পুলিশের গুলিতে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান নিহতের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পূর্ব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংসদীয় কমিটি।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার পরে এই পরামর্শ দেওয়া হয়।
বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি শামসুল হক টুকু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠকে আলোচনার সময় একজন সদস্য এ প্রসঙ্গটি তুলেছিলেন। তখন বাহিনী প্রধানরা যার যার ব্যাখা দিয়েছেন।’
তিনি জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের বলেছেন, বিষয়টি তদন্তাধীন। তদন্তের স্বার্থে সবকিছু আলোচনা করা ঠিক হবে না। মন্ত্রী আমাদের বলেছেন, ওই ঘটনায় ত্বরিত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। অপরাধী যেই হোক তার বিচার হবে।
কমিটির সভাপতি টুকু বলেন, ‘কমিটির পক্ষ থেকে আমরা বলেছি, এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে। সেজন্য সজাগ থাকতে হবে এবং পূর্ব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।’
প্রসঙ্গত, গত ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা নিহত হন। এ ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এর জন্য পুলিশ কর্মকর্তাদের সরাসরি দায়ী করেন সাবেক সেনা কর্মকর্তারা।
এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। স্পর্শকাতর এ ঘটনায় ৯ জন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে নিহতের বোনের করা মামলায় গ্রেফতার রয়েছেন ওসি প্রদীপ।
ডোপ টেস্টে বিশেষ কর্তৃপক্ষ চালুর সুপারিশ
এদিকে বৈঠকে দেশব্যাপী মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরও গতিশীল ও জোরদার করতে বিএসটিআইর আদলে ডোপটেস্ট/বিশেষ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার জন্য একটি পৃথক প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃপক্ষ গঠনের সুপারিশ করেছে কমিটি।
এ প্রসঙ্গে কমিটির সভাপতি শামসুল হক বলেন, “প্রথমত আমরা ডোপ টেস্ট শব্দের বদলে `বিশেষ স্বাস্থ্য পরীক্ষা‘ কথাটা ব্যবহার করতে বলেছি। ডোপ টেস্ট অনেকে করাতে রাজি হন না। বা বিষয়টিকে নেগেটিভলি দেখেন। যেমন ধরেন আমি রাজনীতিক, আপনি সাংবাদিক। ডোপ করাতে বললে কেমন যেন মনে হয়। তাই বলেছি, বিশেষ স্বাস্থ্য পরীক্ষা। কেউ মাদক কিংবা অননুমোদিত ওষুধ গ্রহণ করছেন কিনা, তা নিশ্চিত হতে ‘ডোপ টেস্ট’ করা হয়। পরীক্ষায় ফল ‘পজিটিভ’ পেলে নিশ্চিত হওয়া যায় যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ওই ধরনের কিছু গ্রহণ করেছেন। ’’
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও চাকরি পাওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে ডোপ টেস্ট করার আগের সুপারিশের কথা উল্লেখ করে টুকু বলেন, ‘সরকারি, বেসরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত চাকরির পূর্ব শর্ত হচ্ছে বিশেষ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হবে। এই সুপারিশ আমরা আগেই করেছি। সব জায়গায় এটা করার জন্য বলেছি। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তির পূর্বে এটা করার জন্য বলছি। ভর্তির আগে এবং চূড়ান্ত পরীক্ষার আগে বিশেষ স্বাস্থ্য পরীক্ষার সনদ জমা দিতে হবে। মানে আমি সুস্থ শিক্ষার্থী নিলাম আর সুস্থ মানবসম্পদ জাতিকে দিলাম। এটা নিশ্চিত করতে হবে।’
বিশেষ প্রতিষ্ঠান চালু করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এই টেস্ট কারা করবে? বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আছে, তারা করতে পারে। কিন্তু সেখানে ম্যানিপুলেট হতে পারে। খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে আলাদা প্রতিষ্ঠান আছে। তাহলে বিশেষ স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান থাকা দরকার। এই প্রস্তাব আমরা দিয়েছি। মন্ত্রণালয় এখন দেখবে এটা বাস্তবসম্মত কিনা।’
সংসদ সচিবালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৈঠকে মাদক সংক্রান্ত মামলার আসামিরা যাতে আইনের ফাঁকফোকড় দিয়ে বের হতে না পারে, সে বিষয়ে সচেষ্ট থাকার জন্য মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেওয়া হয়।
এছাড়া বৈঠকে গণমাধ্যমে মাদকের বিরুদ্ধে প্রচার/প্রচারণা জোরদার করার সুপারিশ করা হয়।
বৈঠকে চলমান কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন জননিরাপত্তা বিভাগ, সুরক্ষা ও সেবা বিভাগ ও অধীন অন্যান্য সংস্থার গৃহীত সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও অন্যান্য কার্যক্রমের প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।
বৈঠকে পুলিশ সদস্যদের আবাসিক সমস্যার সমাধানে নির্দিষ্ট জোনে/ক্যাম্পাসে প্রয়োজনে বহুতল ভবন নির্মাণ করার সুপারিশ করা হয়।
শামসুল হকের সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিটির সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, মো. হাবিবর রহমান, সামছুল আলম দুদু, মো. ফরিদুল হক খান ও পীর ফজলুর রহমান অংশ নেন।







