সৌদির হয়ে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী কোনও যুদ্ধে জড়াবে না: সংসদে প্রধানমন্ত্রী

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
১১ মার্চ ২০১৯, ২৩:২৯আপডেট : ১১ মার্চ ২০১৯, ২৩:৫৯

সংসদে প্রধানমন্ত্রী (ফাইল ছবি) সৌদি আরবের হয়ে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী কোনও দেশের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াবে না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমরা সৌদি আরবের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেছি। এ ধরনের চুক্তি বহু দেশের সঙ্গে আমাদের রয়েছে। এর আওতায় দুই দেশের প্রতিরক্ষা বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও তথ্য আদান-প্রদান হবে। সৌদি আরবের অবিস্ফোরিত মাইন অপসারণে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী কাজ করবে। তারা (সৌদি আরব) যদি কোনও দেশের সঙ্গে যুদ্ধ করে তবে সেই যুদ্ধে আমাদের সামরিক বাহিনী জড়াবে না।’

সোমবার (১১ মার্চ) জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনা ও একাদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী একথা বলেন।

সৌদি আরবের সঙ্গে স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তি প্রসঙ্গে সংসদ নেতা বলেন, ‘এই বিষয়টি নিয়ে সংসদে দুজন সংসদ সদস্য বক্তব্য রেখেছেন। তাদেরকে বলবো, এটি চুক্তি নয়, সমাঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করা হয়েছে। এ ধরনের সমঝোতা স্মারক বহু দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের আছে। আমাদের প্রতিরক্ষা চুক্তিও অনেক দেশের সঙ্গে আছে। আমাদের বামপন্থী রাজনীতি যারা করতেন, যেসব দেশের আদর্শকে তারা ধারণ করে চলতেন, সেসব দেশের সঙ্গেও এই চুক্তি রয়েছে। এখন কিন্তু “গ্লোবাল ভিলেজ”– এটা মনে রাখতে হবে। আমাদের সশস্ত্র বাহিনী কেবল আমাদের দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জাতিসংঘের অধীনে তারা বিশ্বের সংঘাতপূর্ণ দেশে শান্তিরক্ষা মিশনে কাজ করে যাচ্ছে। এর বাইরে যুদ্ধবিধ্বস্ত কুয়েত গড়ে তোলা ও সেখানকার মাইন অপসারণ করার জন্য আমাদের সশস্ত্র বাহিনী সেখানে দীর্ঘদিন অবস্থান করে কাজ করে যাচ্ছে।’

তুরস্ক, বেলারুশ, চীন, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য রাশিয়া, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপি প্রথম চীনের সঙ্গে যখন চুক্তি করেছিল সেটা কিন্তু খুব গোপন রেখেছিল। আমাদের চীনপন্থী মাননীয় সংসদ সদস্য (রাশেদ খান মেনন) তখন এ কথাটা উল্লেখ করেছিলেন কিনা জানি না। কিন্তু এবারে তিনি বলেছেন।’

তিনি বলেন, ‘সৌদি আরব-বাংলাদেশের মধ্যে একটা সমঝোতা স্মারক আমরা সই করেছি। তারা বর্ডার থেকে মাইন অপসারণের জন্য আমাদের কাছে সহযোগিতা চেয়েছিলো। এই স্মারকের বিষয় হচ্ছে– অবকাঠামো নির্মাণ, কারিগরি সহায়তা আর সৌদি আরবের স্থল সীমানার মধ্যে অবিস্ফোরিত মাইন-অপসারণের জন্য। এই মাইন অপসারণে বাংলাদেশ যথেষ্ট পারদর্শী। আমাদের সেনাবাহিনী কুয়েতে মাইন অপসারণে যেভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছে, সৌদি আরবেও সেটা করবে। এছাড়া সামরিক প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, প্রতিরক্ষা শিল্প বিষয় সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণ, অনুশীলন ও শিক্ষায় সহায়তা দেওয়া হবে। এছাড়া উভয়পক্ষ থেকে সমঝোতায় যেকোনও বিষয়ে সহযোগিতা।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটি কথা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, সৌদি আরবের সঙ্গে একটি বিষয়ে আমাদের সমঝোতা হয়েছে। তারা (সৌদি আরব) যদি কোনও দেশের সঙ্গে যুদ্ধ করে সেই যুদ্ধে আমাদের সামরিক বাহিনী লিপ্ত হবে না। যুদ্ধে আমরা অংশগ্রহণ করবো না। একমাত্র শান্তিরক্ষার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের অধীনে যদি হয় তখন আমরা যাবো। আর আমাদের পবিত্র দুটি জায়গা মক্কা ও মদিনা শরিফ। এই মক্কা ও মদিনার যদি নিরাপত্তা রক্ষার প্রয়োজন হয় তাহলে সেখানে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে। এখানে বোঝাবুঝির কোনও অবকাশ নেই। এই ব্যাখ্যার পর ওই সদস্যের আর কোনও দ্বিধা থাকবে না বলে মনে করি।’

কওমি মাদ্রাসা নিয়ে রাশেদ খান মেননের বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের ভূখণ্ডে মুসলমানদের শিক্ষাব্যবস্থা এই মাদ্রাসা শিক্ষা থেকেই শুরু হয়েছে। আমাদের এখানে ২০ হাজার কওমি মাদ্রাসা আছে। সেখানে ২০ লাখের মতো ছেলেমেয়ে পড়ে। যাদের মা-বাবা নেই; গরিব ও দরিদ্র এতিমরা এই মাদ্রাসায় যায়। এই মাদ্রাসা আছে বলেই তারা একটা জায়গা পাচ্ছে, খাদ্য পাচ্ছে, আশ্রয় পাচ্ছে। মাদ্রাসাকে আমরা কোনও ভাবেই অস্বীকার করতে পারি না। তারা আমাদের সমাজেরই একটি অংশ।’

তিনি বলেন, ‘কওমী মাদ্রাসার সঙ্গে সমঝোতা করতে বহুদিন থেকেই আমরা চেষ্টা করে আসছি। তারা কী শিক্ষা দিচ্ছে? তাদের কারিকুলাম কী? তা কিন্তু সুনির্দিষ্ট ছিলো না। তারা লেখাপড়া শিখে তো কোনও কর্মসংস্থানের সুযোগ পায় না। কারণ, তাদের সনদের স্বীকৃতি নেই। তারা যাবে কোথায়? তারা তো আমাদের দেশেরই সন্তান। তাদের কি আমরা ফেলে দেবো। সেজন্য তাদের কারিকুলাম ঠিক করা, শিক্ষাটাকে মানসম্মত করার উদ্যোগ আমি নিই। সেই সঙ্গে সনদের স্বীকৃতি দিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফলে আমরা তাদেরকে সমঝোতায় নিয়ে আসি। ভারতের স্বীকৃত দেওবন্দের কারিকুলাম তারা গ্রহণ করেছে। দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স সমমর্যাদা দিয়েছি। এটা করে কোনও অন্যায় কাজ আমরা করিনি। এদেরকে শিক্ষার মূলধারায় এনে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি পার্থিব শিক্ষা দিয়ে তাদের জীবন-জীবিকার পথ আমরা করে দিচ্ছি। যাতে অন্য কেউ তাদেরকে ব্যবহার করতে না পারে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘কেউ কেউ বলেন মাদ্রাসা হচ্ছে সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদ সৃষ্টির কারখানা। এটি সঠিক নয়। আমি এর সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত নই। আজকে হলি আর্টিজানে যে ঘটনা ঘটেছে বা আমাদের এখানে যতগুলো জঙ্গি ঘটনা ঘটেছে, তার সঙ্গে কারা জড়িত? ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশুনা করা উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান, তারাই জঙ্গিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে গেছে। হলি আর্টিজানে জড়িতরা ইংরেজি মাধ্যম আর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তাদের মাঝেই এই প্রবণতা বেশি দেখি। আমার অবাক লাগে, এরা কেন এই পথে যায়? তাদের তো জীবনের চাওয়ার কিছু বাদ নেই। মূল্যবান পোশাক, হাতে ফোন, দামি ঘড়ি, টাকা, গাড়ি সব আছে। সব পেতে পেতে পাওয়ার জায়গাটা হারিয়ে তারা জঙ্গিবাদে ঢুকে গেছে। এখানে শুধু মাদ্রাসার ছাত্রদের দোষ দিলে হবে না। কিছু মাদ্রাসা ছাত্রকে তারা ব্যবহার করতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার আমরা যে স্বীকৃতি দিয়েছি সেটির জন্য সর্বসম্মতিক্রমে আইন পাস করেছি। এরপর এটা নিয়ে আর কথা থাকতে পারে না। এই ছেলেপেলেগুলোর ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি পার্থিব শিক্ষা নেবে। এতে জীবনটা অর্থবহ হবে। এই বিষয়টি নিয়ে আর বোধ হয় প্রশ্ন আসবে না।’

সুশীল সমাজের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কিছু লোক আমাদের দেশে আছেন, তার নাম “দেবপ্রিয়” কিন্তু তিনি হচ্ছেন “সেনাপ্রিয়”। সিপিডির মুখপাত্র হয়ে কথা বলেন। ওয়ান ইলেভেনের সময় যখন আমরা অ্যারেস্ট তখন তাদের সুদিন। একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি যদি হয়, অসাংবিধানিক সরকার যদি হয়– তখন তারা খুব ভালো থাকে। তাদের মূল্য বাড়ে। অনেক এডিটরও আছেন। বারবার আমি ক্ষমতায় আসি আর তারা বিছানায় শুয়ে হা-হুতাশ করেন। কী যে হলো? তারপর তারা আমাকে নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেন। কোনও কিছুই খুঁজে পান না। তারপরও কোথায় “নোকতা দেবে”, “কিন্তু বসাবে” ওই নিয়ে তারা ব্যস্ত থাকে। তাদের ব্যস্ত তারা থাকুক। আমি এটা কেয়ার করি না। আমি কেয়ার করি দেশের জনগণকে, আমার লক্ষ্য দেশের জনগণ। আমার জনগণ ভালো আছে কিনা সেটাই বিবেচনা করি। তারা কী বলে আমরা আমলে নিই না।’ 

সুলতান মোহাম্মদ মনসুরের সংসদে যোগ দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘ঐক্যফ্রন্টের যিনি সংসদে এসেছেন তাকে ধন্যবাদ জানাই। আশা করি বাকি যারা আছেন তারাও চলে আসবেন।’

তিনি বলেন, ‘শক্তিশালী বিরোধী দল গড়ে উঠুক এটা আমরা চেয়েছি। নির্বাচনকে বানচাল করার একটা চক্রান্ত ছিল। জনগণ তা হতে দেয়নি। জোট করেছিলাম, মহাজোট আছে। সব দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। তরুণ ও নারী ভোটাররা ব্যাপকভাবে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েছে। উন্নয়নের সুফল গ্রামে-গঞ্জে পৌঁছেছে, এজন্য ভোট দিয়েছে। ব্যাপকভাবে সমর্থন পেয়েছি। এটা অনেকে হয়তো চিন্তাই করতে পারেনি। কৃষক, শ্রমিক, কামার, কুমার, তাঁতি জেলেসহ সব শ্রেণির মানুষ আস্থা রেখেছে। ব্যবসায়ীরা সমর্থন দিয়েছে।’

কেন আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছে, তা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন, বিজিবি, সেনা, নৌ, বিমান ও গোয়েন্দা সংস্থাকে ধন্যবাদ জানাই। তারা সুষ্ঠু ভোটের ব্যবস্থা করেছে। জনগণ ভোট দিতে পেরেছে। দলের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করেছে। এজন্য জয়ী হয়েছে আওয়ামী লীগ। এবারের যে ভোট দিয়েছে সে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। তারা এগুলো দেখতে চায় না। জনগণের ভেতরে আত্মবিশ্বাস জাগ্রত হয়েছে। জনগণ ভোট দিয়েছে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে।’

 

/ইএইচএস/এমএএ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ফোনালাপ ফাঁসের পর বদলি করা হলো জেল সুপারকে
ফোনালাপ ফাঁসের পর বদলি করা হলো জেল সুপারকে
বিশ্বতারকাদের সঙ্গে ফিফা অ্যালবামে সানজয়, নোরা ফাতেহি-ভেজড্রিমের সঙ্গে ‘সির সির’
বিশ্বতারকাদের সঙ্গে ফিফা অ্যালবামে সানজয়, নোরা ফাতেহি-ভেজড্রিমের সঙ্গে ‘সির সির’
সৌদি থেকে ফিরেছেন ২৫৩৭৭ হাজি, মৃত্যু বেড়ে ৪৫
সৌদি থেকে ফিরেছেন ২৫৩৭৭ হাজি, মৃত্যু বেড়ে ৪৫
পশ্চিমবঙ্গে যে কারণে তৃণমূলের ‘অপ্রত্যাশিত রক্ষাকর্তা’ খোদ বিজেপি
কী, কেন, কীভাবেপশ্চিমবঙ্গে যে কারণে তৃণমূলের ‘অপ্রত্যাশিত রক্ষাকর্তা’ খোদ বিজেপি
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম