কত রোহিঙ্গা শিশু মা-বাবা হারিয়েছে?

জাকিয়া আহমেদ ও আমানুর রহমান রনি
২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১০:২৪আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১০:২৪

রোহিঙ্গা শিশু (ছবি: আমানুর রহমান রনি) ১৩ বছরের জাকারিয়া প্রাণ বাঁচাতে প্রতিবেশীদের সঙ্গে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। তার মা-বাবা কেউ বেঁচে নেই। তার এক বোন আছে। তবে সে এখন কোথায়, তা জানে না জাকারিয়া। সে জানায়,সেনাবাহিনী তার গ্রামের সব পুরুষকে ধরে নিয়ে গেছে। এরপরে বাড়িঘরে আগুন দিয়েছে। তার বাবাকেও গ্রামের অন্য পুরুষদের সঙ্গে ধরে নিয়ে যায় সেনারা। আর যখন ঘরে আগুন দেওয়া হয় তখন তার মা ঘরেই ছিলেন।

মংডুর সরোয়ার দিঘি এলাকায় জাকারিয়াদের বাড়ি। ঠিক কতদিন আগে তাদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়েছিল,তা সে বলতে পারে না। তবে কোনও এক শুক্রবারে আগুন দেওয়া হয়–কেবল এটাই মনে আছে তার।

সাত বছরের আরেক রোহিঙ্গা শিশু মালেক হোসেন। তার আট বছর বয়সী এক বোন আছে। তার নাম আসমত আরা। দাদি ফিরোজা বেগমের সঙ্গে তারা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। দুই ভাইবোন ও দাদি ছাড়া আর কেউ বেঁচে নেই। শিশুটি বাংলা ট্রিবিউনকে বলে,‘বাড়িঘরে আগুন দিয়েছে মিলিটারি। পুড়িয়ে দিয়েছে সব। বাবা-মা মারা গেছে। তাই পালিয়ে এসেছি।’

আট বছরের জান্নাত আরাও বাবা-মা ছাড়া বাংলাদেশে এসেছে। তার বাড়ি ছিল মংডুর নয়াপাড়া এলাকায়। তার এক বড় বোন আছে। তবে পরিবারের কেউ বেঁচে আছে কিনা,সে জানে না। বর্তমানে সে তার খালা রশিদা বেগমের সঙ্গে আছে। জান্নাত বাংলা ট্রিবিউনকে বলে, ‘মিলিটারিরা বাড়িতে আগুন দেওয়ার পর সবাইকে গুলি করে মেরে ফেলেছে।’  

জাকারিয়া,মালেক বা জান্নাত-ই নয়,মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গত ২৪ আগস্ট দেশটির সেনাবাহিনী দমন-পীড়ন ও গণহত্যা শুরু করলে প্রাণ বাঁচাতে চার লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। তাদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক শিশু রয়েছে। গত তিনদিনে নিবন্ধিত হয়েছে অন্তত এক হাজার ৮০২টি শিশু। তাদের বাবা-মা নেই। এসব শিশুকে একত্রিত করার চেষ্টা করছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়।

রোহিঙ্গা শিশু (ফাইল ছবি) কক্সবাজার জেলার সমাজসেবা কর্মকর্তা ও ‘মিয়ানমার ন্যাশনাল অরফান চাইল্ড’ প্রজেক্টের সুপারভাইজার  এমরান খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘মিয়ানমার থেকে যেসব শিশু মা-বাবা হারিয়ে এসেছে,তাদের নিয়ে কাজ করছি। প্রথমে কর্মসূচিতে রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহার করা হলেও এখন তা বাদ দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আমাদের। তাই এ প্রজেক্টের নাম রাখা হয়েছে মিয়ানমার ন্যাশনাল অরফান চাইল্ড।’

শিশু আইন অনুযায়ী, ১৮ বছর পর্যন্ত বয়সী শিশুদের কাউন্ট করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

কিভাবে এ কর্মসূচি পরিচালনা করছেন জানতে চাইলে এমরান খান বলেন, ‘প্রথমে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি সেসব শিশুকে, যারা মা-বাবা দুজনকেই হারিয়েছে। এরপরে রয়েছে যেসব শিশু বাবা হারিয়েছে তারা। সার্ভে করে তালিকা হওয়ার পর তাদের স্মার্ট কার্ড দেওয়া হবে। যাতে তারা প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধাগুলো পেতে পারে। এর আলোকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, বাসস্থান, মনো-সামাজিক সুরক্ষাসহ সবকিছুই আমরা তাদের দেওয়ার চেষ্টা করবো। আমরা তাদের জন্য টেকনাফ ও উখিয়ায় সরকারের কাছে ২০০ একর জমিও চেয়েছি। সব কাজ শেষ হওয়ার পর তাদের নিয়ে পরিকল্পনা করা হবে।’

মা-বাবা হারানো শিশুদের এক জায়গায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে জানিয়ে এ কর্মকর্তা বলেন, ‘এসব শিশুর মধ্যে  বয়ঃসন্ধিকালীন মেয়েদের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এরাই সবচেয়ে বেশি ভালনারেবল।’

তিনি আরও বলেন, ’১২-১৮ বছরের মেয়েদের এক জায়গায় রাখা হবে এবং বাকিদের এভাবে গ্রেডিং করা হবে। রয়েছে প্রতিবন্ধী শিশুও,তাদেরও পৃথক রাখা হবে।’ ফরমাল এডুকেশনের মধ্যে শিশুদের নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

এক রোহিঙ্গা শিশুর কোলে তার ৫ দিন বয়সী ভাই (ফাইল ছবি: সংগৃহীত) নিবন্ধিত এক হাজার ৮০২টি শিশুর মধ্যে কতটি মেয়ে আছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখনও আমাদের এই তালিকাটিকে সর্টিং করা হয়নি,আগামীকাল সে বিষয়ে তথ্য দেওয়া যেতে পারে।’

২৩ সেপ্টেম্বর থেকে মা-বাবা হারানো শিশুদের নিয়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় কাজ করছে জানিয়ে এমরান খান বলেন,‘আজও মিয়ানমার থেকে মানুষ এসেছে। এভাবে শেষ শিশুটি না আসা পর্যন্ত সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এ প্রকল্প চলবে।’

এই মুহূর্তে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রয়েছেন মানবাধিকারকর্মী এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া শিশুদের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় নথিভুক্ত করছে।’ ৩০ আগস্ট থেকে নূর খান সেখানে আছেন।

১০ বছর বয়সী একটি শিশুর সঙ্গে কথা হয়েছে জানিয়ে নূর খান বলেন,ওরা দুই-তিনদিন পাহাড়ে পাহাড়ে হেঁটে সাগরের পাড়ে আসে। তখন রাত ছিল। সেখানে তিনটি নৌকা বাঁধা ছিল কিন্তু মানুষ ছিল অসংখ্য। এরপর যখন তারা নৌকায় ওঠে তখন সে দেখে বাবা-মা তার সঙ্গে নেই। অন্ধকারে সে বুঝতেই পারেনি,তার বাবা-মা সঙ্গে নেই। এপারে এসে শিশুটি আর তার বাবা-মাকে খুঁজে পায়নি। গ্রামের কয়েকজনকে পেয়েছে,তাদের সঙ্গেই সে থাকছে। এই মানুষগুলোকে না দেখলে ‘অমানবিকতা দেখা হবে না’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

 আরও পড়ুন:
পর্যটন স্পটগুলোর গল্প বলবেন কারা?
মন্ত্রীর নেওয়া সাইকেল ফেরত পেলেন না শামস!
রোহিঙ্গা পুনর্বাসনে প্রস্তুতি চলছে ভাসানচরে

 

/জেএ/এআরআর/এএম/এসটি/আপ-এসএনএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ বলার কথা স্বীকার ট্রাম্পের
নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ বলার কথা স্বীকার ট্রাম্পের
সোনাক্ষির সুস্থতায় কাজে লাগছে হোমিওপ্যাথি, বিতর্কে নেটিজেনরা
সোনাক্ষির সুস্থতায় কাজে লাগছে হোমিওপ্যাথি, বিতর্কে নেটিজেনরা
নিজের বিড়ালকে আলিঙ্গন করার দিন আজ
নিজের বিড়ালকে আলিঙ্গন করার দিন আজ
স্পেনের ৭২ বছরের পেনাল্টি আধিপত্যের ইতি যেভাবে
স্পেনের ৭২ বছরের পেনাল্টি আধিপত্যের ইতি যেভাবে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের