নারী হিসেবে আলাদা কিছু না, নারী-পুরুষ সমতাসহ নানা কথাই আমরা বলতে দেখি সহযোদ্ধাদের। কিন্তু কোথায় যেন একটা বাধা কাজ করে। কোথায় যেন নেতা হিসেবে আমার সিদ্ধান্ত অনেক সময়ই মনোপুত হয় না। সেটা না-ই হতে পারে। পুরুষ সহযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে সেটা হয়তো ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে, ভিন্নভাবে রিঅ্যাক্ট করে। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে যেটা ঘটে প্রতিক্রিয়ার জায়গায়, আমি নারী বলে এমন বোকা বোকা কাজ করেছি, এটা প্রতিষ্ঠা করার তাগিদ থেকে। আমি নিশ্চিত আমার সহযোদ্ধারা এটা ইচ্ছে করে করেন না। তাদের মধ্যে এই সমাজ যে পুরুষতান্ত্রিকতা রোপন করেছে সেটাতো চর্চার মধ্য দিয়ে উপড়ে ফেলতে হয়। কয়জন পারেন সেসব।
কথাগুলো বলছিলেন রাজনীতি করা একজন নারী যিনি দলীয় ‘সম্মান’ রক্ষার কারণে নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি। তিনি বলেন, দেখুন আমি নাম প্রকাশ করে কথা বলতে চাই না। কারণ এতে আমার দল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার আমিও রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ার দলে পড়ে যেতে পারি। রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্বও মনে করছেন না তাদের মধ্যে এধরনের সমস্যা আছে। আর নারীকর্মীরা বলছেন, শীর্ষ নারী নেতারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুরুষালি মানসিকতাকেই ধারণ করেন।
সমাজবিশ্লেষক ও রাজনৈতিক নেতারা বলছেন, কেউ স্বীকার করুক বা না-করুক নারী যতক্ষণ মনে করবেন তিনি হেনস্তার শিকার হচ্ছেন, ততক্ষণ আসলেই পরিস্থিতি বদলেছে সেটা দাবি করা যাবে না।
কোনও বিষয়ে নারীর সিদ্ধান্ত পছন্দ না হলে পুরুষকর্মীদের দেখা যায় ‘নারী বলেই এমন’ কথাটি বলতে, তার নেতা পরিচয় প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। কেন এমন হয় জানতে চাইলে উন্নয়নকর্মী গীতা অধিকারী বলেন, পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা এর মূল কারণ, নারী নেতৃত্ব মেনে না নেওয়ার মানসিকতার প্রকাশ। বলা বাহুল্য, নারীদেরকে কোমল রূপে দেখতে তারা পছন্দ করে, কঠিন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় মেনে নিতে পারে না। তাছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোও নারীদের সঠিক মূল্যায়ণ করে না। তারাও দলের ভেতর নারীদের কোটা পূরণের দিকে বেশি মনোযোগী। নেতৃত্বের বিকাশ মূল লক্ষ্য নয়।
আমরা যারা বাইরে থেকে দলগুলোর নেতৃত্বের জায়গাগুলো দেখি, তখন নারীনেত্রী সম্পর্কে কর্মীদের আড়ালে নানা ধরনের নেতিবাচক বক্তব্য বলতে শুনি। কেবল নারী বলেই কি নেতৃত্বকে দেখতে আমরা এখনও অভ্যস্ত না, নাকি সমস্যার জায়গাটা অন্যকিছু প্রশ্নে গণসংহতি আন্দোলনের নেতা ফিরোজ আহমেদ বলেন, ‘আমি নিশ্চিত না। পুরুষতান্ত্রিক মনোজগত তো আছেই, কিন্তু এই সব অতিক্রম করে নারীরা যখন নেতৃত্বে ভূমিকা রেখেছেন, তাদের মেনে নিতে চূড়ান্ত পর্যায়ে কোন সমস্যা দেখি নাই। যেমন নব্বই দশকের পর প্রথম কোন ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন তাসলিমা আখতার। তার, তার নেতৃত্ব নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করতে কাউকে দেখি নাই কখনও। এর আগে আশির দশকে শিরীন আখ্তার এবং মোশরেফা মিশু, তারাও খুব শ্রদ্ধেয় ছিলেন সংগঠনের বাইরেও। মতিয়া চৌধুরী তো কিংবদন্তীর মানুষ ছিলেন। বরং রাজনৈতিক ক্ষেত্র গড় সমাজের চেয়ে হয়তো একটু এগিয়ে আছে। কিন্তু রাজনীতি সমাজের মধ্যেই অবস্থিত বলে সবখানেই নারীদের উপস্থিতি কম দেখি, কারণ তাদের আসবার পথেই প্রবল বাধা আছে।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে নারী কর্মীরা বলছেন, তাদের পুরুষ সহকর্মীদের ভেতর তাচ্ছিল্য কাজ করে, সেবিষয়ে ফিরোজ আহমেদ বলেন, আমি নিশ্চিত যে আমাদের সংগঠনের কেউ এটা বলবে না। কিন্তু এটা দাবি করা মুশকিল যে পুরুষতান্ত্রিক সকল লক্ষণ এখান থেকে বিলুপ্ত হয়েছে, এটা নারী ও পুরুষ উভয়ের মাঝেই আছে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এখনকার সভাপতি নারী, সহসভাপতি নারী, রাজশাহীর সাধারণ সম্পাদক নারী, গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির প্রধান নারী। নারী সংহতির কথা তো বলাই বাহুল্য। ছাত্র সংগঠনে প্রায় সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় প্রায় নিয়মিত নারী নেতৃত্ব থাকেন। তারা নিজের যোগ্যতাতেই আসেন। এবং তাদের দক্ষতা যোগ্যতার পরিচয় বাকিরা যথেষ্টই পেয়েছেন।
বাংলাদেশের ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি লাকী আক্তার মনে করেন না কখনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে নারী হিসেবে তাচ্ছিল্যের স্বীকার হতে হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের সমাজে এমনটাতো ঘটেই, কিন্তু ছাত্র ইউনিয়নে এমন হওয়ার কারণ নেই।
এপিএইচ/








