জনসম্মুখে লেখক ব্লগার অভিজিৎ রায়কে টিএসসির যে স্থানে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে, সেই ফুটপাত পড়ে আছে অযত্নে, হাজারো মানুষের পা মারিয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন সে স্থানটি, যেখানে অভিজিৎ এর মগজের অংশ, তার স্ত্রী বন্যা আহমেদের আঙুলের অংশ পড়েছিল। যে অভিজিৎ চেয়েছিলেন এদেশের কূপমুণ্ডক মানুষকে বিজ্ঞানমনস্ক ও যুক্তিবাদী করে তুলতে। সেই অভিজিৎ এর নাম নেওয়া যেন বাড়ন। বাংলা একাডেমির বইমেলা প্রাঙ্গন থেকে বের হয়েই খুন হতে হয়েছিল প্রবাসী এই ব্লগারকে। সেই ব্লগারের জন্য পরের বইমেলায় যেন জায়গা নেই। কিসের নিষেধ সে প্রশ্নেরও জবাব দিতে রাজি না কেউ। আমরা তাদের জন্য কিছু করিনি।
২৬ ফেব্রুয়ারি একবছর হবে সেই ভয়াল হামলার। এক বছরে অনেক কিছু ঘটেছে কিন্তু খুনিদের পাওয়া যায়নি। আর সামান্য কোন স্মৃতিস্তম্ভ দিয়েও জায়গাটিকে সংরক্ষনের যোগ্য করে তোলা হয়নি। অভিজিৎ এর জন্য গণজাগরণমঞ্চ সেখানে নিয়মিত কিছু কর্মসূচি পালন করেছে আর টাঙানো আছে একটা ব্যানার। কেন এমন করে হারিয়ে দিতে দেওয়া হলো অভিজিৎ এর স্মৃতিকে জানতে চাইলে তার বাবা বলেন,অভিজিৎ নামটা উচ্চারণ করছেন সেইতো অনেক। কতকিছু ঘটে গেলো একবছরে। কতকিছু বানানোর চেষ্টা হলো অভিজিৎকে। এরপরতো আমরা দীপনসহ অনেককে হারালাম। কিন্তু কিছুই করা গেছে কী? স্মৃতিস্তম্ভ দিয়ে কী হবে?
বিজ্ঞান লেখক, ব্লগার ও মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায়কে গত ২৬ ফেব্রয়ারি বইমেলা থেকে বের হওয়ার পর কুপিয়ে হত্যা করে জঙ্গি মৌলবাদীরা। টিএসসির উল্টো পাশের রাস্তায় পড়েছিল তার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া মগজের অংশ, বন্যার কাটা আঙুল আর ফুটপাতে বইছিল রক্তের স্রোত। সেখানে একটি ব্যাগও পেয়েছে পুলিশ। পুলিশ সূত্রে জানা যায়- ব্যাগের ভেতরে কয়েকটি পেপার (সংবাদপত্র) ভাঁজ করা ছিল, যা দেখে মনে হয় ওই কাগজে চাপাতিগুলো মোড়ানো ছিল। ল্যাপটপের ওই ব্যাগে একটি জিন্স প্যান্ট ও কয়েকটি প্যারাসিটামল ট্যাবলেটও পাওয়া গেছে। ব্যাগটি হামলাকারীদের বলে ধারণা পুলিশের।
মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী প্রকৌশলী অভিজিৎকে তার লেখালেখি ঘিরে হুমকি দিয়ে আসছিল জঙ্গিবাদীরা। এর মধ্যেই গত ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি বাংলাদেশে ফেরেন। এবারের একুশের বইমেলায় তার দুটি বই প্রকাশিত হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ঠিক উল্টো দিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানঘেঁষে ফুটপাতে অভিজিৎ ও বন্যার ওপর হামলা হয়। অভিজিৎ ও বন্যা একটি রিকশায় চেপে টিএসসির দিকে যাচ্ছিলেন। দুর্বৃত্তরা রিকশা থামিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায়।
হত্যার সেই স্থানে রক্তের দাগ নেই কিন্তু যারা স্থানটি চেনেন তারা এখনও সেখানে পা দিয়ে হাটতে দ্বিধা করেন। সরেজমিনে দেখা গেল, স্থানটিতে ময়লা পড়ে আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। কারোর কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। পাশে টাঙানো আছে গণজাগরণমঞ্চের একটি ব্যানার। সেদিকে কারোর নজর গেলেও এক মিনিট দাঁড়িয়ে বোঝার চেষ্টা নেই।
গণজাগরণমঞ্চ শুরু থেকেই এখানে ধারাবাহিকভাবে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালানো,পুস্পস্তবক দেওয়ার কাজটি করে আসছে। মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার বলেন,‘হত্যাকাণ্ডের স্থানটিকে পরিকল্পিতভাবে ময়লা ফেলে অপরিচ্ছন্ন রাখা হতো। এটা অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ডকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে। আমরা সম্প্রতি জায়গাটা পরিস্কার করার চেষ্টা করেছি।’
তিনি আরও বলেন,‘আমরা বিচারের দাবি জানানোর বেশি আর কিইবা করতে পারি। সেই দাবিটা জিইয়ে রাখাটাও একটা বড় কাজ। আমাদের মুক্ত চিন্তায় অভিজিৎ এর যে অবদান সেটাকে সংরক্ষণ করার জন্য হলেও এখানে একটা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ জরুরি।’
অভিজিৎ এর বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অজয় রায় বলেন,বাংলাদেশেতো এখন মুক্তবুদ্ধি চর্চার স্থান ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। কাউকে বলে কিছু করানোতে আমার আগ্রহ নেই। যে যেভাবে পারবে ঠিকই অভিজিৎ এর কাজকে খুঁজে নেবে।
অভিজিৎ এর স্ত্রী বন্যা আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এটা বাংলাদেশের মানুষকেই করতে হবে। যদি তাদের মনে অভিজিতের জন্য যথেষ্ট ভালবাসা, সম্মান থাকে এবং অভিজিৎ যদি তাদের মনে কোনও প্রভাব ফেলে থাকেন, তাহলে সেখানে একদিন কিছু একটা তৈরি হবেই।
ছবি: নাসিরুল ইসলাম।
/এপিএইচ/








