টাকা ফিরিয়ে আনা নিয়ে তুমুল আলোচনা

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
১৬ জুন ২০২২, ২২:১৫আপডেট : ১৬ জুন ২০২২, ২২:১৫

বাজেটে অর্থপাচারকারীদের সুবিধা দিয়ে টাকা ফিরিয়ে আনার প্রস্তাবের পক্ষে-বিপক্ষে সংসদে বক্তব্য রেখেছেন সরকারি ও বিরোধী দলের কয়েকজন সংসদ সদস্য।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুন) ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় সরকারি দলের একাধিক সদস্য বলেন, অপ্রদর্শিত আয় প্রকাশ হলে বিনিয়োগ বাড়বে। অপরদিকে বিরোধী দলের সদস্যরা বলেছেন, এর ফলে টাকা পাচার আরও বাড়বে।

গত ৯ জুন জাতীয় সংসদে ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দেন অর্থমন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল।

এ বাজেটের বিশাল ব্যয় মেটানোর জন্য অর্থ সংগ্রহে অর্থমন্ত্রী নতুন একটি পথ খুঁজে বের করেন। বিদেশ থাকা সম্পদের ‘দায়মুক্তি’ দিয়ে তিনি তা দেশে আনার ঘোষণা দিয়েছেন।

এর ফলে ৭ শতাংশ কর দিয়ে বিদেশে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি দেশে সরকারের খাতায় বৈধ আয়ের তালিকায় যুক্ত করা যাবে, সেই অর্থ দেশেও আনা যাবে। ওই আয়ের উৎস জানতে চাওয়া হবে না।

আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি দলের সংসদ সদস্য আবদুস শহীদ বলেন, ‘অপ্রদর্শিত টাকা থেকে থাকলে তা কোনও কাজে লাগছে না। সেটা ব্যবহারের যে সুযোগ দেওয়া হয়েছে, সেটা অর্থপাচারের বিষয় নয়।  অর্থপাচারের জন্য যে আইন আছে, সেটা অবশ্যই প্রয়োগ করা হবে। প্রয়োগের মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থায় আনা যাবে। এটা করা হলে টাকা কাজে লাগবে। অপ্রদর্শিত আয়কে যদি প্রকাশ করা বা বিনিয়োগ করা না যায়, তাহলে সমৃদ্ধি সম্ভব হবে না।’

এই সংসদ সদস্য আরও বলেন, ‘চা শ্রমিকরা যে মজুরি পায়, তা দিয়ে তাদের চলে না।’ দৈনিক মজুরি ৫শ’ টাকা এবং অন্যান্য সুযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা করার দাবি তোলেন তিনি।

জাতীয় পার্টির মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, ‘মূল্যস্ফিতি নিয়ন্ত্রণের কোনও রূপরেখা অর্থমন্ত্রী দেননি। তিনি টাকা পাচার করে তা হালাল করার সুযোগ দিয়েছেন। ৪০ বছর যাবৎ বিভিন্ন সরকার কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েছেন, কিন্তু লাভ হয়েছে খুব কম। ব্যবসা করলে ২৫ শতাংশ কর দেওয়া লাগে। আর টাকা পাচার করে ৭ শতাংশ কর দিয়ে তা আবার ফিরিয়ে আনা যাবে। এতে মানুষ টাকা পাচারে উৎসাহী হবে। শুধু এটাই না, এটি দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, মানি লন্ডারিং আইন, সংবিধানের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এসব আইন সংশোধন করা না হলে টাকা কীভাবে আনবেন? কোনও সুযোগ নেই।’

কালো টাকা নিয়ে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে চুন্নু বলেন, তিনি (চুন্নু) একাধিকবার সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু তার ঢাকায় ফ্ল্যাট নেই, স্ত্রীর বাসায় অনেক দিন থেকেছেন। ২০১০-১১ সালে একটি প্লট পেয়েছেন। অর্থমন্ত্রীর নতুন সংজ্ঞা অনুযায়ী এখন তিনি কালো টাকার মালিক।

শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে যারাই ঢাকায় প্লট ফ্ল্যাটের মালিক, তারা কালো টাকার মালিক। তিনি আইন লঙ্ঘন করে কালো টাকার মালিক হয়েছেন কিনা, সংসদে অর্থমন্ত্রীকে ব্যাখ্যা দেওয়ার দাবি জানান।

‘দ্য গুড, দ্য ব্যাড, দ্য আগলি’ সিনেমার মতো তিনি বাজেট প্রস্তাবকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন জানিয়ে বলেন, ‘ভালো বিষয়গুলো সরকারি দল বলবে। ব্যাড হলো, এমন প্রকল্প রাখা হয়েছে যেগুলোর দরকার নেই। কর্মসংস্থান সৃষ্টির রূপকল্প নেই। ব্যাংক খাত থেকে ঋণের কারণে বেসরকারি খাতে প্রবৃদ্ধি সংকুচিত হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কর্মপরিকল্পনা না থাকায় মানুষ চাপে পড়বে। দরিদ্র মানুষ চাপে পড়বে। করমুক্ত সীমা না বাড়ায় মধ্যবিত্ত শান্তি পাবে না। আর সবচেয়ে খারাপ হলো পোশাক খাত এমনিতে চ্যালেঞ্জে আছে, সেখানে উৎসে কর বাড়ানো হয়েছে, এতে বিরূপ প্রভাব পড়বে। আর পাচার করা টাকা ফিরিয়ে আনার অপকর্মকে লিগ্যালি সুযোগ দেওয়া হবে। এতে টাকা পাচারকে উৎসাহিত করা হবে।’

সরকারি দলের সংসদ সদস্য নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘এটি ব্যতিক্রমী বাজেট। ঐতিহাসিক মানবিক বাজেট। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে জোর দেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর চিকিৎসার জন্য অনেক মানুষ বিদেশ যাচ্ছে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের বিকল্প নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান সময়ে সড়ক দুর্ঘটনা ও যানজট বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়ক  দুর্ঘটনা ও যানজটকে জরুরি বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করে বাজেটে বরাদ্দ দেওয়া উচিত।’

আওয়ামী লীগের দীপঙ্কর তালুকদার পার্বত্য শান্তি চুক্তির কথা তুলে ধরে বলেন, ‘যারা অবৈধ অস্ত্রধারী তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে। অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সচেতন থাকতে হবে।’

সরকারি দলের সদস্য আ ক ম সরোয়ার জাহান বলেন, ‘কর দিয়ে পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনার যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তা সঠিক। তবে এজন্য কর ৭ শতাংশ নয় ১০ শতাংশ করা দরকার।’

অপ্রদর্শিত অর্থও ১০ শতাংশ কর দিয়ে বৈধ করার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি।

বিএনপির সংসদ সদস্য মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘এই বাজেটে শুধু লুটেরারা সুযোগ পেয়েছে। গত ১৪ বছরে সরকার ঘনিষ্ঠরা বিপুল টাকা বিদেশে পাচার করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, কানাডার বেগমপাড়ায় বাড়ি করেছে, সিঙ্গাপুরে পাঁচ তারকা হোটেল করেছে। যারা টাকা পাচার করেছে তারা যদি সামান্য কর দিয়ে টাকা ফিরিয়ে আনার সুযোগ পায়, তাহলে যারা কর দেন তারা উৎসাহ হারাবেন।’ তিনি বলেন, ‘বাজেটে বড় ব্যবসায়ী ও ঋণ খেলাপিদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।’

সরকারি দলের ওমর ফারুক চৌধুরী বলেন, ‘এই বাজেটে আমি কোথায়? আমার এলাকা কোথায়? আমরা যখন বাজেট নিয়ে কথা বলছি, তার অনেক আগেই বাজেট লেখা হয়ে যায়। আমাদের কিছু করণীয় নেই। আমার প্রস্তাব হবে— বাজেট অধিবেশন হবে ফেব্রুয়ারি, মার্চ, এপ্রিল মাসে। সেখানে আমরা বক্তব্য রাখবো। আমাদের এলাকার বিষয়ে কথা বলবো। মন্ত্রীরা সেগুলো কম্পাইল করে বাজেট উপস্থাপন করবেন।’

আলোচনায় আরও অংশ নেন— সরকারি দলের আব্দুস শহীদ, নূর মোহাম্মদ, শাহে আলম, নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়ন, দীপঙ্কর তালুকদার, আকম সারোয়ার জাহান, এম এ মতিন, মনোরঞ্জন শীল গোপাল, সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুল, মামুনুর রশীদ কিরণ খালেদা খানম, সুলতানা নাদিরা, একরামুল করিম চৌধুরী।

 

/ইএইচএস/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
বাজেট অধিবেশন ৭ জুন থেকে 
জিডিপির বড় অংশ স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ব‌্যয় করবে সরকার, সংসদে প্রধানমন্ত্রী
প্রথম অধিবেশন শেষবিরোধী দলসহ সবাইকে নিয়ে কাজ করার প্রত্যয় প্রধানমন্ত্রীর
সর্বশেষ খবর
হবিগঞ্জে নারীর মুখে এসিড নিক্ষেপ, আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় প্রেরণ
হবিগঞ্জে নারীর মুখে এসিড নিক্ষেপ, আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় প্রেরণ
বগুড়ায় দই বিক্রি করে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা গুনলেন ব্যবসায়ী 
বগুড়ায় দই বিক্রি করে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা গুনলেন ব্যবসায়ী 
৩৮ বছর বাড়ি ফিরে বিপদে জবেদ, স্ত্রী বললেন স্বামী হিসেবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়
৩৮ বছর বাড়ি ফিরে বিপদে জবেদ, স্ত্রী বললেন স্বামী হিসেবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়
বিপর্যয়ের মুখে সুন্দরবন
বিপর্যয়ের মুখে সুন্দরবন
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি