ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনএসসি) তুলনায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) রাজস্ব আয় অনেক কম। ডিএসসিসি প্রতিমাসে যে পরিমাণ টাকা রাজস্ব আয় করে তা দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনই ঠিকঠাক হয় না। বিভিন্ন তহবিলের টাকা খরচ করে বেতন-ভাতা পরিশোধ করার নজিরও রয়েছে সংস্থাটির। বিদ্যুৎ বিল বকেয়ার কারণে নগর ভবনের বিদ্যুৎ লাইন পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তবে এই দৈন্যদশার মধ্যেও বেহাল রাস্তা, ফুটপাথ, নর্দমা সংস্কার ও মেরামত, এলইডি বাতি সংযোজন, পাবলিক টয়লেট, পার্ক, খেলার মাঠ, কবরস্থান ও এসটিএস নির্মাণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ও জলাবদ্ধতা নিরসনে তুলনামূলক অগ্রগতি হয়েছে। তবে নগরীর অন্যতম সমস্যা যানজট দূর করতে পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তাতে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
ডিএসসিসির হিসাব বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, সংস্থাটি প্রতিমাসে বেতন-ভাতা বাবদ প্রায় ২৮ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। পাশাপাশি অন্যান্য উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে আরও অন্তত ৩০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। সব মিলিয়ে প্রতিমাসে ৬০ কোটি টাকার বেশি খরচ হচ্ছে। কিন্তু সংস্থার আয়ের যেসব খাত রয়েছে তা থেকে এ পরিমাণ টাকা আসে না। এ অবস্থায় ২০১৫ সালের ৬ মার্চ মেয়র হিসেবে শপথগ্রহণের পর নাগরিক সেবায় বেশ কিছু উদ্যোগ নেন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও সরকারের থোক বরাদ্দের উপর ভিত্তি করেই চলছে উন্নয়ন কাজগুলো।
এলইডি বাতি স্থাপন: একসময় এ নগরীতে সব সড়কে বাতি জ্বলতো না। ফলে ছিনতাই, রাহাজানি, সন্ত্রাসসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হতো। পরে নগরজুড়ে এলইডি বাতি লাগানোর প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এখন ডিএসসিসি এলাকার সড়কগুলো রাতে আলোতে চমকায়।
মেয়র সাঈদ খোকন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একসময় সন্ধ্যা হলে ঢাকায় অন্ধকার নেমে আসতো। আমি দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই এ পর্যন্ত ৩৭ হাজার ৯৭৯টি এলইডি বাতি স্থাপন করেছি। নবসংযুক্ত ৮টি ইউনিয়নেও এলইডি বাতি স্থাপন কার্যক্রম চলছে।’
রাস্তা, ফুটপাথ ও নর্দমা: সিটি নির্বাচনের সময় নগরীর প্রায় সব সড়কের অবস্থা ছিল ভাঙাচোড়া। কিন্তু মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে এর অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ডিএসসিসি ইঞ্জিনিয়ারি বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, জিওবি ও নিজস্ব অর্থায়নে এ পর্যন্ত ৪৭৩ দশমিক ২৪ কিলোমিটার রাস্তা উন্নয়ন এবং ১১২ দশমিক ৪৮ কিলোমিটার ফুটপাত নির্মাণ ও উন্নয়ন, ৪৬৯ দশমিক ৯৬ কিলোমিটার নর্দমা নির্মাণ ও উন্নয়ন করা হয়েছে। আরও ২৫৯ দশমিক ৬১ কিলোমিটার সড়ক, ২৬১ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার ড্রেন এবং ৫১ দশমিক ৫১ কিলোমিটার ফুটপাথ নির্মাণ কাজ চলছে। আরও ১৩৫ কিলোমিটার রাস্তা ও ২৭ কিলোমিটার ফুটপাত নির্মাণের কাজও চলমান।
যানজট নিরসন: মেগা প্রকল্পের আওতায় নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ৩০টি বাস-বে/বাস স্টপেজ ও চারটি ইন্টারসেকশন উন্নয়নসহ ৭১টি স্বচ্ছ পুলিশ বক্স নির্মাণ কাজ চলছে। ২৫টির মতো বক্সের নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। পাশাপাশি আটটি এলাকায় ৫৬০টি স্থানে অনস্ট্রিট পার্কিং চালু করা হয়েছে।
পাবলিক টয়লেট: নাগরিকদের ব্যবহারের জন্য এ পর্যন্ত অত্যাধুনিক ১৯টি পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। ১৫টির নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। ৩২টি কাজ চলমান।
এ বিষয়ে নারী উন্নয়ন কর্মী মাহমুদা ফারহানা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একসময় আমরা সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় পুরো দিনের জন্য টয়লেটের প্রস্তুতি সেরে বাসা থেকে বের হতাম। এখন সিটি করপোরেশন সড়কের পাশে যেসব অত্যাধুনিক টয়লেট নির্মাণ করেছে তা বাসা-বাড়ির চেয়েও অনেক আধুনিক।’
জলাবদ্ধতা: শান্তিনগর ও পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় একটু বৃষ্টি হলেই পানি জমে যেতো। গত তিন বছরে প্রকল্প গ্রহণ করে এই দুটি এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন করা হয়েছে। ৪৫০ কিমি নর্দমা পরিষ্কার করা হয়েছে। পাশাপাশি ‘জেট অ্যান্ড সাকার’ মেশিন নামে একটি অত্যাধুনিক যন্ত্রও সংযোজন করা হয়েছে।
নবসংযুক্ত ৮ ইউনিয়নের উন্নয়ন: ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নতুন যুক্ত হওয়া এলাকাগুলোর মধ্যে ৭৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে শ্যামপুর, দনিয়া, মাতুয়াইল, সারুলিয়ায় ১৫২ দশমিক ৩৪ কিমি রাস্তা, ৬ দশমিক ১০ কিমি ফুটপাথ, ১৫৮ দশমিক ৫০ কিমি নর্দমা, ১৪৩ দশমিক ৪৭ কিমি রাস্তায় এলইডি লাইট, সাত হাজার ৬৩টি গাছ লাগানোসহ নানা উন্নয়ন করা হয়েছে। এরই মধ্যে প্রকল্পের কাজ ৬০ ভাগ শেষ হয়েছে। এ বছরের মধ্যেই বাকি কাজ হবে। এছাড়া মান্ডা, ডেমরা, নাসিরাবাদ ও দক্ষিণগাঁও এলাকায় ৪৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৫ দশমিক ৭২ কিমি রাস্তা, ৪৮ কিমি নর্দমা, ৭ দশমিক ৯৫ কিমি ফুটপাথ, ১৭টি আরসিসি ব্রিজ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে।’
খেলার মাঠ ও পার্ক: আধুনিক উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নাগরিকদের সুস্বাস্থ্য এবং বিনোদনের জন্য ‘জলসবুজে ঢাকা’ কর্মসূচির মাধ্যমে বেদখল ও বখাটেদের আড্ডাখানায় পরিণত হওয়া ৩১টি পার্ক ও খেলার মাঠ উন্নয়নের কাজ শুরু হয়েছে।
ফুটওভার ব্রিজ: নিরাপদে সড়ক পারাপারের লক্ষ্যে নয়টি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। মেগা প্রকল্পের আওতায় লিফটযুক্ত নতুন সাতটি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ১৬টি ফুটওভার ব্রিজের সংস্কার করা হয়েছে।
সবুজায়ন: ঢাকা মহানগরীকে সবুজ নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে সড়কদ্বীপে বাগান বিলাস লাগানো হয়েছে। তাছাড়া বাড়ির ছাদ বা আঙিনায় বাগান করার জন্য ১০ শতাংশ ট্যাক্স রিবেট প্রদান করা হয়েছে। বেশ কিছু ফুটওভার ব্রিজেও গাছ লাগানো হয়েছে।
আধুনিক যান ও যন্ত্রপাতি সংযোজন: সড়ক মেরামত কাজে গতি ফেরাতে অত্যাধুনিক কোল্ড মিলিং মেশিন আমদানি করা হয়েছে। এই যন্ত্র দিয়ে পুরনো ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করে মাত্র সাত ঘণ্টায় এক কিমি সড়ক নির্মাণ করা যাচ্ছে। এতে ৪০ শতাংশ ব্যয় সাশ্রয় হয়।
কমিউনিটি সেন্টার: আধুনিক সুবিধার ছয়তলা ‘মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন সেন্টার’ নির্মাণসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ছয়টি কমিউনিটি সেন্টারের আধুনিকায়ন করা হয়েছে। আজিমপুর কবরস্থানে ‘মেয়র মোহাম্মদ হানিফ জামে মসজিদ’ নামে আধুনিক মসজিদ ও অফিস নির্মাণ কাজ চলমান। এছাড়া ২১টি ব্যায়ামাগার ও ১২টি সংগীত শিক্ষা কেন্দ্রের উন্নয়ন করা হয়েছে।
অবৈধ বিলবোর্ড অপসারণ: একসময় অবৈধ ও দৃষ্টিকটু বিলবোর্ড-ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে ছিল ঢাকা। ৩২ হাজার ২০০ অবৈধ ব্যানার-বিলবোর্ড অপসারণ করা হয়েছে।
ডিজিটালাইজড এলইডি: নগরীর সৌন্দর্য বাড়াতে অবৈধ বিলবোর্ড অপসারণ করে ৯৫০টি বক্স এলইডি বোর্ড বসানোর পাশাপাশি শাহবাগ, পান্থকুঞ্জ পার্ক, গাউছিয়া মোড়, রাসেল স্কয়ার ও তাঁতিবাজার মোড়সহ বিভিন্ন গরুত্বপূর্ণ স্থানে নয়টি ডিজিটালাইজড এলইডি বিলবোর্ড বসানো হয়েছে। এতে নগরীর সৌন্দর্য বাড়ার পাশাপাশি সংস্থার রাজস্ব আয়ও বেড়েছে।
দুর্নীতি রোধ: কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতি রোধ ও কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ডিজিটাল হাজিরা, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের লোকেশন ট্র্যাকিং সিস্টেম, ই-টেন্ডারিং কার্যক্রম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মাধ্যমে মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। জনগণের দোরগোড়ায় নাগরিক সেবা পৌঁছে দিতে প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে নগর ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে।
খাল ও জমি উদ্ধার: মান্ডা ও কালু নগর খালের পাশাপাশি অবৈধ দখলে থাকা প্রায় ১২০ একর জমি উদ্ধার করা হয়েছে।
মশা নিধন: মশার কামড়ে গত বছর চিকুনগুনিয়া রোডের ভয়াবহতা ছড়িয়ে গেলে এ বছর ব্যাপক হারে কাজ বাড়ানো হয়েছে। সে সময় আক্রান্ত নাগরিকদের বিনামূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসা দিয়েছে ডিএসসিসি। বিষয়টি মাথায় রেখে এ বছর শুরু থেকে মশার বংশবিস্তার রোধে এডিশ মশার লার্ভা শনাক্ত করে ধ্বংসে জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে এ বছর এ রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটেনি।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: নগরীর অলিগলিতে বাসা-বাড়ির বর্জ্যে ভরে থাকতো। গত তিন বছরে এ কাজে ব্যাপক জোর দিয়েছে ডিএসসিসি। নির্মাণ করা হয়েছে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস)। এর মধ্যে ১০টির উদ্বোধন ও ১৩টির নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। পাশাপাশি বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ৭২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল সম্প্রসারণের কাজ শুরু হয়েছে।
ওয়েস্ট বিন স্থাপন: পথচারীরা যাতে বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে পারে সে জন্য ৫৭টি ওয়ার্ডে পাঁচ হাজার ৭০০টি মিনি ডাস্টবিন স্থাপন করা হয়। নতুন উদ্যোগ হিসেবে এটি প্রশংসিত হলেও নাগরিকদের অসচেতনতায় প্রকল্পটি ভেস্তে গেছে।
জনতার মুখোমুখি জনপ্রতিনিধি: সাঈদ খোকন মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর নাগরিকদের কথা শোনার জন্য ওয়াসা, ডেসা, তিতাস, রাজউক, ডিএমপিসহ ২৮টি সেবা সংস্থার প্রতিনিধিসহ প্রতিটি ওয়ার্ডে ‘জনতার মুখোমুখি জনপ্রতিনিধি’ নামে এটি অনুষ্ঠান করে যাচ্ছেন। এতে তিনি প্রতিটি ওয়ার্ডের নাগরিকদের সমস্যার কথা শুনে সমাধানে উদ্যোগ নিচ্ছেন। তার এ উদ্যোগ নগরবাসীর মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। এ পর্যন্ত বিভিন্ন ওয়ার্ডে এমন ২৫টি অনুষ্ঠান করা হয়েছে।
পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের নিবাস: পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য নিবাস নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ১৩টি দশতলা ভবনে সর্বমোট এক হাজার ২১৮টি ফ্ল্যাট নির্মাণের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া ধলপুর, লালবাগ ও গণকটুলিতে ছয়তলা ছয়টি ক্লিনার কলোনি নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়েছে। গণকটুলিতে আরও ছয়টি ও মিরনজল্লা ক্লিনার কলোনিতে তিনটি ছয়তলা ভবন নির্মাণের কাজ চলছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসি মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা গত তিন বছরে যে উন্নয়ন করেছি তা বিগত এক দশকেও হয়নি। এটা কথার কথা না। করপোরেশনের বিগত বছরের উন্নয়ন রেকর্ডগুলো দেখলেই এটা স্পষ্ট। রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে নগরবাসীর প্রতিটি সেবায় আমরা চেষ্টা করেছি উন্নত কাজটিই করার। সময়ের ব্যবধানে নানা ধরনের পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়েছে। আরও দৃশ্যমান হবে।’
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগের চেয়ে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ফুটপাত রাস্তাঘাটের সুফল পাচ্ছে জনগণ। উন্নয়ন দৃশ্যমান হয়েছে। উন্নয়নগুলো আরও বেগবান হোক। পাশাপাশি উন্নয়নের গতি আরও বাড়াতে হবে। শুধু মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক উন্নয়ন করলে চলবে না। সব এলাকায় একসঙ্গে নজর দিতে হবে। তাহলে করপোরেশন আরও অনেক এগিয়ে যাবে।’








