গ্রুপ স্টাডিতে জঙ্গিবাদে প্ররোচিত করা হয় প্রকৌশলী অলিকে

আমানুর রহমান রনি
১০ অক্টোবর ২০১৭, ১২:১৫আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০১৭, ২১:৩৮

অলিউজ্জামান অলি মেসে গ্রুপ স্টাডি করার সময় নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গিগোষ্ঠী জেএমবিতে জড়াতে প্ররোচিত করা হয় বুয়েট থেকে পাস করা প্রকৌশলী মো. ওয়ালী জামান অলি ওরফে অলিউজ্জামান অলিকে (২৮)। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সে একথা জানিয়েছে। জেএমবির সারোয়ার-তামিম গ্রুপের ইম্প্রোভাইজ এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) তৈরি বিভাগের প্রধান মুশফিকুর রহমান জেনি যে গ্রুপের নেতৃত্ব দিতো, সেই গ্রুপের সদস্যদের সঙ্গে একই বাসায় ভাড়া ছিল অলি।

জবানবন্দিতে যা বলেছে অলি: অলির গ্রামের বাড়ি দিনাজপুরের পার্বতীপুর। বর্তমানে থাকেন রাজধানীর পূর্ব কাফরুলের ইটখোলা বাজার এলাকায়। চলতি বছরের ৮ এপ্রিল ঢাকা মহানগর মুখ্য হাকিম নূরুন্নাহার ইয়াসমিনের আদালতে জবানবন্দি দেয় সে।

জবানবন্দিতে সে বলে, ‘বুয়েটে আমি ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হই। ভর্তি হওয়ার পর হলে থাকা শুরু করি। বাসায় থাকলে পড়াশোনা হতো না, হলে গ্রুপ স্টাডি করতাম। হলে ওঠার পরপরই তাবলীগের বড় ভাইয়েরা দাওয়াত দিতে শুরু করেন। বুয়েটে হাফ ইয়ার পার হওয়ার পর প্রথম কায়উমের সঙ্গে তাবলীগে যাই। পুরান ঢাকা বাহাদুর শাহ জামে মসজিদে আমরা তাবলীগে যাই। জীবনে প্রথম তিন দিন তাবলীগে ছিলাম। তখন ইসলামের অনেক বেসিক জিনিস শিখেছি। এভাবেই তাবলীগের সঙ্গে আমার সখ্যতা গড়ে ওঠে। বছরে বেশ কয়েকবার তিন দিন করে চিল্লায় যাই। এরপর সিলেটের শ্রীমঙ্গলে ৪০ দিনের চিল্লায় যাই। পরে থার্ড ইয়ার থাকাকালীন তাবলীগের সাথী হয়ে যাই। এরপর থেকেই আমি নিয়মিত নামাজ পড়তাম, তালিম, জিম্মাদারি সবকিছু নিয়মমাফিক করতাম।’

সে আরও বলে, ‘বুয়েটে চতুর্থ বর্ষে পড়ার সময় কাকরাইল মসজিদে ফেরদৌসের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়। সে ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএসসিতে পড়তো। এরপর প্রায়ই আমার সঙ্গে ফেরদৌসের কাকরাইল মসজিদে দেখা হতো। একসঙ্গে নামাজ পড়তাম। ফেরদৌসের মাধ্যমেই আমার সঙ্গে আনোয়ারের পরিচয় হয়। আনোয়ার বুয়েটে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়তো। আনোয়ার ও ফেরদৌস স্কুল ফ্রেন্ড ছিল। আনোয়ারের সঙ্গে প্রায়ই বুয়েট ক্যাম্পাসে এবং ফেরদৌসের সঙ্গে কাকরাইল মসজিদে আমার দেখা হতো। চতুর্থ বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ করে আমি তিন চিল্লা (১২০ দিন) দেওয়ার জন্য বের হই। প্রথমে যাই সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ। আমি জামাতের আমির ছিলাম। পরে মেহেরপুরের গাংনিতে যাই। এরপর শুরু হয় চাকরি খোঁজার পালা। প্রথমে কলকাতার প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার হিসেবে জয়েন করি। সেখানে দুই মাস কাজ করার পর ২০১১ সালের ১৬ অক্টোবর আমি মোবাইল ফোন কোম্পানি রবিতে জয়েন করি। এর সঙ্গে আমার তাবলীগের কাজও চলতে থাকে।’

রবিতে কাজ করার সময়ই ২০১৩ সালের ৩ ডিসেম্বর এক সহকর্মীকে বিয়ে করে অলি। ২০১৪ সালের ২৭ অক্টোবর তার প্রথম সন্তান হয়।

জবানবন্দিতে অলি বলে, ‘২০১৬ সালের শুরুর দিকে ফেরদৌস হঠাৎ একদিন আমার গুলশানের অফিসে আসে। বুয়েটের চতুর্থ বর্ষের পর ওর সঙ্গে আমার আর যোগাযোগ ছিল না। সে তার মোবাইল ফোন নম্বর আমাকে দেয় এবং তার জন্য চাকরি খুঁজতে বলে। এছাড়াও বিশ্বের পরিস্থিতি নিয়ে সে আমাকে চিন্তা করতে বলে। সে আমাকে তার একটি স্বপ্নের কথা বলে। ওই স্বপ্নের ব্যাখা দিয়ে ফেরদৌস বলে সিরিয়া বা ইরাকের দিকে হিজরত করতে হবে। সর্বশেষ ফেরদৌস আমাকে ইউটিউব থেকে আয়মান আল জাওয়াহিরির লেকচার শুনতে বলে। একদিন গুলশানে আনোয়ারের সঙ্গে আমার দেখা হয়। সে আমাকে বলে, আমি বিসিএস ও ব্যাংকের জবের জন্য ট্রাই করছি। চল, আমরা একসঙ্গে বাসা নিয়ে গ্রুপ স্টাডি করি। আমি আনোয়ারকে বলি, গুলশানের আশেপাশে বাসা নিলে আমাকে বলিস। আনোয়ার গুলশানের লেকের পাশে বাড্ডায় একটি দুই রুমে বাসা ভাড়া করে। ২০১৬ সালের শুরুর দিকে আমি আনোয়ারের সঙ্গে বাড্ডার বাসায় উঠি। আমরা একসঙ্গে এমবিএর স্টাডি শুরু করি। পরে মার্চ/এপ্রিলের দিকে ফেরদৌসও আমাদের সঙ্গে বাড্ডার বাসায় থাকা শুরু করে। ফেরদৌস আমাকে খিলাফাহ ও আইএস সম্পর্কে সরাসরি বলা শুরু করে। ও আমাকে বিভিন্নভাবে দাওয়াত দিতে থাকে।’

জবানবন্দিতে অলি বলে, ‘শুক্র-শনিবার আমি আব্বু-আম্মুর সঙ্গে মিরপুর থাকতাম। ওখানকার মসজিদের ইমাম মো. আব্দুল হকের কাছে ফেরদৌসের বিষয়গুলো নিয়ে জানতে চাইতাম। উনি আমাকে বলতেন, কোরআন, আল-হাদিস বুঝতে হবে শানে নজুল বা ব্যাখ্যার আলোকে। শুধু অর্থ দেখেই ব্যাখ্যা করলে চলবে না। উনি আমাকে তাবলীগের সঙ্গে লেগে থাকতে বলতেন।’ অলি বলে, ‘আমি কখনোই উগ্রবাদী কোনও সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। আমাকে পুলিশ আমার কর্মস্থল গুলশানের রবির অফিস থেকে গ্রেফতার করে। আমার কাছ থেকে পুলিশ কোনও কিছুই জব্দ করেনি। আমাকেসহ পুলিশ আমার বাড্ডার বাসায় যায়, তখন আনোয়ার ও ফেরদৌসকে গ্রেফতার করে।’      

গত ২০ মার্চ রাজধানীর বাড্ডা এলাকা থেকে প্রকৌশলী অলি ও আনোয়ারুল আলমসহ ৫ জনকে গ্রেফতার করে র‍্যাব। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর দোহার ও মিরপুর থেকে আরও ১০ দশ জনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার হওয়া এই গ্রুপের ১৬ সদস্যের নেতৃত্বে ছিল জেএমবির সারোয়ার তামিম গ্রুপের আইইডি তৈরি বিভাগের প্রধান মুশফিকুর রহমান জেনি। জেনি নিজের তৈরি আইইডি দিয়ে ১০০ মিটার দূর থেকে বিস্ফোরণে পারদর্শী ছিল। তাকেও গ্রেফতার করে র‍্যাব।

র‍্যাব-১০ জানিয়েছে, ‘জেনি বিস্ফোরক তৈরিতে বিশেষজ্ঞ। সে জেএমবির সারোয়ার-তামিম গ্রুপের আইইডি তৈরি বিভাগের প্রধান। তার কাছ থেকেই অন্যরা আইইডি তৈরির প্রশক্ষিণ নিয়েছে।’

র‍্যাব কর্মকর্তাদের ধারণা, অলি, আনোয়ার ও জেনি ২০১৪ থেকে ২০১৫ সালের কোনও এক সময়ে সারোয়ার-তামিম গ্রুপে জড়িয়ে পড়ে। পরে তারাই গ্রুপের অন্য সদস্যদের মোটিভেটেড করে জঙ্গি দলে ভেড়ায়। এই গ্রুপের অনেক সদস্যের সঙ্গে সারোয়ার জাহান ও তামিমের সঙ্গে সরাসরি দেখা হয়েছে বলেও র‍্যাব কর্মকর্তারা ধারণা করছেন।

র‍্যার ১০-এর একজন কর্মকর্তা জানান, ২১ মার্চ এই গ্রুপের প্রথম যে ৫ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। সেই ঘটনায় রাজধানীর বাড্ডা থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে সেই মামলাটি র‍্যাব-১০ তদন্ত করে। দেওয়া হয় চার্জশিট। তবে ইতোমধ্যে এই মামলায় গ্রেফতাররা উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়ে কারাগার থেকে বের হয়েছে অনেকেই।

জঙ্গি প্রতিরোধে পুলিশের বিশেষ ইউনিট কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট জঙ্গিদের যে গ্রুপটিকে ‘নব্য জেএমবি’ বলছে, র‍্যাব তাদের জেএমবির ‘সারোয়ার-তামিম’ গ্রুপ বলে আসছে। র‍্যাবের দাবি, এই গ্রুপের প্রধান হলো সারোয়ার জাহান, তামিম তার অন্যতম প্রধান সহযোগী।

 

 

 

/এআরআর/ এএম/এসটি/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
জনআস্থা ও জবাবদিহিমূলক সংসদ গঠনে সাংবিধানিক জ্ঞান জরুরি: ডেপুটি স্পিকার
জনআস্থা ও জবাবদিহিমূলক সংসদ গঠনে সাংবিধানিক জ্ঞান জরুরি: ডেপুটি স্পিকার
প্রতিনিধি পরিষদের ইরান যুদ্ধ-বিরোধী ভোটের প্রতিক্রিয়ায় মুখ খুললেন ট্রাম্প
প্রতিনিধি পরিষদের ইরান যুদ্ধ-বিরোধী ভোটের প্রতিক্রিয়ায় মুখ খুললেন ট্রাম্প
জনগণের আস্থা অর্জনে কাজ করছে জাতীয় সংসদ: স্পিকার
জনগণের আস্থা অর্জনে কাজ করছে জাতীয় সংসদ: স্পিকার
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী