ব্যাংক কর্মকর্তা গোলাম রাব্বী ও সিটি করপোরেশন কর্মকর্তা বিকাশ চন্দ্র দাস পুলিশের হাতে নির্মমভাবে নির্যাতিত হওয়ার পর থেকে রীতিমতো পুলিশি ট্রমায় ভুগছেন তারা। তাদের চোখেমুখে রীতিমতো আতঙ্কের চাপ। চিকিৎসকরাও তাদের কথা বলতে বারণ করেছেন। এ দিকে, দুই কর্মকর্তাকে নির্যাতনের ঘটনায় পুলিশ সদর দফতর ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ব্যাংক কর্মকর্তা গোলাম রাব্বী ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ৪/এ নম্বর কেবিনে রয়েছেন। আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) কর্মকর্তা বিকাশ চন্দ্র দাস ল্যাব এইড হাসপাতালে আইসিওতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গোলাম রাব্বীর অবস্থা কিছুটা উন্নতির দিকে। তবে, তাকে বেশি কথা বলতে বারণ করেছেন চিকিৎসকরা। ল্যাব এইডে চিকিৎসাধীন বিকাশ চন্দ্র পালের অবস্থা গুরুতর। তিনি এখনও কথা বলতে পারছেন না। তার শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়ে শনিবার রাতে চিকিৎসকরা বিস্তারিত জানাবেন বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানান তার ভগ্নিপতি চন্দন দাস।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন গোলাম রাব্বীর সঙ্গে সার্বক্ষণিক অবস্থান করছেন তার বন্ধু জাহিদ হাসান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, রাব্বীর শরীরের পুলিশের নির্যাতনের চিহ্নগুলো হয়তো আর কয়েকদিন চিকিৎসা নিলে সেরে যাবে। কিন্তু রাব্বী মানসিকভাবে বেশি আঘাত পেয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এজন্য তার দীর্ঘ মেয়াদি চিকিৎসা নিতে হবে বলেও চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
জাহিদ হাসান জানান, বৃহস্পতিবার রাতে দুই ব্যক্তি রাব্বীর কেবিনে গিয়ে তাকে বাড়াবাড়ি না করারও হুমকি দিয়ে গেছেন। তারা কেবিনে ঢোকার আগে নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়েছিলেন। এতে আরও বেশি ভীত সন্ত্রস্ত্র হয়ে পড়েছেন রাব্বী। বিষয়টি হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিজানুর রহমানকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। তিনি তাদের বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন। শনিবার দুপুরে পুলিশ গিয়ে রাব্বীর কেবিনের ভেতর-বাহিরের দিকগুলো পরিদর্শন করে এসেছে।
গত শনিবার ৯ জানুয়ারি রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাবলিক রিলেশন্স সম্পর্ক বিভাগের সহকারী কর্মকর্তা গোলাম রাব্বী টহল পুলিশের হাতে লাঞ্ছিত হন। মোহাম্মদপুর থানার এসআই মাসুদ শিকদারসহ পুলিশ ও আনসারের পাঁচ সদস্য রাব্বীকে বেধড়ক পিটিয়ে গুরুতর আহত করে। পরে তাকে মাদক মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন মাসুদ শিকদার। বিষয়টি সাংবাদিকরা জানতে পারলে পুলিশ তাকে ছেড়ে দেয়। মাসুদ শিকদারের টহল দলে থাকা পুলিশ সদস্যদের নাম জানাতে অনীহা প্রকাশ করেন মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ।
মনিরুল বলেন, দু’টি ঘটনায় ডিএমপি ও পুলিশ সদর দফতর থেকে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিগুলোর সুপারিশ অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরইমধ্যে মোহাম্মদপুরের ব্যাংক কর্মকর্তা গোলাম রাব্বীকে নির্যাতনের ঘটনায় এসআই মাসুদ শিকদারকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
অপরাধী পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি তাদের তদারকি কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মনিরুল বলেন, এসব ঘটনায় টহল পুলিশের অন্য সদস্যদের জড়িত থাকা এবং তদারকি কর্মকর্তাদের কোনও অবহেলা ও গাফিলতি আছে কি না—তাও তদন্ত কমিটি খতিয়ে দেখবে। তদন্ত কমিটিগুলোর সুপারিশ অনুযায়ী অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মনিরুল জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা গোলাম রাব্বী ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) কর্মকর্তা বিকাশ চন্দ্র দাসকে নির্যাতনের ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে পুলিশ সদর দফতর। অতিরিক্ত ডিআইজি ব্যারিস্টার মো. হারুন অর রশিদের নেতৃত্বে তিন সদস্যের এ তদন্ত কমিটিতে একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও একজন পুলিশ পরিদর্শক রয়েছেন। উল্লেখ্য, শনিবার নয়টার দিকে, তদ্ন্তকমিটির সদস্যরা চিকিৎসাধীন রাব্বীকে হাসপাতালে কথা বলতে যান।
এদিকে, বিকাশ চন্দ্র দাসকে নির্যাতনের ঘটনা তদন্তে ডিএমপি’র ওয়ারি জোনের উপ-কমিশনার (ডিসি) সৈয়দ নূরুল ইসলামকে প্রধান করে আরও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন একই জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মাঈনুল হক ও সহকারী কমিশনার (এসি) কামরুল ইসলাম।
শুক্রবার ভোরের রাজধানীর মীরহাজিরবাগ এলাকায় কর্তব্যরত অবস্থায় বিকাশকে বেদম মারধর করে সাদা পোশাকে থাকা যাত্রাবাড়ী থানার কয়েকজন পুলিশ সদস্য। নিজের পরিচয়পত্র দেখানোর পরও ছিনতাইকারী অভিযোগ তুলে তাকে মারধর করা হয় বলে তার স্বজনরা জানান।
/এমএনএইচ/
/আপ-এএ/








