সেই পাকিস্তানি কোম্পানি থেকে ডিএনসিসির মশার ওষুধ কেনার নেপথ্যে

শাহেদ শফিক
১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৬:৫৯আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৮:৫৬



সেই পাকিস্তানি কোম্পানি থেকে ডিএনসিসির মশার ওষুধ কেনার নেপথ্যে বিতর্কিত পাকিস্তানি কোম্পানি নোকন লিমিটেডের কাছ থেকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মশার ওষুধ কেনার নেপথ্যে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কোটি টাকার বিনিময়ে সর্বনিম্ন দরদাতা দুটি প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে সর্বোচ্চ দরদাতা নোকন লিমিটেডকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। অথচ কোম্পানিটির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের একটি গোয়েন্দা সংস্থা রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্তের অভিযোগ তুলে সংশ্লিষ্টদের কাছে প্রতিবেদন দেয়। এরপরও ওই কোম্পানিটির কাছ থেকে চার লাখ লিটার ওষুধ নিয়েছে ডিএনসিসি। এই ওষুধ সরবরাহে চার মাসেরও বেশি সময় দেরি হয়। সে সময় ডিএনসিসিবাসী মশার ওষুধ থেকে বঞ্চিত হয়। এর নেপথে রয়েছে ডিএনসিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও তৎকালীন প্যানেল মেয়রের কমিশন বাণিজ্য।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ১০ জুলাই এক লাখ ১৪ হাজার ৯৯০ লিটার ওষুধ কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করে ডিএনসিসি। এতে সর্বনিন্ম দরদাতা হয় লিমিট এগ্রো প্রোডাক্ট লিমিটেড। পরে ওই বছরের ৪ আগস্ট ও ১০ সেপ্টেম্বর ওষুধ সরবরাহ করার জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে পৃথক দুটি কার্যাদেশ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির দ্বিতীয় ধাপে সরবরাহ করা ৬৪ হাজার ৯৯০ লিটার ওষুধ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়নি বলে লিমিটকে জানিয়ে দেয় ডিএনসিসি।

পরে এই ওষুধ সরবরাহ প্রক্রিয়া চলমান থাকার সময় একই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর নতুন করে ৪ লাখ লিটার ওষুধ কেনার জন্য আরও একটি দরপত্র আহ্বান করে ডিএনসিসি। তাতে নোকন লিমিটেড, কনফিডেন্সস ও দ্য লিমিট এগ্রো প্রোডাক্ট লিমিটেড নামে তিনটি কোম্পানি অংশ নেন। এর মধ্যে নোকন লিমিটেড প্রতি লিটার ওষুধের দাম ২৫৯ দশমিক ৬৭ টাকা, কনফিডেন্স ২২৯ টাকা এবং দ্য লিমিট এগ্রোপ্রোডাক্ট লিমিটেড ২১৭ টাকা করে দর দেয়। এ তিনটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সর্বনিম্ন দরদাতা লিমিট এগ্রো প্রোডাক্ট লিমিটেড। দ্বিতীয় সর্বনিন্ম দরদাতা কনফিডেন্স এবং সর্বোচ্চ দরদাতা নোকন লিমিডেট। নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি কেনাকাটায় সর্বনিন্ম দরদাতাকে কার্যাদেশ দিতে হয়। কিন্তু তা না করে ডিএনসিসি এক কোটি ৭০ লাখ ৬৬ হাজার টাকা বেশি দিয়ে ১০ কোটি ৩৮ লাখ ৬৬ হাজার ৪০০ টাকায় নোকন লিমিটেডের কাছ থেকে মশার ওষুধ কেনে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি টেন্ডারের ওষুধ গ্রহণ প্রক্রিয়া শেষ না হতেই আরও একটি টেন্ডার আহ্বান উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কোনও স্বার্থ হাসিলের জন্যই এই টেন্ডার আহ্বান করা হয়। আর ওই টেন্ডারের মাধ্যমেই নোকন লিমিটেডের কাছ থেকে ওষুধ নেওয়া হয়। এই প্রতিষ্ঠানটির সরবরাহ করা ওষুধও আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) পরীক্ষায় অকার্যকর বলে প্রমাণিত হয়।

এ বিষয়ে লিমিট অ্যাগ্রো প্রোডাক্টস লিমিটেডের পরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের একটি চক্র পরিকল্পিত ও পাতানো পরীক্ষার মাধ্যমে আমার কোম্পানির ওষুধকে মানহীন করে। এরপরেও আমি একাধিকবার সময় চেয়েছি। কিন্তু সময় দেওয়া হয়নি। আমি আদালতে গেলে আদালত আমার ওষুধকে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান দ্বারা পরীক্ষা করার সুযোগ দিতে নির্দেশ দেয়। ডিএনসিসি সেটিও মানেনি। পরে আমি ওই ওষুধ নারায়ণগঞ্জের নৌবাহিনীর ডক ইয়ার্ডের মাধ্যমে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে সরবরাহ করি। সেখানে তাদের সব পরীক্ষা ও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) ও খামার বাড়ির উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং এর পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হয়। তখন ডিএনসিসির একটি পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে আমার কাছ থেকে বড় অংকের অনৈতিক দাবি করা হয়। কিন্তু আমি জানিয়ে দিই আমি সর্বনিন্ম দর দিয়েছি। আমার পক্ষে সেই দাবি পূরণ করা সম্ভব নয়। পরে ইচ্ছাকৃতভাবে পাতানো পদ্ধতির মাধ্যমে আমার ওষুধকে মানহীন হিসেবে প্রমাণ করে।’

দরপত্র জমা দেওয়া তিন প্রতিষ্ঠান

তিনি বলেন, ‘যদি আমার ওষুধ মানহীন হয়ে থাকে তাহলে কেন দ্বিতীয় সর্বনিন্ম দরদাতার কাছ থেকে ওষুধ নেওয়া হয়নি? যে কোম্পানি সর্বোচ্চ দরদাতা তার কাছ থেকেই ওষুধ নিয়েছে ডিএনসিসি। আইন অনুযায়ী, এটা তারা করতে পারে না। এক্ষেত্রে  ফের টেন্ডার আহ্বান করা হয়নি।’

এ বিষয়ে ডিএনসিসির ভাণ্ডার বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ডিএনসিসিতে সরবরাহ করা ওষুধের মধ্যে নোকন লিমিটেডের যেসব উপাদান রয়েছে সেগুলো হচ্ছে- টেট্রামেথ্রিন ০.২০%,পারমেথ্রিন ০.২০% ও এস. বায়োথ্রিন ০.১০%। এ তিনটি উপাদান মিশ্রিত করে মশা নিধনে ব্যবহার করায় মশা জ্ঞান হারিয়ে পড়ে কিন্তু মরে না। এসব উপাদানের মধ্যে মশা মরার জন্য কার্যকর অন্যতম উপাদান প্যালাথ্রিন নেই। এর দাম আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি লিটার ২৫০ থেকে ৩০০ মার্কিন ডলার। এই উপাদানটির পরিবর্তে যেটি ব্যবহার করা হয়েছে সেটি হচ্ছে এস. বায়োথ্রিন ০.১০%। এর দাম ৭৫ থেকে ৮০ মার্কিন ডলার। ফলে লিমিটের চেয়েও অর্ধেক দামের ওষুধ দিয়ে বেশি দামে কার্যাদেশ পায় নোকন লিমিডেট।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নোকন লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার মো. খালিদ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কেন এমন অভিযোগ উঠেছে জানি না। অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। ইজিপিতে (ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট) কোনও অনিয়মের সুযোগ নেই। কর্তৃপক্ষ কার্যাদেশ দিয়েছে বিদায় আমরা ওষুধ সরবরাহ করছি।’

সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে বেশি দামে মশার ওষুধ সরবরাহ করার জন্য নোকন লিমিটেডকে কার্যাদেশ দেওয়ার মাধ্যমে এক কোটি টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আর এই অভিযোগটি উঠেছে ডিএনসিসির প্রধান ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও ধরেননি তিনি। তার কার্যালয়ে গিয়েও সাক্ষাৎ পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলো উল্লেখ করে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনও সাড়া দেননি।

গত ৫ সেপ্টেম্বর ডিএনসিসির বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে সংস্থাটির তৎকালীন প্যানেল মেয়র জামাল মোস্তফা কোনও মন্তব্য করেননি। তবে সংস্থাটির মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, আমরা গোয়েন্দা সংস্থার এমন কোনও প্রতিবেদন পাইনি। বিষয়টি আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগে হয়েছে। তখন আমাদের মেয়র প্যানেল মেয়র জামাল মোস্তফা দায়িত্বে ছিলেন। তবুও আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখবো।

জানতে চাইলে কনফিডেন্স কোম্পানির উপদেষ্টা ড. মাহবুব গাজী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাদের কনফিডেন্স ছিল দ্বিতীয় সর্বনিন্ম দরদাতা। যখন লিমিটকে বাদ দেওয়া হয়েছে তখন তো আমাদেরকেই কার্যাদেশ দেওয়া কথা। কিন্তু দেওয়া হয়নি। এখানে সুপরিকল্পিতভাবে কিছু একটা করা হয়েছে। পুরো বিষয়টি অবৈধ এবং একচেটিয়া ছিল। দু’জন কর্মকর্তা তাদের স্বার্থের জন্যই এমন কাজ করেছে।

 

 

/ওআর/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
বিএসইসির চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ ও ৪ কমিশনারের পদত্যাগ
বিএসইসির চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ ও ৪ কমিশনারের পদত্যাগ
দাম বৃদ্ধির একদিন পরই লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য রিভিউ আবেদন
দাম বৃদ্ধির একদিন পরই লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য রিভিউ আবেদন
ফোনালাপ ফাঁসের পর বদলি করা হলো জেল সুপারকে
ফোনালাপ ফাঁসের পর বদলি করা হলো জেল সুপারকে
বিশ্বকাপের ফিফা অ্যালবামেও সানজয়, ফের নোরা ফাতেহির সঙ্গে কোলাবরেশন
বিশ্বকাপের ফিফা অ্যালবামেও সানজয়, ফের নোরা ফাতেহির সঙ্গে কোলাবরেশন
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম