একাত্তরজুড়ে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ কেন জরুরি ছিল

উদিসা ইসলাম
০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ০৮:০০আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ০৮:০০

মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের গণহত্যা ও পাকিস্তানের বর্বরোচিত হামলার খুঁটিনাটি তুলে ধরতে গণমাধ্যমের ভূমিকা  ছিল অনন্য। প্রতিবেশী দেশের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী শুরুতেই তার দেশের নেতৃত্বকে বুঝিয়েছেন—বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিদেশে প্রকৃত তথ্য সরবরাহ ও বিশ্বনেতৃত্বকে পক্ষে আনা। দেশে-বিদেশে যেখানেই বাঙালিরা ছিল, তারা সংগঠিত হয়ে দেশের স্বাধীনতার বাস্তবতা তুলে ধরতে ও আর্থিক সহায়তা পেতে চেষ্টা করে গেছেন। 

ভারতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, ৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ বাংলাদেশের ওপর একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন উদ্বোধন হয়। টাইমস অব ইন্ডিয়ার রিপোর্ট—নয়া দিল্লিতে শুরু হয় বাংলাদেশ বিষয়ক তিন দিনব্যাপী সম্মেলন। এর আয়োজন করেছিল গান্ধী পিস ফাউন্ডেশন। সম্মেলনটি ছিল বাংলাদেশ ইস্যুটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের একটি বড় আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে বাংলাদেশে যা ঘটছে, তা সারা বিশ্বে শিরোনামে ছিল ঠিকই, বিশ্বনেতৃত্বকে সেটা আরও  স্পষ্ট করে দেখানোর সুযোগ নেওয়া হয়।

বাংলাদেশের জনগণের ওপর গণহত্যার নিন্দা এবং তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে সমর্থন করার জন্য অনেক দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা এই সম্মেলনে যোগ দেন। সম্মেলন শুরুর আগে, গান্ধী পিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান জয়প্রকাশ নারায়ণের পরামর্শে  বাংলাদেশের জন্য যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অংশগ্রহণকারীরা দুই মিনিট নীরবতা পালন করেন।

সেখানে নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিপি কৈরালা বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ের জন্য একটি আন্তর্জাতিক ব্রিগেড গঠনের আহ্বান জানান। এই যে সবাই সম্পৃক্ত হওয়ার প্রয়োজন বোধ করছেন, সেটার ক্ষেত্র তৈরি করে দেওয়া সেসময় খুব জরুরি ছিল।

ইন্দোনেশিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোহাম্মদ রোয়েম অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এই বিষয়টি তুলে ধরেন যে বাংলাদেশের সমস্যা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয় এবং জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ করার যথেষ্ট এখতিয়ার এখানে রয়েছে।

এরও আগে ৬ জুন ১৯৭১ কালান্তরে প্রকাশিত হয় আরেকটি বিদেশি উদ্যোগের কথা। সেটি ছিল বার্মিংহামে পাকিস্তানি ক্রিকেট দলের বিরুদ্ধে বৃহত্তম সমাবেশ অনুষ্ঠিত হওয়ার খবর। ইংল্যান্ড-পাকিস্তান প্রথম টেস্টের তৃতীয় দিনে তিন হাজার বাংলাদেশি সমর্থক বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। পাকিস্তানি ক্রিকেট দলকে বিদেশ সফরে গিয়ে এর আগে কখনও এত বড় বিক্ষোভ মিছিলের সম্মুখীন হতে হয়নি। মিছিলে ৫০ জন পঙ্গু নারী পেরাম্বুলেটরে চড়ে যোগ দেন বলেও খবরে প্রকাশ হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার দলিলপত্রে প্রতিবেদনটি সংযুক্ত আছে।

১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ দ্য স্টেটমেন্ট পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে হলা হয়—২৪ জাতি সম্মেলন থেকে আহ্বান জানানো হয়েছে যে মুজিবকে বিনা শর্তে মুক্তি দেওয়া হোক। এর আগে ৬ জুন ১৯৭১ ‘বাংলাদেশের ব্যাপারে শুধু বিশ্ববিবেক নয়, দেশের বিবেক জাগাতে হবে’ শিরোনামে কলকাতার যুগান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। তাতে বলা হয়—লোকসভায় কল্যাণসুন্দরম মন্তব্য করে ভারত সরকার পাকিস্তানকে তুষ্ট করে চলেছে। এ কথায় শ্রীমতি গান্ধী মর্মাহত হন। একজন সিপিআই নেতা চেম্বারলিনের কুখ্যাত নীতির সঙ্গে ভারত সরকারের পাকিস্তান নীতির তুলনা টানবেন, এমন কথা প্রধানমন্ত্রী কল্পনা করেননি। তিনি খুব জোরের সঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণে তৎপর রয়েছে উল্লেখ করে অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের ঘটনাবলি সম্পর্কে খেয়াল রাখছি।’ তবে সেদিন এর চেয়ে বড় কোনও আশ্বাসও প্রধানমন্ত্রী দেননি।

ইন্দিরা বলেন, ‘আমরা আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বিদেশে পাঠিয়েছি। তিনি কয়েকটি দেশে গিয়ে বাংলাদেশের সমস্যা বুঝিয়ে বলবেন। শিল্পোন্নয়নমন্ত্রী শ্রী খালিদ কর কূটনীতিক কাজে এত ব্যস্ত যে শরণার্থীদের দেখাশোনার কাজটি তিনি তার অধস্তনদের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশের বিষয়ে নয়া দিল্লির বক্তব্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে বুঝিয়ে দিয়ে তাদের আমাদের পক্ষে নিয়ে আসার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী সিদ্ধার্থ শংকর রায়।’

ইন্দিরা গান্ধী আরও বলেন, ‘ভারত সরকারের বিশ্বাস, আর কিছু দিনের মধ্যে পাকিস্তান নিজে থেকে ধসে পড়বে। একদিকে যুদ্ধের বিপুল ব্যয় অপরদিকে বাংলাদেশের পাট  ও চা বিক্রি করে বিদেশি মুদ্রা ঘরে আনা বন্ধ। এই দুই মিলে পাকিস্তানের ধ্বংস অনিবার্য। তা যদি হয় তাহলে ভারতকে শুধু দেখতে হবে যে পাকিস্তান যেন বিদেশি সাহায্যের মাধ্যমে আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে না পারে।’

৮ জুন, ১৯৭১ হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড জানায়, শুরু হওয়া ২০তম আন্তর্জাতিক প্রেস ইনস্টিটিউটের সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশ প্রশ্নটি প্রাধান্য পাবে। এতে কোনও সন্দেহ নেই যে পূর্ব বাংলার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কও সেখানে উঠে আসবে। কারণ, তাদের সম্পর্কে ইতোমধ্যে আলাপ শুরু হয়েছে। শ্রী অশোক কুমার সরকার এবং অন্য ভারতীয় প্রতিনিধিদের ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক এবং বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় বারবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছে। আইপিআই সার্কেল সেসময় দুটি পয়েন্ট নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিল। এক. পূর্ব বাংলায় সন্ত্রাসের রাজত্ব বিরাজ করছে, যা উদ্বাস্তুদের ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য করছে এবং দুই. যতদিন সে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকবে, ততদিন তারা পূর্ব বাংলায় ফিরবে না।

পূর্ব বাংলার পরিস্থিতির গাম্ভীর্য সেসময় থেকেই ধীরে ধীরে বিদেশেও উপলব্ধ হয়। সুতরাং, আইপিআই সাধারণ পরিষদে কিছু পাকিস্তানি প্রেস প্রতিনিধির সম্ভাব্য প্রচেষ্টা ছিল—স্পষ্টতই বিশ্ব প্রেসকে বিভ্রান্ত করা এবং পূর্ব বাংলা থেকে তাদের মনোযোগ সরিয়ে নেওয়ার। কিছু প্রতিনিধি ইতোমধ্যে পাকিস্তানি প্রপাগান্ডায় বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।

যুক্তরাজ্য সরকার তখনও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও আমাদের মিশন প্রতিষ্ঠায় কোনও বাধা দেয়নি উল্লেখ করে সেসময় লন্ডন প্রবাসী শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যুক্তরাজ্যের ভারতীয় দূতাবাস সার্বক্ষণিক আমাদের সহায়তা করছিল। নভেম্বর মাসে ইন্দিরা গান্ধী লন্ডনে এলে তিনি বাঙালি ও ভারতীয় মহাসম্মেলনে ভাষণ দেন, যা বাস্তবায়িত করতে আমাদেরও ভূমিকা ছিল।’

তিনি জানান, প্রত্যক্ষ সমর শুরুর পর ডিসেম্বরে ভারত এবং ভুটান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর সেসময় আমরা আনন্দে মেতে থাকি এবং ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণ খবরের পর সব বাঙালি আনন্দে আত্মহারা হয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস যারা যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশে ছিলেন, তারা বাংলাদেশের দাবির পক্ষে এবং পাকিস্তানি গণভোটের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে জনমত সৃষ্টিতে কার্যকর অবদান রাখতে পেরেছিলেন। তাদের এবং অন্যান্য দেশের প্রবাসীদের অবদান স্বীকার করে সরকার ২০১৮ সালে প্রবাসী আন্দোলনকারীদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য আইন প্রণয়ন করে।

/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
ভাঙচুরের পর দেড় বছরেও সংস্কার হয়নি বরিশালের সবচেয়ে বড় বধ্যভূমি
বিজয় দিবসের মঞ্চে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান মুক্তিযোদ্ধার, অনুষ্ঠান স্থগিত
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘রাজাকার-আলবদরের’ প্রতীকীতে জুতা নিক্ষেপ ছাত্রদলের
সর্বশেষ খবর
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
বিএসইসির চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ ও ৪ কমিশনারের পদত্যাগ
বিএসইসির চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ ও ৪ কমিশনারের পদত্যাগ
দাম বৃদ্ধির একদিন পরই লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য রিভিউ আবেদন
দাম বৃদ্ধির একদিন পরই লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য রিভিউ আবেদন
ফোনালাপ ফাঁসের পর বদলি করা হলো জেল সুপারকে
ফোনালাপ ফাঁসের পর বদলি করা হলো জেল সুপারকে
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম