মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের স্থানে পানির ফোয়ারার প্রস্তাব 

এস এম আব্বাস
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫:২০ আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫:৩৫

রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ এবং পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক স্থানে দুটি ভাস্কর্য নির্মাণের পরিবর্তে পানির ফোয়ারা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। একইসঙ্গে ৭ মার্চের ভাষণের ‘হলোগ্রাফিক থ্রিডি’ উপস্থাপনার বিষয়বস্তুতে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গত ৬ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পের অগ্রগতি প্রতিবেদনে এসব পরিবর্তনের উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়েছে। প্রকল্পটি রিস্কোপিং ও রিপারপসিং করে পরিবর্তনের প্রস্তাব নেওয়া হচ্ছে। তবে সংশোধিত প্রকল্প এখনও চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ‘ঢাকাস্থ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ’ প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায়ের প্রথম সংশোধনীর আওতায় এসব কাজ হচ্ছে। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটির বর্তমান মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত। মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও প্রকল্পটি চলমান প্রকল্প হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছে।

ভাস্কর্যের জায়গায় ফোয়ারা

প্রকল্পের আওতায় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ এবং ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক স্থানে দুটি ভাস্কর্য নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতা হারানোর পর ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ থেমে যায়। ওই দুটি স্থানে ভাঙচুরও চালানো হয়। এরপর ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ভাস্কর্য দুটি নির্মাণ করার উদ্যোগ নেয়। সে সময় প্রকল্পের মূল নকশায় পরিবর্তন এনে ভাস্কর্যের পরিবর্তে ইতিহাসভিত্তিক স্মৃতিফলক তৈরির সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছিল। তবে বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের অগ্রগতি প্রতিবেদনে ওই দুই ঐতিহাসিক স্থানে ওয়াটার ফাউন্টেন স্থাপনের উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে।

প্রকল্পের নথিতে মন্ত্রণালয়ের মতামত তুলে ধরে বলা হয়েছে, প্রকল্পের আওতায় থানা নির্মাণ এবং ৭ মার্চের ভাষণ এবং ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক দুটি স্থানে ভাস্কর্য নির্মাণের পরিবর্তে ওয়াটার ফাউন্টেন স্থাপন করা হবে। এ জন্য নকশা পরিমার্জন প্রয়োজন।

বদল আসছে হলোগ্রাফিক উপস্থাপনাতেও

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের ‘হলোগ্রাফিক থ্রিডি’ উপস্থাপনার বিষয়বস্তুতেও পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তিত প্রকল্প পরিকল্পনায়। প্রকল্পের শুধু দুটি স্থাপনার নকশায় পরিবর্তন নয়, ৭ মার্চের ভাষণের উপস্থাপনাতেও পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রায় ৪০০ কোটি টাকার প্রকল্প

প্রকল্পটির তৃতীয় পর্যায়ের প্রথম সংশোধিত প্রাক্কলিত ব্যয় ৩৯৭ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি ৭৫ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি ৯৪ শতাংশ। প্রকল্পের বড় একটি অংশের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এই পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নকশা ও ব্যবহার পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

একনেকে যাওয়ার আগে পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন

মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের লোকজনের চাপে পড়ে প্রকল্পের ভৌত কাজের এবং কিছু স্থাপনার নকশায় পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে। এগুলো একনেকে উঠুক, তারপর দেখা যাবে, কীভাবে বাস্তবায়ন হয়।’

তিনি বলেন, ‘অতটা সহজ নয়, সব নকশা পরিবর্তন করা যায় না। এটা জাতীয় বিষয়, ইচ্ছে করলেই বাস্তবায়ন করা যায় না।’

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘৭ মার্চের ভাষণ ও পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক স্থান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এ দুটি স্থানের পরিকল্পনা বদলালে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য কতটা অক্ষুণ্ণ থাকবে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।’

ঐতিহাসিক স্থান দুটি কোথায়

৭ মার্চের ভাষণ এবং পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক স্থানটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উত্তর-পশ্চিম কোণায়। ছবির হাটের ফটক দিয়ে ঢুকে কয়েক কদম এগোলেই হাতের বাঁ দিকে স্থানটি পড়ে। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ভাস্কর্য নির্মাণের জন্য নির্ধারিত স্থানটি টিন দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। ভেতরে রয়েছে নির্মাণাধীন কিছু অবকাঠামো। এখন ওই দুটি স্থানে ভাস্কর্যের পরিবর্তে পানির ফোয়ারা স্থাপনের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে প্রকল্পের মূল নকশায় আরেক দফা পরিবর্তন আসবে।

তবে সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদনের আগে প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো কীভাবে এবং কোন নকশায় বাস্তবায়ন করা হবে, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

প্রকল্পে বড় পরিবর্তন

‘ঢাকাস্থ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ’ প্রকল্পটি ২০১৮ সালে নেওয়া হয়। প্রকল্পটির আওতায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ, বিভিন্ন স্থাপনা, ৭ মার্চের ভাষণ ও ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক স্থানে ভাস্কর্যসহ বিভিন্ন কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত।

প্রকল্পটির তৃতীয় পর্যায়ের প্রথম সংশোধিত প্রাক্কলিত ব্যয় ৩৯৭ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি ৭৫ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি ৯৪ শতাংশ। এবার প্রকল্পটির পরিধি ও উদ্দেশ্যে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অগ্রগতি প্রতিবেদনে প্রকল্পটি রিস্কোপিং ও রিপারপসিং করার কথা বলা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ৭ মার্চের ভাষণ ও পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক স্থানে ভাস্কর্য নির্মাণের পরিবর্তে ওয়াটার ফাউন্টেন স্থাপন, সংশ্লিষ্ট নকশা পরিমার্জন এবং ৭ মার্চের ভাষণের ‘হলোগ্রাফিক থ্রিডি’ উপস্থাপনায় পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব পরিবর্তনের কারণে প্রকল্পের আর্থিক ও ভৌত পরিকল্পনাতেও সংশোধন আনতে হবে।

মন্ত্রণালয়ের নথিতে প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধনের উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। তবে সংশোধনের পর মোট প্রাক্কলিত ব্যয় কত হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত অনুমোদন না হওয়া পর্যন্ত তা নিশ্চিত নয়।

প্রকল্প কর্মকর্তার বক্তব্য

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও ঐতিহ্য যেখানে সেখানেই পানির ফোয়ারা হবে; সামনে, পেছনে বা অন্যদিকে করা যেতে পারতো কি না, ওই জায়গাতেই কেন এ ধরনের প্রকল্পের প্রস্তাবনা তৈরি হলো জানতে চাইলে প্রকল্প কর্তমর্তা প্রণব কুমার সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তা। আমি এর সিদ্ধান্ত নিইনি। প্রকল্প কেউ না কেউ মন্ত্রণালয় তৈরি করেছে। আমাকে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমার কাজ হলো কাজটা বাস্তবায়ন করা। এটা হচ্ছে ডেলিগেটেড ওয়ার্ক। পিপিআর অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয় মন্ত্রণালয়, আর কাজ বাস্তবায়ন করে গণপূর্ত অধিদফতর।’

প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘আমি জনপ্রশাসন থেকে ডেপুটেশনে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে আছি। প্রকল্পে যা থাকবে, আমি সেটা বাস্তবায়ন করব। এর বাইরে তো আর আমার কিছু নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘গণপূর্তের কর্মকর্তারা থাকেন, স্থাপত্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা থাকেন—যারা নকশা তৈরি করেন। এগুলো নিয়ে সেখানে আলোচনা হয়, সিদ্ধান্ত হয়। এরপর গণপূর্ত অধিদফতর কাজটা বাস্তবায়ন করে। নতুন করে নকশা হলে স্থাপত্য অধিদফতরই করবে। এটাও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একটা এজেন্সি।’

প্রকল্পের পরিবর্তন এখনও অনুমোদিত হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নকশা হওয়ার পরে পিসি (প্রকল্প প্রস্তাব) হবে। কিন্তু এর আগে এগুলো সবকিছু একনেক কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে। একনেকে এখনও যায়নি। এটা একটা রাষ্ট্রীয় প্রস্তাব।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন কেউ বলতে পারবেন না যে, এটা সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। এগুলো সবকিছু মন্ত্রিসভা হয়ে তারপরে একনেকে গিয়ে সিদ্ধান্ত আসে।’

/আইএএম/
সম্পর্কিত
অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যৌথ অভিযান
একাত্তরের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো অরক্ষিত, দিবস এলেই ধোয়ামোছা
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রান্তিক মানুষেরা কেন মাদকের জালে? 
সর্বশেষ খবর
প্রাথমিক শিক্ষায় প্রযুক্তি ব্যবহারে ইউনিসেফের সহযোগিতার আশ্বাস
প্রাথমিক শিক্ষায় প্রযুক্তি ব্যবহারে ইউনিসেফের সহযোগিতার আশ্বাস
এবার মোহাম্মদপুরে অফিসে হামলা-ভাঙচুর চালিয়ে জায়গা দখলের অভিযোগ
এবার মোহাম্মদপুরে অফিসে হামলা-ভাঙচুর চালিয়ে জায়গা দখলের অভিযোগ
জুলাইয়ের ধাক্কা সামলে আগস্টে যুক্তরাজ্যে পোশাক রফতানি বাড়লো
জুলাইয়ের ধাক্কা সামলে আগস্টে যুক্তরাজ্যে পোশাক রফতানি বাড়লো
মানুষ-হাতির নিরাপদ সহাবস্থানে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হবে: পরিবেশমন্ত্রী
মানুষ-হাতির নিরাপদ সহাবস্থানে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হবে: পরিবেশমন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
অবিবাহিত দিবস: একা আছি, বেশ আছি!
অবিবাহিত দিবস: একা আছি, বেশ আছি!
কমলো স্বর্ণের দাম, ভরি কত
কমলো স্বর্ণের দাম, ভরি কত
পুলিশের নতুন ইউনিট গঠনের ঘোষণা, শাখা থাকবে যেসব এলাকায়
পুলিশের নতুন ইউনিট গঠনের ঘোষণা, শাখা থাকবে যেসব এলাকায়
দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা
দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা
হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে কি এবার চাষ হবে না?
হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে কি এবার চাষ হবে না?