যেভাবে বাধা পেরিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রা বিশ্ব সংস্কৃতির অংশ

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ২২:১৫, ডিসেম্বর ০১, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:৩৭, ডিসেম্বর ০১, ২০১৬

ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে বাংলাদেশে বাংলা বর্ষবরণের অন‌্যতম অনুষঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা। বুধবার ইউনেস্কোর অফিসিয়াল টুইটার অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

তবে ইউনেস্কোর এই বিশ্ব সাংস্কৃতিক তালিকায় স্থান পাওয়ার বিষয়টি মোটেও সহজ ছিল না। অনেক বাধা পেরিয়ে,অনেক জটিল প্রক্রিয়া অতিক্রম করে,সময় মতো আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এবং সবশেষে অনেক বিতর্ক পেরিয়েই এ অর্জন এসেছে বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি অনেক বেশি টেকনিক্যাল,বিশেষজ্ঞ জ্ঞান না থাকলে এখানে কাজ হয় না। বাংলাদেশ থেকেই আরও অনেক প্রতিষ্ঠান এখানে আবেদন করেছে কিন্তু সেগুলো গৃহীত হয়নি। অনেক ধাপ পার হয়েই আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা বিশ্ব ঐতিহ্যে স্থান পেয়েছে।’

ইউনেস্কোর ঘোষণায় বলা হয়েছে, প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে বাংলা নতুন বছরকে বরণ করে নেয়। ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় বুধবার বিশ্বের সাংস্কৃতিক ঐতিহ‌্য রক্ষায় আন্তঃদেশীয় কমিটির একাদশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ বৈঠকে অনুষ্ঠিত বিতর্কে ‘রিপ্রেজেন্টেটিভ লিস্ট অব ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ অফ হিউম্যানিটি’র তালিকায় বাংলাদেশের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ইতোপূর্বে ইউনেস্কোর ‘ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ’-এর তালিকায় বাংলাদেশের কারুশিল্প জামদানি এবং বাউল গানও স্থান পায়। এছাড়াও ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় বাগেরহাটের ‘ঐতিহাসিক মসজিদের শহর’, পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ এবং বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের নাম রয়েছে।

এবারের প্রস্তাবও বাংলা একাডেমি থেকে করা হয়েছে জানিয়ে শামসুজ্জামান খান বলেন,‘মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল সূচনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের মাধ্যমে হয় বলে এখন আদ্দিস আবাবায় চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নেসার হোসেন  গিয়েছেন। বাংলাদেশ থেকে অনেক প্রতিষ্ঠানই সেখানে প্রস্তাবনা পাঠায়।’ এবারও পাঠিয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তবে তথ্য সঠিক না থাকায় বিষয়টি ইউনেস্কোর তালিকায় গৃহীত হয়নি। বিশ্ব সাংস্কৃতিক তালিকায় স্থান পেতে অনেক গবেষণা দরকার হয় যেগুলো দুই বছর আগে ওদের কাছে পাঠাতে হয়। এই দুই বছর ইউনেস্কোর যেসব বিশেষজ্ঞরা রয়েছেন তারা সেগুলো যাচাই বাছাই করে নির্ধারণ করেন। বিষয়টি অনেক কঠিন।’

তবে ওদের কাছে পাঠানোর আগে এ নিয়ে চারুকলা অনুষদ,সংস্কৃতি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বাংলা একাডেমি গবেষণা করে জানিয়ে শামসুজ্জামান খান বলেন, ‘আমাদের এ অর্জন সকল অন্ধকারের বিরুদ্ধে।’ চারুকলা অনুষদের প্রাচ্যকলা বিভাগের চেয়ারম্যান মলয় বালা বলেন , ‘ইউনেস্কোর এই ঘোষণা আমাদের জন্য অনেক আনন্দের এবং গর্বের। এই আনন্দ এবং গর্ব আমাদেরকে দেশকে ভালোবাসতে অনুপ্রাণিত করবে। আর এটি আমাদের বিশাল আনন্দ ও পরম পাওয়া।’

অপরদিকে, ইউনেস্কোর এ ঘোষণা বাঙালী সংস্কৃতির আরেকটি মাইলফলক উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘বৈশাখী উৎসব বাঙালীর হাজার বছরের শাশ্বত উৎসব। হাজার বছর ধরে এ উৎসব পালিত হয়ে আসছে। এটা মানুষের অসাম্প্রদায়িক এক উৎসব। মঙ্গল শোভাযাত্রায় বাংলাদেশিসহ বিশ্ববাসীর মঙ্গল কামনা করা হয়। সামরিক শাসন,স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধেও এখানে কথা বলা হয় বিভিন্ন প্রতীকের মাধ্যমে। মঙ্গল শোভাযাত্রার  তাৎপর্য অনেক গভীরে। এটা যেমন আমাদের সংস্কৃতির শাশ্বত রূপ তেমনি মানুষের স্বাধীনতা ও স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করারও একটি পথ।’

মঙ্গল শোভাযাত্রাকে স্বাধীনতাবিরোধীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে হাতিয়ার উল্লেখ করে আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধীদের দৌরাত্ম্য যখন ছিল তখন তাদের বিরুদ্ধে দেশে সচেতনতা সৃষ্টি করেছিল এই শোভাযাত্রা। গোলাম আযমসহ যুদ্ধাপরাধীদের প্রতিকৃতি শোভাযাত্রায় রেখে তাদের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করা হয়েছিল এই শোভাযাত্রা থেকেই। সেখান থেকেই বোঝানো হয়েছিল স্বাধীনতাবিরোধীদের বিচার চায় দেশবাসী। এই শোভাযাত্রাকে যেভাবে আমরা ধারণ করেছি ঠিক তেমনি  জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা ইউনেস্কো সেটাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। আমি মনে করি, যে স্বীকৃতি ইউনেস্কো দিল সেটা বাঙালি সংস্কৃতির আরেকটি  মাইলস্টোন।’

এর আগে বাংলা একাডেমি ২০১৩ সালে জামদানি শাড়ি নিয়ে প্রস্তাব দেয় এবং সেটি গৃহীত হয়। তারও আগে ২০০৮ সালে বাউল গান বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হয়। কিন্তু বাউল গানের বিষয়ে বাংলাদেশ থেকে কাউকে প্রস্তাব পাঠাতে হয়নি। লালন ফকিরের বিশ্বব্যাপী  সুনামের সুবাদে উৎসাহিত হয়ে  ইউনেস্কো স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এই ঘোষণা দিয়েছিল। একই সঙ্গে বাংলা  একাডেমি রিকশা পেইন্টকেও বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় রাখার আবেদন করেছে জানিয়ে শামসুজ্জামান খান বলেন,‘আমরা বিজয় দিবস,বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণসহ আরও দশটি বিষয়ের ফাইল প্রস্তুত করে রেখেছি। সেগুলো খুবই আকর্ষণীয়। আমরা একটার পর একটা ফাইল ইউনেস্কোতে  পাঠাব। আমাদের আশা, প্রতিটি বিষয়ই ইউনেস্কো গ্রহণ করবে।’

 

/এএআর/আপ-এমডিপি/

 

 

লাইভ

টপ