চালু হচ্ছে পাবনা-ঢাকা ট্রেন 

দীর্ঘ চার দশকের স্বপ্নপূরণের পথে পাবনাবাসী

গোলাম মওলা
২২ অক্টোবর ২০২৬, ২০:০৮ আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২৬, ২০:২৯

একের পর এক প্রতিশ্রুতি আর নানা উদ্যোগের পর অবশেষে পাবনা-ঢাকা সরাসরি ট্রেন চালুর অপেক্ষা শেষ হতে যাচ্ছে। আগামী ২০ নভেম্বর এই রেলপথে ট্রেন চলাচলের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের তারিখ ঘোষণা করেছেন পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস। তার ধারাবাহিক প্রচেষ্টা, সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং রেলপথ চালুর জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে তদবিরের পাশাপাশি পাবনার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত দাবির ফলে দীর্ঘদিনের এই প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে।

শিমুল বিশ্বাস তার ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছেন, আগামী ২০ নভেম্বর পাবনা-ঢাকা-পাবনা রেলপথে ট্রেন চলাচলের উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। রেলপথ চালুর প্রক্রিয়ায় সর্বশেষ অগ্রগতি হিসেবে নতুন ট্রেনও দেশে এসে পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম উপস্থিত থাকবেন বলেও স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানানো হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আগামী ২০ বা ২১ নভেম্বর পাবনা-ঢাকা সরাসরি ট্রেন চলাচলের উদ্বোধনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আশা করছি, নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহেই এই রুটে ট্রেন চলাচল উদ্বোধন করা সম্ভব হবে।”

তবে এই অর্জনকে শুধু একজন জনপ্রতিনিধির উদ্যোগের ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দীর্ঘদিন ধরে পাবনাবাসীর আন্দোলন, সামাজিক সংগঠনগুলোর প্রচার, মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন, রাজনৈতিক নেতাদের উদ্যোগ এবং বিভিন্ন পর্যায়ে রেলওয়ে ও সরকারের কাছে দাবি জানানোর মধ্য দিয়ে সরাসরি ট্রেন চালুর বিষয়টি আলোচনায় থেকেছে। এসব উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় এখন বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে বহু প্রতীক্ষিত রেল যোগাযোগ।

ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় শিমুল বিশ্বাস

পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস পাবনা-ঢাকা সরাসরি ট্রেন চালুর দাবিতে সরকারের নীতিনির্ধারক ও রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আসছেন। রেল যোগাযোগ চালুর বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা, তদবির এবং উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

চলতি বছরের জুনে পাবনা সফরে এসে রেলপথ, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম আগস্ট মাসে পাবনা-ঢাকা সরাসরি ট্রেন চালুর ঘোষণা দিয়েছিলেন। তখন মন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ট্রেন পরিচালনার জন্য লোকোমোটিভ প্রস্তুত রয়েছে এবং নতুন কোচ পাওয়া গেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই রুটে ট্রেন চালানো হবে।

এরপর আগস্ট মাসে শিমুল বিশ্বাসও চলতি মাসেই ট্রেন চালুর প্রত্যাশা জানিয়েছিলেন। ৬ আগস্ট নিজ বাসায় নির্বাচনি এলাকার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি বলেন, কয়েক দশকের অপেক্ষা শেষে পাবনা শহর থেকে সরাসরি ঢাকায় ট্রেনে যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হতে যাচ্ছে। ট্রেন চালুর দিন একটি সমাবেশ আয়োজনের কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।

প্রাথমিকভাবে আগস্টে ট্রেন চালুর কথা বলা হলেও বিভিন্ন প্রস্তুতিমূলক কাজের কারণে তা সম্ভব হয়নি। পরে রেলওয়ে ও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে উদ্যোগ অব্যাহত থাকে। সর্বশেষ ২০ নভেম্বর উদ্বোধনের ঘোষণা আসায় পাবনাবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়েছে।

চার দশকের দাবি, একাধিকবার প্রতিশ্রুতি

পাবনা-ঢাকা সরাসরি ট্রেন চালুর দাবি দীর্ঘদিনের। রাজধানীর সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ না থাকায় পাবনার মানুষকে ঢাকায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে মূলত সড়কপথের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে যাতায়াতের সময়, ব্যয় এবং ভোগান্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে।

২০২৩ সালের ১৬ মে পাবনায় এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ওই বছরের সেপ্টেম্বর থেকে পাবনা-ঢাকা ট্রেন চালুর ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই ঘোষণা বাস্তবায়িত হয়নি। পরবর্তী সময়েও রেলপথ চালুর বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায় থেকে আশ্বাস দেওয়া হলেও তা কার্যকর হতে সময় লেগেছে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও পাবনাবাসীর এই দাবি আলোচনায় ছিল। রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সরকারি প্রতিনিধিদল ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিভিন্ন সময়ে সরাসরি রেল যোগাযোগ চালুর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন। তবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ট্রেন চালু না হওয়ায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়।

এ অবস্থায় নতুন করে উদ্যোগী হন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তাদের ধারাবাহিক দাবি ও তৎপরতার মধ্যেই এখন ট্রেন চালুর নতুন তারিখ সামনে এসেছে।

আন্দোলন-সংগঠনের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ

পাবনা-ঢাকা ট্রেন চালুর দাবিতে শেকড় পাবনা ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে জনমত গঠনে কাজ করেছে। সংগঠনটি সাধারণ সভা, মানববন্ধন, গণস্বাক্ষর কর্মসূচি ও সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দাবি জানিয়ে আসছে।

গত বছরের ১৮ অক্টোবর পাবনা প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সরাসরি ট্রেন চালুর দাবি জানিয়েছিল। এর আগে পাবনা শহরের শহীদ চত্বরে আয়োজিত মানববন্ধনে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, পেশাজীবী ও রাজনৈতিক নেতারা অংশ নিয়ে সরাসরি রেল যোগাযোগের দাবি জানান।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, পাবনার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি জেলার রাজধানীর সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ না থাকা উন্নয়ন ও যাতায়াতের ক্ষেত্রে বড় সীমাবদ্ধতা। তারা রেল যোগাযোগের পাশাপাশি সড়ক, ফেরি ও আকাশপথে যোগাযোগের সুযোগ সম্প্রসারণেরও দাবি জানান।

শেকড় পাবনা ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন সংগঠন ট্রেন চালুর সময়সীমা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে। এসব কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং জেলার সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ও অধিকারসংক্রান্ত দাবিতে পরিণত হয়েছে।

যাতায়াতের পাশাপাশি অর্থনীতিতেও সম্ভাবনা

পাবনা-ঢাকা সরাসরি ট্রেন চালু হলে রাজধানীর সঙ্গে জেলার যাতায়াত আরও সহজ হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বর্তমানে ঢাকায় যাতায়াতের জন্য সড়কপথের ওপর নির্ভরতা বেশি। সরাসরি রেলসেবা চালু হলে যাত্রীরা পরিবহনের বিকল্প পাবেন। এতে যাতায়াতের ব্যয় ও সময় সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি বাস ও অন্যান্য পরিবহনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি হলে যাত্রীসেবার মান উন্নয়নের সম্ভাবনাও রয়েছে।

পাবনায় বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা থাকায় রাজধানীর সঙ্গে উন্নত যোগাযোগ ব্যবসায়িক কার্যক্রমে গতি আনতে পারে। কৃষিপণ্য পরিবহন এবং জেলার উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের বাজারসংযোগের ক্ষেত্রেও রেল যোগাযোগের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এসব সুফল পেতে হলে ট্রেনের সময়সূচি, আসনসংখ্যা, ভাড়া এবং নিয়মিত চলাচল নিশ্চিত করা জরুরি।

এবার বাস্তবায়ন চান পাবনাবাসী

পাবনা-ঢাকা ট্রেন চালুর বিষয়ে অতীতে একাধিকবার ঘোষণা এলেও তা বাস্তবায়িত না হওয়ায় এবারও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—নতুন তারিখ যেন আর পিছিয়ে না যায়। দীর্ঘদিনের এই দাবি পূরণ হলে তা জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনবে।

শিমুল বিশ্বাসের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা, সরকারের সংশ্লিষ্ট পর্যায়ের উদ্যোগ এবং পাবনাবাসীর সম্মিলিত দাবি—সব মিলিয়ে এবার ট্রেন চালুর পথ অনেকটাই এগিয়েছে। তবে ঘোষণার পর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে নির্ধারিত সময়ে উদ্বোধন এবং নিয়মিত যাত্রীসেবা চালুর ওপর।

দীর্ঘ চার দশকের প্রত্যাশা পূরণ হতে চলেছে—এমন আশায় এখন পাবনার মানুষ। তাদের প্রত্যাশা, আগামী ২০ নভেম্বরের ঘোষণাটি এবার বাস্তবে রূপ নেবে এবং রাজধানীর সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগের সুবিধা পাবেন জেলার মানুষ।

/আইএএম/এমওএফ/
সম্পর্কিত
২৪ ঘণ্টা পর ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের ঢাকামুখী লাইনে ট্রেন চলাচল শুরু
ট্রেন লাইনচ্যুত: কন্ট্রোল রুমে মেরামত কাজের তথ্য দেওয়া হয়নি, প্রকৌশলী বরখাস্ত
যাত্রাবিরতির দাবিতে নীলফামারীতে ট্রেন আটকে অবরোধ, ৪ ঘণ্টা পর চলাচল স্বাভাবিক
সর্বশেষ খবর
এইচএসসির ফল প্রকাশের তারিখ: ফেল করলে তিন মাসে পরীক্ষার সুযোগ
এইচএসসির ফল প্রকাশের তারিখ: ফেল করলে তিন মাসে পরীক্ষার সুযোগ
বিক্ষোভ ও কারফিউ ঘিরে ফ্রান্স ভ্রমণে ভারতীয় দূতাবাসের সতর্কতা
বিক্ষোভ ও কারফিউ ঘিরে ফ্রান্স ভ্রমণে ভারতীয় দূতাবাসের সতর্কতা
সৌদি আরবে হামলায় ২ বাংলাদেশি আহত, জানা গেলো পরিচয় 
সৌদি আরবে হামলায় ২ বাংলাদেশি আহত, জানা গেলো পরিচয় 
সিরিয়ায় ছাদে স্নাইপার বসিয়ে গুলি চালালো ইসরায়েলি বাহিনী  
সিরিয়ায় ছাদে স্নাইপার বসিয়ে গুলি চালালো ইসরায়েলি বাহিনী  
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকার কাছেই মিলতে পারে গ্যাস, কূপ খননের পরিকল্পনা
ঢাকার কাছেই মিলতে পারে গ্যাস, কূপ খননের পরিকল্পনা
সাত দিন পর কারামুক্ত হলেন ককরোচ নেতা সৌরভ-রাঙ্কা
সাত দিন পর কারামুক্ত হলেন ককরোচ নেতা সৌরভ-রাঙ্কা
এবার ময়ূখের কণ্ঠে উল্টো সুর, প্রশংসায় ভাসালেন বাংলাদেশকে
এবার ময়ূখের কণ্ঠে উল্টো সুর, প্রশংসায় ভাসালেন বাংলাদেশকে
‘একটা স্নাইপারের অভাব ছিল’ মন্তব্যকারী যুবকের বাবাও ডিবি হেফাজতে
‘একটা স্নাইপারের অভাব ছিল’ মন্তব্যকারী যুবকের বাবাও ডিবি হেফাজতে
দল থেকে অব্যাহতি পেয়ে বিএনপি নেত্রী বললেন ‘আমি অত্যন্ত মর্মাহত’
দল থেকে অব্যাহতি পেয়ে বিএনপি নেত্রী বললেন ‘আমি অত্যন্ত মর্মাহত’