ছাত্র রাজনীতি নয়, দখলদারিত্বের রাজনীতি বন্ধের দাবি

উদিসা ইসলাম
১০ অক্টোবর ২০১৯, ০৯:৫৫আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০১৯, ১২:৪৬

 

বুয়েট ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মিছিল

ছাত্র রাজনীতি নয়, বরং ছাত্র রাজনীতির নামে যে সন্ত্রাস ও দখলদারিত্বের রাজনীতি শুরু হয়েছে—তা বন্ধ হওয়া উচিত। সাবেক ও বর্তমান ছাত্রনেতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অ্যাক্টিভিস্টরা বলছেন, ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করা কোনও সমাধান নয়। মূল জায়গায় সমাধান না করে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করা হলে শিক্ষাঙ্গন আরও বেশি এলোমেলো হবে। ছাত্র রাজনীতির নামে এই তৎপরতা চললেও এসব কর্মকাণ্ড প্রকৃতপক্ষে মাস্তানি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মধ্যে পড়ে। এগুলো নতুন করে নিষিদ্ধ করার কিছু নেই। এগুলো দেশের প্রচলিত আইনে এমনিতেই নিষিদ্ধ ও বেআইনি।

গণতান্ত্রিক যে ছাত্র রাজনীতি তার বিকাশ জরুরি এবং ছাত্র রাজনীতির নামে যে সন্ত্রাস ও দখলদারিত্বের রাজনীতি শুরু হয়েছে, তা বন্ধ হওয়া উচিত বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘আমরা কোনোভাবেই মনে করি না ছাত্র রাজনীতি বন্ধ হওয়া উচিত এবং আমরা এই দাবির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দখলদারিত্বকেন্দ্রিক যে রাজনীতি, তা বন্ধ করার দাবি জানাই।’

ফয়সাল মাহমুদ আরও বলেন, ‘ছাত্র রাজনীতি বন্ধ না করে শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে যে রাজনীতি বা প্রক্রিয়া, সেটা বন্ধ হওয়া উচিত।’

বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষমতাসীন দলের পেটোয়া সংগঠনের তৎপরতাকেই যদি ছাত্র রাজনীতি মনে করা হয়, তাহলে সেটা ভুল হবে বলে মনে করেন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী কল্লোল মুস্তফা। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এমন একটা পরিবেশ নিশ্চিতের দাবি তোলা দরকার, যেখানে কোনও ব্যক্তি বা সংগঠনের পক্ষে বেআইনি কর্মকাণ্ড করা সম্ভব না হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেই মুক্ত গণতান্ত্রিক পরিসর নিশ্চিত করার দাবি না তুলে যদি ছাত্র রাজনীতিকেই নিষিদ্ধ করা হয়, তাহলে ভিন্ন নামে ভিন্ন অরাজনৈতিক সাংগঠনিক কাঠামোতে সন্ত্রাসী তৎপরতা সংগঠনের সুযোগ যেমন থেকে যাবে, সেই সঙ্গে ছাত্র রাজনীতির যে ধারাটি শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের পক্ষে লড়াই করে, তার বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে। ফলে ওইসব শক্তিই লাভবান হবে, যাদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশ হুমকিস্বরূপ।

বুয়েটে আবরার হত্যার পেছনে ছাত্র রাজনীতি দায়ী নয় উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘এর জন্য দায়ী ছাত্র রাজনীতির নামে সরকার ও প্রশাসনের প্রশ্রয়ে একচ্ছত্র সন্ত্রাস ও দখলদারিত্ব। বুয়েটে যদি প্রকৃত অর্থে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে সপক্ষের কোনও রাজনৈতিক সংগঠন সক্রিয় থাকতে পারতো, তাহলে ছাত্রলীগের পক্ষে এরকম বাধাহীন একচ্ছত্র দখলদারিত্ব কায়েম করে হলগুলোকে কনসানট্রেশন ক্যাম্পে পরিণত করা, বা আবরার হত্যার মতো ঘটনা ঘটানো সম্ভব হতো না। দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের রাজনীতি ও আন্দোলনকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শক্তিশালী করা এবং তার জন্য যে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক স্পেসটুকু দরকার, তার দাবিতে সোচ্চার হওয়া জরুরি।’

অ্যাক্টিভিস্ট আকরামুল হক মনে করেন, ছাত্র রাজনীতি বন্ধের এই দাবি রাজনীতির আসল সমস্যাকে আড়াল করবে মাত্র। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটা কোনও সমাধান না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানরা দলীয় লেজুড়বৃত্তিতে জড়িয়েছেন। এ তৎপরতায় তা কমবে কী? হল প্রভোস্ট ও উপাচার্যরা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশগুলোর আলোকে নিরাসক্তভাবে দায়িত্ব পালন করেলেই সমস্যা কমে যেত। ছাত্র রাজনীতি বন্ধের ফলে মৌলবাদী তৎপরতা বাড়বে, অতীতে তাই ঘটেছে।’

এদিকে, শিক্ষকরাও রাজনীতি না করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান বুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি এ কে এম মাসুদ রানা। তিনি মনে করেন, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কোনও রাজনীতি থাকা উচিত না। কেননা, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ভালো ছেলে খারাপ হয়ে যাচ্ছে।’

ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করার দাবিকে আমি সমর্থন করি না, উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর আলী রীয়াজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিরাজমান অবস্থার সমাধান ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করা নয়। দেশে যখন কার্যত রাজনীতিকেই নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে, সেই সময়ে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করার বক্তব্য বিরাজনীতিকরণের পক্ষে যায়। ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করলে ক্ষমতাসীনরাই লাভবান হয়। তারা প্রশাসন এবং রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের ওপরে অন্যায় সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে। তাদের ছত্রছায়ায় বিশ্ববিদ্যালয় দখল রাখতে পারে। শিক্ষার্থীদের দাবি বেআইনি বলে চিহ্নিত করতে পারে।’

বুয়েটের শিক্ষার্থীরা কেন এই দাবি করছেন—তার পটভূমি বিবেচনায় নেওয়া দরকার, উল্লেখ করে এই অধ্যাপক আরও  বলেন, ‘‘আমার মনে হয়েছে, যেহেতু বুয়েটে এবং অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সরকারি ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ছাড়া আর কারও অস্তিত্বই নেই, সেখানে তাদের হাত থেকে রক্ষার উপায় হচ্ছে—এই দাবি তোলা। বুয়েটের বা অন্য কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যদি বলেন, ছাত্রলীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে, তবে তাদেরকে ‘সরকারবিরোধী’ বলে চিহ্নিত করা হবে এবং তাদের ওপরে নেমে আসবে নির্যাতন। তারা সেই বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার বিবেচনায় এই ধরনের দাবি করছেন বলেই আমি অনুমান করছি। এটিই প্রমাণ করে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করলেও এই অবস্থার হেরফের হবে না।’’

/এপিএইচ/এমএমজে/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম