জাতীয় সংসদে চলমান বাজেট অধিবেশনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে গণবিরোধী এবং বাস্তবায়ন অযোগ্য উল্লেখ করে এর তীব্র সমালোচনা করেছেন বিরোধী দলের কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, বাজেট সাধারণ জনগণের জন্য উন্নয়নের সোপান নাকি নিষ্পেষণের হাতিয়ার হবে, সেই সিদ্ধান্ত জনগণের ওপর ছেড়ে দেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহ এসব কথা বলেন।
বক্তব্যের শুরুতেই হাসনাত আব্দুল্লাহ প্রস্তাবিত বাজেটের রাজস্ব আদায়ের অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিগত অর্থবছরের ১১ মাসের রাজস্ব আদায়ের পরিসংখ্যান টেনে তিনি দেখান যে, বছর শেষে যেখানে বড় জোর ৪ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব অর্জিত হতে পারে, সেখানে আগামী অর্থবছরের জন্য লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। আদর্শ অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১০ থেকে ১২ শতাংশ হওয়া সমীচীন হলেও এখানে প্রায় ৭৪ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এনবিআরের বিদ্যমান সক্ষমতা দিয়ে এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কতটা সম্ভব, তা নিয়ে তিনি গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেন।
দেশের বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের দাবিকে নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, সাড়ে ২৭ শতাংশ কর্পোরেট ট্যাক্স এবং ডিভিডেন্ড ট্যাক্স মিলিয়ে একজন ব্যবসায়ীকে সর্বসাকুল্যে সাড়ে ৫৬ শতাংশ কর দিতে হয়। মালদ্বীপ, সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ার মতো দেশে যেখানে এই করের হার নামমাত্র, সেখানে এত উচ্চ কর দিয়ে কোনও দেশি বা বিদেশি উদ্যোক্তা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আসবেন না।
মূল্যস্ফীতি ও জিডিপির লক্ষ্যমাত্রাকে পরস্পরবিরোধী এবং অবাস্তব আখ্যা দিয়ে এই সংসদ সদস্য বলেন, বর্তমানে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪ শতাংশ এবং খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ১২ শতাংশের ওপরে। সরকার তা সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা বললেও একই সঙ্গে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় ১৬টি পণ্যের ওপর নতুন করে ট্যাক্স বসানোর প্রস্তাব করেছে। একদিকে দ্রব্যমূল্য কমানোর প্রতিশ্রুতি আর অন্যদিকে ট্যাক্স বাড়িয়ে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর বোঝা চাপানো সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
নির্বাচনের আগে দেওয়া পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। গত চার মাসে কয়টি কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়েছে তার স্পষ্ট হিসাব দাবি করেন হাসনাত আব্দুল্লাহ।
আর্থিক খাতের চরম দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে তিনি প্রাচীন ভারতীয় প্রবাদের উদাহরণ দিয়ে বলেন, সরকারি দলের অনেকেই 'ঋণ করে ঘি খাওয়ার' নীতিকে 'ঋণ করে ঋণখেলাপি হওয়ার' সংস্কৃতিতে রূপান্তর করেছেন। বছরের পর বছর ব্যাংকের টাকা লুট করে বিদেশে পাচার করা হলেও তা উদ্ধারে বাজেটে কোনও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেই। নির্বাচনের আগে নামমাত্র কিস্তি দিয়ে আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে ঋণখেলাপিদের পুনরায় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ বন্ধের দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরও কেউ ঋণখেলাপি হলে তার সদস্যপদ বাতিলের জন্য কঠোর আইন প্রণয়নের আহ্বান জানান।
তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শ্বেতপত্রের তথ্য উল্লেখ করে বলেন, বিগত ১৭ বছরে দেশ থেকে ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। অথচ পাচারকারীরা এখনও বুক ফুলিয়ে দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় আত্মগোপনে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী ও অর্থ পাচারকারী চক্রের সদস্যরা বর্তমান সরকার আসার পর কীভাবে বীরদর্পে দেশে ফিরছে, তা নিয়ে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, বিএনপি কোনও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধের রাজনীতি চায় না, বরং বিগত সময়ে ঘটে যাওয়া গুম ও খুনের প্রকৃত বিচার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা দেখতে চায়।
বর্তমান সময়ে একজন প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কথা বলায় সংবাদপত্রের সম্পাদককে জেলে নেওয়ার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি সংসদের স্পিকারের কাছে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদের নিরাপত্তার দাবি জানান। সরকারের সমালোচনা করলে নিজ এলাকার উন্নয়ন বাজেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা দূর করে দেশের প্রগতি ও সমৃদ্ধির স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।









