সাহিত্য এখন সমাজ বদলের কাজ করে না কিন্তু মন বদলের কাজে সাহিত্যের অবদান অনন্য। ষষ্ঠ লিট ফেস্টের শুরুতে বাংলা ট্রিবিউন আয়োজিত ‘সাহিত্য যখন সবার’ শীর্ষক বিশেষ বৈঠকিতে বক্তারা এ মন্তব্য করেন। তারা বলেন, বাংলাদেশে সম্পর্কে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে লিট ফেস্টের মতো আন্তর্জাতিক সাহিত্য সভার মধ্য দিয়ে সেই মনোভাব ইতিবাচক করে তোলা সম্ভব।
আসন্ন লিট ফেস্টকে সামনে রেখে বাংলা ট্রিবিউন কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেন দেশের লেখক, সাহিত্যিক, কবি, গবেষকসহ শিল্পবোদ্ধা ও আয়োজকরা। তারা লিট ফেস্টের প্রয়োজনীয়তা ও এর কাঠামো বিষয়ে আলোচনা করেন। তারা মনে করেন, হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে এধরনের আন্তর্জাতিক উৎসব কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে।
যতই বলা হোক সাহিত্য সবার, সাহিত্য আসলে বিশেষ ঘরানার কিনা সঞ্চালক মিথিলা ফারজানার এ প্রশ্নে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন, যারা আসছেন বন্ধু পাচ্ছেন; আমাদের সাহিত্য জানছেন, এটা একধরনের উৎসব। আমাদের প্রত্যাশা ধীরে ধীরে এই লিট ফেস্ট সার্বজনীন উৎসব হয়ে উঠবে।
তিনি আরও বলেন, প্রথম দিকে (আসরে) এই লিটফেস্ট খুব বেশি আলোড়ন তুলতে পারেনি। কিন্তু যারা আসছেন তাদের উপস্থিতি দেখলে বোঝা যায়, বিপুল আকর্ষণে মানুষ আসেন। আমরা বুঝতে শুরু করেছি আন্তর্জাতিক মানের সাহিত্য সম্মেলন হচ্ছে এবং সেখানে আমার কতটা অবদান থাকছে কিনা সেটা গুরুত্বপূর্ণ।
আলোচনায় বাংলা ট্রিবিউনের প্রকাশক ও ঢাকা লিট ফেস্টের পরিচালক কাজী আনিস আহমেদ বলেন, সাহিত্য সবার যখন বলছি তখন সবার উদ্যোগ ছাড়া আমরা এটা করতে পারব না। অনুষ্ঠানটি সবার জন্য উন্মুক্ত। আমাদের আশা একসময় দেশ বিদেশের সাহিত্যিকদের এই মেলবন্ধন ভাষার সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে ভিন্ন জায়গায় পৌঁছাবে। তিনি আরও বলেন, আমরা বিদেশি সাহিত্য থেকে নিতে যখন কোনও কার্পন্য করি না তাহলে বিদেশে আমাদের সাহিত্য পৌঁছে দিতে কার্পন্য থাকবে কেন। এই লিট ফেস্টের মধ্য দিয়ে এমন যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে, এবং আরও আদান প্রদানের চেষ্টা হচ্ছে, এসময়ের শ্রেষ্ঠ লেখকদের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে এবং উত্তরোত্তর বড় পরিসরে এটা করা সম্ভব হচ্ছে।
আলোচনায় লিট ফেস্টের পরিচালক সাদাফ সায্ বলেন, প্রতিবারই এটি নতুনভাবে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে পরিপূর্ণ রূপ লাভ করছে। এবারে প্রথমবারের মতো সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী ভিএস নাইপল এই উৎসব উপলক্ষে বাংলাদেশে আসছেন। এর আগে আন্তর্জাতিক নানা পুরস্কারপ্রাপ্ত সাহিত্যিকদের মিলনমেলায় পরস্পরের লেনদেন সম্ভব হয়েছে।
গোলটেবিল বৈঠকে কবি ও অনুবাদক কায়সার হক বলেন, বাংলা একাডেমিতে এই ফেস্ট হওয়া নিয়ে একধরনের প্রতিবাদ হয়েছে। তবে একুশে বইমেলার কথা ভেবে সেটা করা হয়েছিল বলে আমি মনে করি। তিনি আরও বলেন, এটা সীমিত পরিসরে শুরু হয়েছিল। এটা ভীষণ কাঠামোবদ্ধ ছিল। ধীরে ধীরে এটা বিস্তৃত হচ্ছে। কিন্তু সেটা যদি না হয়, তখন কে কাকে ডাকলো বা ডাকলো না সেটা নিয়ে কথা হবে। যে কোনও উপস্থাপনার রিভিউ হয়, লিট ফেস্টেরও রিভিউ হওয়া জরুরি।
মাসুদা ভাট্টি মনে করেন, সাহিত্য একটু দামি কমিউনিটির বিষয় বরাবরই। লোক কবিরা যা লিখতেন সেটাও সবাই নিতে পারতেন না। যারা মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন সেটা তাদেরই গ্রহণের বিষয় ছিল। তিনি বলেন, এই ধরনের লিট ফেস্টে বিদেশ থেকে লেখক আসছেন, তাদের চিন্তা লেখালেখি আমরা জানতে পারছি। আমার মনে হয়, একইভাবে বাংলাদেশ থেকে সাহিত্যিকদের নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে নিয়ে যাওয়া জরুরি।
কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা মনে করেন, সাহিত্য যখন সবার ছিল কিনা এসব তর্ক উঠেছে তখনও সাহিত্য সবার ভেতরে, সবার জন্যই ছিল। তিনি আরও বলেন, লোক কবিরা যে কথা বলেছেন সেটাই সাহিত্য, খনা যা বলেছেন তাই সাহিত্য বিবেচনায় আসে। তারপর একসময় দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। সেটি আবারও কমে এসেছে। সাহিত্যের, বিশেষত কবিতার আগ্রহ কখনও হারাবে না।
তিনি আরও বলেন, লিটফেস্ট ও একুশে বইমেলার গুণগত ও কাঠামোগত পার্থক্য আছে। এর পরিসর বাড়াতে হবে। কিন্তু, তিন দিনে সবটা আয়োজন সম্ভব হয় না। ওয়ার্কশপ হচ্ছে যেটা লেখকদের জন্য সেটা জরুরি এবং এবারও হবে। দ্বিতীয় কথা, হলি আর্টিজানের ঘটনা পরবর্তী পরিস্থিতিতে দেশে যে অস্থির পরিস্থিতি তাতে সাহিত্য করব কিনা। এটা একধরনের মন বদলের কৌশল।
কথাসাহিত্যিক অদিতি ফাল্গুনী বলেন, লিট ফেস্টে অনেক বড় বড় দেশের সাহিত্যিকরা আসছেন, ইংল্যান্ড আমেরিকান সাহিত্যিকদের আমরা দেখতে পাচ্ছি কিন্তু অনেক ছোট দেশে অনেক ভালো কাজ হচ্ছে, সেসব দেশের সাহিত্যিকদের আমরা দেখতে পাচ্ছি না। বিশেষ করে আফগানিস্তান, ভুটান, নেপালের মতো দেশগুলো থেকে সাহিত্যিক আনা উচিত বলে মনে করি, এতে আদান-প্রদান আরও গঠনমূলক হবে।
লিট ফেস্টের প্রয়োজন আছে উল্লেখ করে কথাসাহিত্যিক পাপড়ি রহমান বলেন, বাংলাদেশের সাহিত্যিকদের বিশ্বপরিসরে পরিচিত করিয়ে দেওয়ার জন্য লিট ফেস্টের মতো উৎসবের গুরুত্ব আছে। আমার মনে হয় এসব নিয়ে আমাদের কিছু নিজেদের আগ্রহের জায়গাগুলোকে তুলে ধরার প্রয়োজন আছে এবং আমাদের সাহিত্যকে বিশ্বপরিসরে নিয়ে যাওয়ার একটা প্রক্রিয়া হিসেবেও কাজ করে। তিনি আরও বলেন, অবশেষে সবাইকে খুশি করা যায় না। চেষ্টাতো আছে সেটা স্পষ্ট। বাংলাদেশের মানুষ কীভাবে গ্রহণ করবেন সেটা নিয়ে অনেক আলাপ আলোচনা আগে খাবারটা সামনে থাকতে হবে। সেটা থাকলে আমি পছন্দ অনুযায়ী গ্রহণ করতে পারি।
বেশিরভাগ বাংলাভাষা পাঠকদের জন্য এই ফেস্ট কিনা মিথিলা ফারজানার এ প্রশ্নের জবাবে লিটফেস্টের পরিচালক সাদাফ সায বলেন, আমরা আন্তর্জাতিক সাহিত্য জগতকে বাংলাদেশে নিয়ে আসার পাশাপাশি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সাহিত্য অঙ্গনে নিয়ে যাওয়ার কাজ করতে চাই। কিন্তু এটাকে আন্তর্জাতিক করে তুলতে চেয়েছি বলে কেবল পশ্চিমা সাহিত্য নিয়েই আমরা ভাবিনি। শুরুতে অনেক বিতর্ক হয়েছে এবং এগুলোর খুবই দরকার ছিল বলে আমরা বিশ্বাস করি। কারণ, স্বপ্ন ছিল, নিজেদের বাংলা চর্চা হবে, সেটি অনুবাদ হবে এবং সেটা বাইরে যাবে এবং বাইরেরটা এখানে আসবে। আমরা এগুলোর মধ্য দিয়ে সবার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠতে পেরেছি।
/ইউআই/টিএন/
আরও পড়ুন: জিয়ার নির্দেশে দীপন-নিলয়কে হত্যা করে এবিটির খায়রুল: ডিবি







