২৫ মার্চের প্রতিরোধ: সক্ষমতা জানান দিয়েছিল বাংলার মানুষ

উদিসা ইসলাম
২৫ মার্চ ২০১৮, ০৮:০০আপডেট : ২৫ মার্চ ২০১৮, ১৯:৪৭

একাত্তরের মার্চে ঢাকার রাজপথে সংগ্রামী জনতার প্রতিরোধ মিছিল (ছবি- ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত) ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে করণীয় সম্পর্কে স্পষ্ট হলেও বাঙালি প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল ২৫ মার্চ। প্রতিরোধে সম্পৃক্ত থাকা ব্যক্তিরা বলছেন, কিছু একটা হতে চলেছে সে আন্দাজ ছিল ষোলআনা। বিকাল থেকেই পথে পথে ব্যারিকেড দিয়ে বাংলার মানুষ জানান দিতে চেয়েছিল, কোনও আক্রমণ সহজ হবে না। সমান শক্তিকে প্রতিরোধ করবে জনতা।
তারা জানান, যখন বাঙালি প্রতিরোধ শুরু করছে, তখন প্রতিরোধের স্বর নিশ্চিহ্ন করতেই ছাত্র-শিক্ষকদের ওপর হামলার পরিকল্পনা হয়েছে।
২৩ মার্চ পাকিস্তান প্রজাতন্ত্র দিবসে ঢাকায় ক্যান্টনমেন্ট ছাড়া কোথাও যখন পাকিস্তানের পতাকা ওড়েনি তখনই পাকিস্তান শাসকরা ছক কষতে শুরু করে কীভাবে পুরো বিষয়টাতে শুরুতেই থামানো যায়। আর তারই অংশ হিসেবে ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যার পথকে একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নেয় তারা। পাকিস্তানি শাসকরা বিশ্বাস করতো না বাঙালি সম্মুখ সমরে যেতে পারবে। কিন্তু প্রতিরোধের মুখে জিরো আওয়ার বা আঘাত হানার সময় রাত ১টা পরিকল্পনায় থাকলেও এর আগেই আঘাত  হানে হানাদাররা। সেই রাতে ফার্মগেটের সামনে এসে তারা পিকেটারদের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং পিকেটারদের সরানোর জন্য জিরো আওয়ারের অপেক্ষা না করেই গুলি ছুড়তে থাকে। ফলে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই শুরু হয় ‘অপারেশন সার্চলাইট’।
২৫ মার্চ থেকে পরবর্তীতে শাসকের যেকোনও আক্রমণ প্রতিহত করতে প্রতিরোধের ডাকটাও দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু স্বয়ং। ২৫শে মার্চ কালরাত্রিতে পাক হানাদার বাহিনী ঢাকাসহ সারাদেশে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। মধ্যরাতেই অর্থাৎ ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইপিআরের ওয়্যারলেসে স্বাধীনতার ডাক দেন।

ইংরেজিতে ঘোষণার বক্তব্য ছিল—‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ  থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের জনগণ তোমরা যে যেখানেই আছো এবং যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শেষ পর্যন্ত দখলদার সৈন্যবাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য আমি তোমাদের আহ্বান জানাচ্ছি। চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে।’ একইসঙ্গে তিনি বাংলায় যে বার্তা পাঠান সেটি হলো, ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনী অতর্কিতভাবে পিলখানা ইপিআর ঘাঁটি, রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমণ করেছে এবং শহরের রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ চলছে, আমি বিশ্বের জাতিসমূহের কাছে সাহায্যের আবেদন করেছি।’

২৫ মার্চের সবচেয়ে বড় টার্গেট ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিজীবী শিক্ষক ও ছাত্ররা। প্রতিরোধটাও হয়েছিল এই পক্ষ থেকেই প্রধানত। ১৯৭২ সালে প্রকাশিত সাংবাদিক রবার্ট পেইনের ‘ম্যাসাকার’ বইতে দেখা যায়, ১৯৭১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত এক সামরিক বৈঠকে ইয়াহিয়া খান বাঙালিদের খতম করার সিদ্ধান্ত নেন। ওই সেনা বৈঠকে ইয়াহিয়া খান বলেছিলেন, ‘কিল থ্রি মিলিয়ন অব দেম, অ্যান্ড দ্য রেস্ট উইল ইট আউট অব আওয়ার হ্যান্ডস।’

মুক্তিযোদ্ধা রোকেয়া কবীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘৭ তারিখের পর প্রস্তুতি চলছিল নানারকমের। এমনকি সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতিতেও আমরা নানা কর্মসূচি নিচ্ছিলাম। এটা করতে করতেই ২৫ মার্চ চলে এলো। সেইদিন কেমন যেন বোঝা যাচ্ছিল আজ  কিছু একটা হতে চলেছে। আমরা তখন কলাবাগানে। আমরা ভেবেছিলাম সেনারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আক্রমণে গেলে এ রাস্তা ব্যবহার করতে পারে। আমরা রাস্তাজুড়ে ব্যারিকেড দেই। আমাদের সঙ্গে আমার বোন মনিরা আক্তার এবং ওই পাড়ার সাধারণ জনগণ ছিল। ২৫ মার্চ সন্ধ্যা থেকে ব্যারিকেড দিয়ে কলাবাগানে দাঁড়ানো আমরা। রাত ১১টা পর্যন্ত আমরা ওই রাস্তায় ছিলাম। কিন্তু তখন যে অন্য কোথাও আগুন জ্বলতে শুরু করছে তা কে জানতো!’

মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রব বলেন, ‘২৫ তারিখের ( ২৫ মার্চ, ১৯৭১) নৃশংসতা ভয়াবহ ছিল, সেই ভয়াবহতা পরের দিন থেকেই আমাদের করণীয় নির্ধারণে সহায়ক হয়ে ওঠে। সেইদিন অস্ত্র ছিল না হাতে, নিরস্ত্র জনতাও ঠেকানোর চেষ্টা করে দেখিয়ে দিয়েছিল আমরা পিছিয়ে পড়ার জাতি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সেই দিনের পর ২৬ মার্চ জানতামও না কী হতে চলেছে। কেবল জানতাম, এভাবে আর না। সবার ভেতর তাগিদ ছিল যে কোনোভাবে দেশ স্বাধীন করতে হবে, তা যতদিনই লাগুক।’

জানতে চাইলে ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ বলেন, ‘ওই সময়ের বিভিন্ন দলিল থেকে জানতে পারি, বাঙালি বেশ কিছুদিন ধরেই বিভিন্ন ফর্মে আন্দোলন করে আসছিল। কিন্তু ২৫ মার্চ এই গণহত্যা ও নৃশংসতার পর বাঙালির হাতে আর কোনও অপশন ছিল না। বাঙালিকে হয় মরতে হবে, না হলে বাঁচতে হবে। তার আগে বঙ্গবন্ধুর যে ভাষণ ও আহ্বান, সেখানেও সে আহ্বানই ছিল। ফলে এই দিনের আক্রমণ বাঙালিকে প্রতিরোধে আরও শানিত করেছে, প্রতিরোধ ত্বরান্বিত করেছে।’

 

/টিএন/চেক-এমওএফ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মার্কিন সেনা হত্যা করলে যুদ্ধবিরতি শেষ, উপদেষ্টাদের জানালেন ট্রাম্প
মার্কিন সেনা হত্যা করলে যুদ্ধবিরতি শেষ, উপদেষ্টাদের জানালেন ট্রাম্প
ময়মনসিংহ মেডিক্যালে হাম উপসর্গে আরও এক শিশুর মৃত্যু 
ময়মনসিংহ মেডিক্যালে হাম উপসর্গে আরও এক শিশুর মৃত্যু 
বিক্রির জন্য নিলামে উঠছে এই আধুনিক দুর্গটি
বিক্রির জন্য নিলামে উঠছে এই আধুনিক দুর্গটি
পাবনায় কিশোরীকে হত্যা: কথিত প্রেমিকসহ ৩ জন গ্রেফতার
পাবনায় কিশোরীকে হত্যা: কথিত প্রেমিকসহ ৩ জন গ্রেফতার
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম