২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত লিবিয়ার শরণার্থী নৌকায় ভেসে যারা ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করেছেন, তাদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশিরাও। ওই বছরের প্রথম তিন মাসে মাত্র একজন বাংলাদেশি ইতালিতে প্রবেশ করলেও ২০১৭ সালে একই সময়ে এই সংখ্যা ২ হাজার ৮০০ জনে পৌঁছেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট বলছে, বিভিন্ন দেশের নাগরিকের সংখ্যার বিচারে, বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ প্রবেশের চেষ্টাকারীর সংখ্যা সর্বোচ্চ।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, ইতালিতে পৌঁছানো রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের ভৌগলিক অবস্থানের পরিবর্তন ঘটছে। কিছুদিন আগ পর্যন্ত সাব-সাহার অঞ্চলের শরণার্থীদের সংখ্যা ছিল বেশি।
আইওএম-র ফ্লাভিও ডি জিয়াকোমো বলেন, ‘সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো অভিবাসীদের জাতীয়তা এবং বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষের সংখ্যা। গত বছর মার্ট মাসের শেষ পর্যন্ত মাত্র একজন বাংলাদেশি ইতালিতে পৌঁছান। কিন্তু একই সময়ে এই বছর ইতালিতে পৌঁছা বাংলাদেশিদের সংখ্যা ২ হাজার ৮৩১ জন।’
ইন্ডিপেন্ডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূমধ্যসাগরে উদ্ধার হওয়া শরণার্থীরা উদ্ধারকর্মীদের জানিয়েছেন, ঢাকা থেকে লিবিয়া বা তুরস্ক পৌঁছানোর একজনকে দশ হাজার ডলারের বেশি অর্থ দিতে হয়। সিসিলি ও আপুলিয়াতে পৌঁছাতে পেরেছেন এমন কয়েকজন বাংলাদেশি অভিবাসী জানিয়েছেন, একটি ‘এজেন্সি’ তাদের লিবিয়া পৌঁছার ব্যবস্থা করে দেয়। কাজের ভিসার (ওয়ার্কিং ভিসা) জন্য এজেন্সিকে ৩ থেকে ৪ হাজার ডলার দিতে হয়।
আইওএম এর এক মুখপাত্র বলেন, “বাংলাদেশ থেকে প্রথমে অভিবাসীদের দুবাই ও তুরস্কে নেওয়া হয়। এরপর বিমানে করে তারা লিবিয়া পৌঁছান। বিমানবন্দরে এক ‘কর্মকর্তা’ তাদের সঙ্গে দেখা করেন এবং কাগজপত্র নিয়ে যান।”
অনেক বাংলাদেশি দীর্ঘদিন লিবিয়াতে বাস করার পর ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়েছেন। অনেকেই আছেন কিছুদিন আগে সেখানে পৌঁছেছেন। তারা সরাসরি ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করছেন।
আইওএম-র সংগৃহীত তথ্য অনুসারে, একজন বাংলাদেশি অভিবাসীকে লিবিয়া পৌঁছানোর ১০ হাজার ডলার এবং ইউরোপে যেতে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার জন্য নৌকা খরচ দিতে হয় ৭০০ ডলার।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডাব্লিউ) লিবিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক হানান সালেহ জানান, ২০১১ সালে গৃহযুদ্ধ শুরুর আগ পর্যন্ত বাংলাদেশি অভিবাসীদের গন্তব্যস্থল ছিল লিবিয়া। বর্তমান পরিস্থিতিতে তার জানা মতে দুবাই থেকে ত্রিপোলিতে সরাসরি কোনও ফ্লাইট নেই। তিনি বলেন, “বেশির ভাগ বিদেশি তিউনিস (প্রতিবেশী দেশ তিউনিসিয়ার রাজধানী) হয়ে ত্রিপোলির মিটিগা বিমানবন্দরে আসেন। কিছু ক্ষেত্রে আমরা জেনেছি যে, বিদেশি নাগরিকদের ‘স্লিপ’ দেওয়া হয়। যাতে করে বিদেশিদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করা যায়।”
ব্রিটিশ নেতৃত্বে মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে অপসারণে সামরিক অভিযানের পর দেশটিতে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। ইসলামিক স্টেট (আইএস) ও একাধিক সশস্ত্র গ্রুপ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। এই ফাঁকে আইনের চরম অবনতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিশাল অংকের অর্থ আয় করছে মানবপাচারকারীরা।
এইচআরডাব্লিউ-এর উপসাগরীয় গবেষক নিকোলাস ম্যাকগিহান জানান, ঢাকা-দুবাই রুটটিতে অসাধু জনশক্তি রফতানিকারকদের দৌরাত্ম চলছে। এজেন্টরা দৈন্যদশা ও দারিদ্র থেকে মুক্তির আশা মানুষের কাছে বিক্রি করে। সাধারণত তরুণরাই যায়। অনেকেই নিজের ইচ্ছায় অথবা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে যায়। তাদের কাছে একটি স্বপ্ন বিক্রি করা হয়। অনেক সময় তাদের সেই স্বপ্ন ভঙ্গ হয়। তা কখনও হয় উপসাগরীয় কোনও দেশ কিংবা তার চেয়ে খারাপ দেশ লিবিয়া।
এই গবেষক মনে করেন, অজ্ঞতা ও প্রতারণায় পড়া অভিবাসীদের ধারণা দেওয়া তারা যত বেশি অর্থ দেবে তত নিরাপদ থাকবে। এতে করে তাদেরকে ঋণের ভারে জর্জরিত করা হয় এবং চাঁদা দিতে বাধ্য করা হয়। ম্যাকগিহান বলেন, ‘দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর সরকার রেমিটেন্সের আশায় এসব প্রতারণা বন্ধে কোনও উদ্যোগ নেওয়া থেকে বিরত থাকে। এই কাজে দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ জড়িত।’
ইন্ডিপেন্ডেন্টের প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, উত্তর আফ্রিকা ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে বাংলাদেশি কম ও অদক্ষ শ্রমিকরা ধনী দেশের শ্রমিকদের তুলনায় খুব কম মজুরি ও খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে। চাথাম হাউসের এশিয়া প্রোগ্রামের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. গ্যারেথ প্রাইস জানান, বাংলাদেশিদের বিদেশ পাড়ি দেওয়ার প্রধান কারণ দারিদ্র্যতা। তবে মিয়ানমার থেকে পালানো রোহিঙ্গা মুসলিমরাও বাংলাদেশ থেকে বিদেশ পাড়ি দিচ্ছেন।
উল্লেখ্য, ইউরোপ প্রবেশে লিবিয়া হয়ে নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া শরণার্থী ও অভিবাসীদের জন্য সহজ রুটে পরিণত হয়েছে। তবে এই বিপদসঙ্কুল পথে পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতি বছর মৃত্যু হচ্ছে কয়েক হাজার মানুষের। আইওএম জানিয়েছে, চলতি বছর ৪২ হাজার ৯৭৪ জন মানুষ সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ প্রবেশ করেছেন। আর নৌকাডুবিতে প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৮৯ জন। গত বছর সাগর পাড়ি দিতে মৃত্যু হয়েছিল ৫ হাজার ৯৮ জনের। সূত্র: দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট।
/এএ/







