‘তথ্য সমৃদ্ধ ও ছোটদের পড়ার উপযোগী এমন বই খুব বেশি নেই, যেগুলো পড়ে আমাদের পরের প্রজন্ম জানতে পারবে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের জীবন ও বাঙালি জাতির প্রতি তাদের অবদান সম্পর্কে। শুধু ফেসবুকিং করে বা ইন্টারনেট ব্যবহার করে ভালো মানুষ হওয়া যায় না। যারা এ দেশ এনে দিয়েছে, আর যারা এ দেশ বিক্রি করে দিতে চেয়েছিল, তাদের সবার সম্পর্কে না জানলে কী করে এরা জাতির হাল ধরবে?’– আক্ষেপ নিয়ে এসব কথাই বলছিলেন ষাটোর্ধ্ব মোহাম্মদ জুলহাস। তিনি রায়েরবাজার স্মৃতিসৌধে তার ৯ বছর বয়সী নাতনী কায়সা জান্নাত নাজিলাকে নিয়ে এসেছেন। বই পড়ে না হলেও নানার কাছে শুনে বুদ্ধিজীবী দিবসের ইতিহাস সম্পর্কে জেনেছে নাজিলা, বুঝতে পেরেছে বুদ্ধিজীবী দিবস উদযাপনের দিন নয়, বরং শোকের।
আজ ১৪ ডিসেম্বর, ভোর থেকেই রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আসা জনতার ঢল নামে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে জনতার স্রোত। সেই স্রোতে বেশি উপস্থিতি ছিল স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের। তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয় বাংলা ট্রিবিউন প্রতিবেদকের। শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ বুদ্ধিজীবী দিবস কী তা জানলেও রায়েরবাজার বধ্যভূমির সঙ্গে বুদ্ধিজীবী দিবসের সম্পর্ক জানেন না অনেকেই।
রায়েরবাজার বধ্যভূমির সঙ্গে বুদ্ধিজীবী দিবসের সম্পর্ক কী– এমন প্রশ্ন রাখা হয়েছিল সেখানে আসা রাজধানীর নামিদামি কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাছে। তবে মেলেনি উত্তর। কলাবাগান এলাকার একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আসিফ বলেন, স্কুল থেকে এখানে নিয়ে এসেছে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের শ্রদ্ধা জানাতে। কিন্তু এটার সঙ্গে বুদ্ধিজীবীদের কী সম্পর্ক তা জানা নেই। অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারিন নূর বললেন, স্কুল থেকে নির্দেশনা ছিল এখানে আসার। তাই বন্ধুদের সঙ্গে মজা করে এখানে ঘুরতে এসেছি।
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী নয়ন ও তাহসান ফুল হাতে মোহাম্মদপুর এলাকার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে আসে তাদের শিক্ষকদের সঙ্গে। কিন্তু তারা জানে না এই ফুল কেন তারা দিচ্ছে এই স্মৃতিস্তম্ভে। বলতে পারে না কারা বুদ্ধিজীবী, কেন আজ তারা তাদের জন্য ফুল নিয়ে এসেছে। সদুত্তর মেলেনি এমন শিক্ষার্থীদের সংখ্যাই বেশি, যারা স্কুল বা কলেজের নির্দেশনা মানতে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে এসেছে।
কবি নজরুল সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী পার্থ সাহা জানান, তিনি নিজের আগ্রহেই এখানে এসেছেন। এ শিক্ষার্থী বলেন, ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণের আগে বাংলার বুদ্ধিজীবীদের হত্যায় সচেষ্ট হয়। রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর সদস্যরা বুদ্ধিজীবীদের নিষ্ঠুর নির্যাতনের মধ্য দিয়ে হত্যা করে মিরপুর ও রায়েরবাজারে তাদের মরদেহ ফেলে যায়। শহীদ সেই বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তাদের স্মরণে এখানে তৈরি হয় এই স্মৃতিস্তম্ভ।
১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পরিকল্পিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, শিল্পী, লেখক, সাংবাদিকসহ বহু খ্যাতিমান বাঙালিকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নিজেদের পরাজয় নিশ্চিত জেনেই পাকিস্তানি বাহিনী ওই নিধনযজ্ঞ চালায়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীনতার পর যেন বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে, তা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশ খেলাঘর আসরের কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ও নাট্য বিভাগের দায়িত্বে থাকা গোবিন্দ বাগচি মৃন্ময় বলেন, যেহেতু এখন তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে সচেতন হয়েছে এবং আগের থেকে জানার ব্যাপারে আরও বেশি আগ্রহী, মূলত সে কারণেরই তাদের মধ্যে বুদ্ধিজীবী দিবসের উদযাপনটা এত বেশিভাবে দেখা যায়। কেননা, বুদ্ধিজীবী দিবসটি মুক্তিযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তবে আমরা এটা কেন পালন করি এবং এদিন কি হয়েছিল, সেই ব্যাপারটা নিয়ে তরুণ প্রজন্ম এখনও ততটা সচেতন না। বুদ্ধিজীবী দিবস সম্পর্কে যখন তরুণ প্রজন্ম জানবে তখনই তাদের কাছে উদযাপনের পরিবর্তে এটা স্মরণের দিন হবে। কেননা, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস আনন্দের, উদযাপনের। আর ১৪ ডিসেম্বর শোকের, স্মরণের। যারা একটি স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখান গল্পে, কবিতায়, প্রবন্ধে, স্বাধীনতা ঠিক আগে আগে তাদের হত্যা করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধকে আমরা তরুণ প্রজন্মের কাছে যেভাবে সুন্দর করে উপস্থাপন করেছি, ঠিক এরকম গুরুত্ব দিয়ে ১৪ ডিসেম্বর বা বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস তাদের কাছে উপস্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি একাত্তরের অন্যান্য গণহত্যাগুলোর ইতিহাসও আনতে হবে তাদের সামনে। শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমে, বাসায় বাবা-মার সঙ্গে গল্পে, বন্ধুদের আড্ডায়, বিভিন্ন গণমাধ্যমে এগুলো আরও বেশি করে আলোচনায় আনতে হবে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় দলমত নির্বিশেষে বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্কে সঠিক ইতিহাস যখন শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রজন্ম জানতে পারবে, তখনই তাদের স্মরণের উদযাপনটা হবে যথার্থ ও সার্থক।








