুন্দর কথা বলেন। সেই সুন্দর কাজটা বাস্তবায়ন করা জরুরি। কিন্তু ওরা (পরিবহন মালিক ও শ্রমিক) কি এটা অতো সহজে করবে?
তিনি আরও বলেন, ‘সুপারিশে বলা হয়েছে, দাঁড়িয়ে কোনও লোক নেওয়া যাবে না। কিন্তু তারা কি তা করবে? প্রথম কয়দিন করে পরে আবার আগের চিত্রে নিয়ে যাবে। এখন আমরা একটা নীতিমালা দিয়েছি। সেটা বাস্তবায়ন করা সরকারের দায়িত্ব। আমরাও অনুরোধ করব সরকার যাতে কঠোরভাবে তা বাস্তবায়ন করে।’
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যতদূর জানি সিটিং সার্ভিস নিয়ে মালিকদের চাপ রয়েছে। অপরদিকে আইনে সার্ভিসটির স্থান নেই। এখন সরকার ও মালিকরা মিলেই অবৈধ এই কাজকে আইনের মাধ্যমে বৈধতা নিতে চেষ্টা করছে। এটি অনুমোদনের আগে যাতে সাধারণ যাত্রীদের মতামত গ্রহণ করা হয়।’
সিটিং সার্ভিস নিয়ে সম্প্রতি জমা দেওয়া সুপারিশ প্রসঙ্গে জানতে বিআরটিএ চেয়ারম্যান মো. মশিয়ার রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে চেয়ারম্যান এখন কথা বলবেন না বলে জানান তার ব্যক্তিগত সহকারী।








