গ্রামের কৃষকের ক্ষেতের পাট এখন রাজধানীতে। জাতীয় পাট দিবস উপলক্ষে সেই পাট এবং পাটখড়ি এখন রাজধানী জুড়ে বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শিত হচ্ছে। রাস্তার পাশে পাশে শোভা পাচ্ছে আঁটি বাধা পাটখড়ির স্তূপ এবং কাঁচা পাটের বান্ডিল। দেখে বোঝার উপায় নাই যে এটি রাজধানী। প্রথম দর্শনেই মনে হবে আপনি যেন কোনও এক গ্রামের রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন, আর সেই রাস্তার ধারে কোনও কৃষক হয়তো মাঠ থেকে পাট তুলে এনে পাট ও খড়ি আলঅদা করে পাটখড়ি বা পাটের স্তুপ করে রেখেছেন। রাজধানীর গুলিস্তান সংলগ্ন জিপিও’র নিকটবর্তী স্থান জিরো পয়েন্ট থেকে সচিবালয়ের সামনে হয়ে শেরেবাংলা নগরস্থ বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে এ দৃশ্য শোভা পাচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীতে রাস্তার পাশে সোনালী রোদ্দুর গায়ে লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আঁটি আঁটি পাটখড়ি। সপ্তাহজুড়ে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কদ্বীপ ও সড়ক বিভাজন পাটের সজ্জায় বর্ণিল। এ আয়োজন জাতীয় পাট দিবসকে ঘিরে। আজ ৬ মার্চ। জনজমাটভাবে দেশব্যাপী পালিত হচ্ছে জাতীয় পাট দিবস। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুধবার (৬ মার্চ) জাতীয় পাট দিবসের মূল অনুষ্ঠানে তিন দিনের পাটপণ্যের মেলা উদ্বোধন করেছেন।
জানা গেছে, পাট ও পাটপণ্যের মোট রফতানি আয়ের ২০ শতাংশ জোগান দেয় সরকারি পাটকল। বাকি ৮০ শতাংশ আসে বেসরকারি খাত থেকে। জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীনে ৭৬টি পাটকল ছিল এক সময়। এখন ৩টি নন জুটসহ সরকারি পাটকলের সংখ্যা ২৬টি। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের পাটকলের সংখ্যা ১৭০টি। সরকারি পাটকলে লোকসান থাকলেও বেসরকারি খাতে মুনাফা বাড়ায় নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে। নতুন পণ্য উদ্ভাবনে গবেষণাও চলছে। পাটের পলিথিন ব্যাগ, পোশাক উৎপাদন উপযোগী সুতার কাঁচামাল, পাটকাঠির ছাই থেকে প্রসাধনীর কাঁচামাল ও পাট পাতার চা উৎপাদন হচ্ছে বাণিজ্যিকভাবে।
সাধারণ খেলনা থেকে অত্যাধুনিক জেট বিমানে পর্যন্ত পাটের তৈরি বিভিন্ন পণ্য সামগ্রী ব্যবহার হচ্ছে। অন্তত এক হাজার বহুমুখী পণ্য তৈরি হচ্ছে পাট দিয়ে। বিশ্বব্যাপী বাজার বাড়ছে পাটপণ্যের। ২০১৯ সালের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) প্লাস্টিক ব্যাগের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষায় বিভিন্ন দেশ একই পথে যাচ্ছে। এর অর্থ, বিশ্বব্যাপী বাজার বাড়ছে পাটপণ্যের। ইতিমধ্যেই দেশে উদ্ভাবন করা হয়েছে পাট দিয়ে পলিথিন। সেই পলিথিন এখন বাজারজাতকরণের প্রক্রিয়া চলছে।
ইপিবির তথ্যমতে, বর্তমানে ১১৮টি দেশে বহুমুখী পাটপণ্য রফতানি হচ্ছে। হস্তশিল্প হিসেবেও অনেক পণ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে পাট, যা পাটের রফতানি আয়ের মধ্যে স্বীকৃতি পায় না। দেশেও বাড়ছে পাটপণ্যের চাহিদা। বছরে ৭০০ কোটি টাকার পাটের চট বা জিও টেক্সটাইলের অভ্যন্তরীণ বাজার তৈরি হয়েছে। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে মোট রফতানি আয়ের ৯০ শতাংশই ছিল পাট থেকে। আশির দশকে সিনথেটিক পণ্যের ব্যবহার শুরু হওয়ায় পাট খাতের পতন শুরু হয়। কয়েক বছর ধরে আবারও বিশ্বব্যাপী পাটের ব্যবহার বাড়ছে। বাংলাদেশও ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে বিশ্ববাজারে।
গত তিন বছর ধরে পাটের ভালো দাম পাচ্ছেন কৃষক। গত মৌসুমে এক মণ ভালো মানের পাটের দর বেড়ে হয়েছে দুই হাজার ১০০ টাকা। আগের মৌসুমের দর ছিল দুই হাজার টাকা। গত তিন বছর ধরেই ভালো দর পেয়েছেন কৃষক। কিন্তু কয়েক বছর আগেও পরিস্থিতি এমন ছিল না। এখন দর ভালো পাওয়ায় কৃষক আবার পাট চাষে ঝুঁকেছেন। উৎপাদনও বেড়েছে। ২০১৫ সালে পাটের উৎপাদন ছিল ৬৮ লাখ বেল। ২০১৬ সালে তা ৮৫ লাখ বেলে উন্নীত হয়। ২০১৭ সালে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯১ লাখ বেল। আগামী ১০ বছরে পাটের উৎপাদন ২ কোটি বেলে উন্নীত করার পরিকল্পনা আছে সরকারের।
এ প্রসঙ্গে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, ‘বিশ্ব বাজারে পাটের বাজার পড়ে যাওয়ার কারণে পাটশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যার কারণে পাটের সম্ভাবনা নষ্ট হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে বিশ্ব এখন প্লাষ্টিককে বর্জন করতে শুরু করেছে। আর সেজন্য আমরা পাটের সুদিন নিয়ে আশাবাদী। সরকারি পাটকলের তুলনায় বেসরকারি পাটকল বাজারে পণ্য আগে আনতে পারে। এজন্য সবার সহযোগিতা দরকার।’
তিনি আরও জানিয়েছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী পাটকে রক্ষায় আমাকে নির্দেশনা দিয়েছেন। আমি পাটে কোনও দুর্নীতি কিংবা গাফিলতি মেনে নেবো না। পাটের বহুমুখী ব্যবহার বাড়াতে বেশি বেশি মেলার আয়োজন করতে হবে। দেশের বিভিন্ন জেলায় পাটের স্টল খুলতে হবে। তাহলে স্থানীয় বাজারেও পাটপণ্য কেনার আগ্রহ বেশি বাড়বে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, রফতানির পাশপাশি পাটের অভ্যন্তরীণভাবে সংরক্ষিত বাজার ধরে রাখতে হবে। সরকারি ক্রয়নীতিতে সড়ক নির্মাণে পাটের চট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হলে সড়ক যেমন মজবুত হবে, পাটের বাজারও বাড়বে। তিনি জানান, ভারত সরকার বাংলাদেশি পাটপণ্যে বিভিন্ন হারে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক্ক আরোপ করায় দেশটিতে রফতানি প্রায় ৬০ শতাংশ কম হয়েছে। এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) চেয়ারম্যান শাহ মো. নাছিম জানিয়েছেন, সংস্থার লোকসান কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। আগের বছরের ৬৫৬ কোটি টাকা থেকে গত বছর ৪৮১ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা গেছে। লোকসানের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, অর্থ সংকটে মৌসুমের শুরুতে কৃষকের কাছে থেকে ন্যায্য দামে পাট কেনা যায় না। পরে অপর্যাপ্ত সরকারি বরাদ্দ ও ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে বেশি দামে ফড়িয়াদের কাছ থেকে পাট কিনতে হয়।








