গাজীপুরে অবস্থিত মাদ্রাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে খোঁজ মিলেছে গম্বুজওয়ালা শহীদ মিনারের। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রায় কুড়ি বছর আগে শহীদ মিনারটি নির্মাণ করা হয়। ভাষা শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য জাতীয়ভাবে নির্দিষ্ট কোনো নকশা না থাকায় এতদিন বিষয়টি নিয়ে কেউ কথা বলেননি। এর নকশাকার কে, কেন তিনি এতে গম্বুজ লাগিয়েছেন কর্তৃপক্ষ তা জানাতে পারেনি। অনেকেই ধারণা করছেন, মাদ্রাসা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বলেই হয়তো এ রকম শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে।
তবে এ ধরনের স্থাপত্য শহীদ মিনারের ‘স্পিরিট’কে স্তিমিত করতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অ্যাক্টিভিস্টরা। আর স্থপতিরা বলছেন, এই ডিজাইনে পাশের দুটি ফর্মের মাঝখানে গম্ভুজ আকারের যে ফর্ম ব্যবহার হয়েছে তা বেখাপ্পা, সামঞ্জস্যহীন। তবে যথাযথভাবে গম্বুজের ব্যবহার করে যে কোনও স্মৃতিসৌধ বানানো যেতে পারে।
আইনজীবীরা বলছেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব শহীদ মিনারের একটি অর্থপূর্ণ কাঠামো প্রস্তুত করা, যেন দেখলেই চেনা যায় এটা শহীদ মিনার। একনজরেই যেন যে কেউ বুঝতে পারেন এটা ভাষা শহীদদের স্মরণে নির্মিত।
বাংলাপিডিয়ার তথ্যানুযায়ী, ১৯৫৭ সালে শিল্পী হামিদুর রহমানের পরিকল্পনা ও নকশা অনুযায়ী মেডিকেল হোস্টেল প্রাঙ্গণের একাংশে শহীদ মিনার তৈরির কাজ শুরু হয়। নকশায় মিনারের মূল অংশে ছিল মঞ্চের ওপর দাঁড়ানো মা ও তার শহীদ সন্তানের প্রতীক হিসেবে অর্ধবৃত্তাকার স্তম্ভের পরিকল্পনা। স্তম্ভের গায়ে হলুদ ও গাঢ় নীল কাচের অসংখ্য চোখের প্রতীক খোদাই করে বসানোর কথা ছিল, যেগুলি থেকে প্রতিফলিত সূর্যের আলো মিনার-চত্বরে বর্ণালীর এফেক্ট তৈরি করবে। এছাড়া মিনার-স্থাপত্যের সামনে বাংলা বর্ণমালায় গাঁথা একটি পূর্ণাঙ্গ রেলিং তৈরি ও মিনার চত্বরে দুই বিপরীত শক্তির প্রতীক হিসেবে রক্তমাখা পায়ের ও কালো রঙের পায়ের ছাপ আঁকাও মূল পরিকল্পনায় ছিল। পাশে তৈরি হওয়ার কথা ছিল জাদুঘর, পাঠাগার ও সংগ্রাম-বিষয়ক দীর্ঘ দেয়ালচিত্র (ম্যুরাল)।
শহীদ মিনার নির্মাণের সময় এ বিষয়গুলো মাথায় রাখা দরকার কি না বা এ বিষয়ে আইনে বাধ্যবাধকতা আছে কি না জানতে চাইলে ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ বলেন, ‘আমরা আজকে যা করছি তা কিন্তু আগামীতে ইতিহাসের একটা অধ্যায় হয়ে দাঁড়াবে। আমরা আসলে কতোটা সচেতন আমাদের নিজেদের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য নিয়ে, সেটা ভাবার সময় এসেছে। শহীদ মিনারের একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও স্পিরিট আছে। আমাদের রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো- এসব বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ গবেষণা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটা আমাদের রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। আমাদের সংবিধানের ২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্র জনগণের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার রক্ষণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং জাতীয় ভাষা, সাহিত্য ও শিল্পকলার এমন পরিপোষণ ও উন্নয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে যাতে সর্বস্তরের জনগণ জাতীয় সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধিতে অবদান রাখার ও অংশগ্রহণ করার সুযোগ লাভ করতে পারেন।’
সংবিধানের ২৪ অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে তুরিন বলেন, ‘বিশেষ শৈল্পিক কিংবা ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ বা তাৎপর্যপূর্ণ স্মৃতি নিদর্শন, বস্তু বা স্থানকে বিকৃতি, বিনাশ বা অপসারণ হইতে রক্ষা করার জন্য রাষ্ট্র ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’
স্থপতি শাকুর মজিদ বলেন, ‘ব্যাপারটা নিয়ে আমি কনফিউজড (বিভ্রান্ত)। সাড়ের তিন হাজার বছর আগে প্রথম স্মৃতিস্তম্ভ বানায় মিশরীয়রা, তখন ওপরে ত্রিভুজ ছিল। এ উপমহাদেশে সাতশ’ বছর আগে প্রথম হয় কুতুব মিনার, সেটাতে গম্বুজ ছিল। ত্রিভুজ (প্রিজম) বা গোলক (গম্ভুজ) জ্যামিতিক আকার। এগুলোর ব্যবহার হতে পারে। তবে বাংলাদেশের শহীদ মিনারের একটা ধাঁচ নির্ধারণ হয়ে গেছে, সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একই রকমের ডিজাইন কপি করে বানানো হচ্ছে, সেখানে কোথাও গম্বুজ ব্যবহার হয় না। আর এই ডিজাইনে পাশের দুটি ফর্মের মাঝখানে গম্ভুজ আকারের যে ফর্ম ব্যবহার হয়েছে তা বেখাপ্পা, সামঞ্জস্যহীন। তবে যথাযথভাবে গম্বুজের ব্যবহার করে যে কোনও স্মৃতিসৌধ বানানো যেতেই পারে।’
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস স্ট্রাটেজি ফোরামের সদস্য ওমর শেহাব বলেন, ‘আসলে যিনি ডিজাইন করেছেন, তিনি কী চিন্তা থেকে করেছেন তা জিজ্ঞেস না করলে তো বোঝা যাবে না। এমনিতে আমি কখনই আশা করি না যে সব শহীদ মিনারের ডিজাইন আমার পছন্দ হবে। কাজেই গম্বুজ থাকলে আমার ব্যক্তিগত কোনও সমস্যা নেই। যদি নকশাকার এই ভেবে করে থাকেন, মাদ্রাসায় যেহেতু ইসলাম ধর্ম পড়ানো হয় কাজেই এখানকার শহীদ মিনারের নকশায় গম্বুজ থাকলে সেটি যে একটি ইসলামঘনিষ্ঠ স্থাপনা সেটি বোঝানো যাবে, এটা খুবই ছেলেমানুষি চিন্তা-ভাবনা। কারণ ইসলাম ধর্মের শুরুর দিকে মসজিদগুলোতে গম্বুজ ছিল না।’
তিনি আরও বলেন, ‘এমনও হতে পারে যে নকশাকার ভেবেছেন, যেহেতু বেশিরভাগ প্রশিক্ষণার্থী মাদ্রাসা থেকে এসেছেন, সাংস্কৃতিক কারণে তাদের শহীদ মিনার ধারণাটির প্রতি বিরূপ মনোভাব থাকতে পারে। সব মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর মধ্যে অবশ্যই এই বিরুপ ধারণা নেই। হয়তো নকশাকার তাদের না রাগিয়ে শহীদ মিনার টিকিয়ে রাখার জন্য বুদ্ধি করে ওপরে গম্বুজ বসিয়ে দিয়েছেন। কাজেই আসল কারণ না জানলে বোঝা যাবে না কী হচ্ছে।’
প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রিন্সিপাল ড. মোহাম্মদ আহাম্মদ উল্লাহ বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি এখানে। আমাদের প্রতিষ্ঠানে দুটি শহীদ মিনার আছে। গম্বুজওয়ালা শহীদ মিনারটি কুড়ি বছর আগের বানানো। মিস্ত্রি কী ভেবে বানিয়েছেন সেটা আমি বলতে পারব না।’
তিনি বলেন, ‘আগামী ৫ মার্চ সচিব মহোদয় আসার কথা আছে। তখন এই শহীদ মিনারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। একই প্রতিষ্ঠানে দুটি শহীদ মিনার থাকারও দরকার নেই।’
/এজে/








