একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নির্যাতনের শিকার ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী ২০১৭ সালে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও শেষ পর্যন্ত তিনি প্রাপ্য ভাতা বুঝে পাননি। গত ৬ মার্চ রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।
২০১৭ সালের ১১ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয় সরকার। সেসময় তিনিসহ ১২৩ জন নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পান। প্রিয়ভাষিণী মনে করতেন, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা সম্মানের বিষয়। টাকার পরিমাণ যাই হোক না কেন, এর মূল্য অন্যরকম। কিন্তু সেই অন্যরকম অনুভূতির স্বাদ তিনি নিয়ে যেতে পারেননি। তার ছেলে কারু তিতাস ফেসবুকে লিখেছেন, ‘দীর্ঘ একটা বছর মা তাঁর অসুস্থ শরীর নিয়ে ঝড়, বৃষ্টি ও রোদে অটোরিকশায় ঘুরেছে এ অফিস থেকে ও অফিস, তাঁর নামে বরাদ্দ মুক্তিযোদ্ধা ভাতার জন্য। আজ মন্ত্রণালয় তো কাল ডিসি অফিস, এভাবে নানা জায়গায়। দিন শেষে মা ক্লান্ত অসুস্থ হয়ে ঘরে ফিরতো। হতাশ হতো না, বলতো— আগামী সপ্তাহে হয়ে যাবে, আগামী মাসে হয়ে যাবে। এভাবেই মা আশায় থাকতো।’
কারু তিতাস তার ফেসবুকের ওয়ালে আরও লিখেছেন, ‘একদিন মাকে বলেছিলাম, মুক্তিযোদ্ধারা গরিব হতে পারে, তাঁরা তো ভিক্ষুক না মা ! তোমার এই শরীর নিয়ে তুমি কেন এভাবে যাও প্রতিদিন ?!!! মা চুপ করে শুন্যে তাকিয়ে থাকে, উত্তর দেয় না। তিন মাস আগে, মা যখন হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়াই করছে, মা আমাদের অনুরোধ করেছিল, তাঁর মুক্তিযোদ্ধা ভাতার একটু খোঁজ নিতে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও মার দিকে তাকিয়ে আমরা সন্তানরা চেষ্টা করেছি। সেই ভাতা তো পায়ইনি বরং আমরা পেয়েছি আমলাতান্ত্রিক অসৌজন্য ব্যবহার। মা দেখে যেতে পারলো না তাঁর সম্মানের মুক্তিযোদ্ধা ভাতা!’
কী সমস্যা হচ্ছিল ভাতা নিয়ে, জানতে চাইলে কারু তিতাস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মা ভীষণ সহজ সরল ছিলেন। মোবাইলটাও ঠিকমতো চালাতে পারতেন না। আমাদের দেশের আমলাতান্ত্রিক জটিলতাগুলো বুঝতে চাইতেন না। তিনি ভাতার টাকাটা নিতে চাচ্ছিলেন আরেকজন দুস্থ মুক্তিযোদ্ধাকে দিয়ে দেবেন বলে। আমরা এসব বলি না। কেননা, তাতে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কথা বলছি ভাবেন অনেকে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞ ভীষণ। আমাদের কোনও অভিযোগ নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘বহু জায়গায় মায়ের অনুরোধে আমি নিজে গিয়েছি শেষের দিকে। মা যেহেতু স্বাক্ষর করতে যেতে পারবেন না, সে কারণে টিপসই চেয়েছিল। এর জন্য আবার চিকিৎসকের অনুমোদনের একটি বিষয় আছে। সেটি করার পর কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে, তারা বেশ খারাপ ব্যবহার করেন। এরপর আর কিছু বলি নাই।’
মাকে সদ্য হারিয়ে ভারাক্রান্ত তিতাস বলেন, ‘তারা নানা দফতরে আমাদের ঘুরিয়েছে। সব মুক্তিযোদ্ধার প্রতি সম্মান দেখিয়েই বলছি, ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীকে যদি এত জায়গায় সত্যায়িত করতে যেতে হয়, তাহলে অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের কথা ভাবুন, কী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।’
প্রিয়ভাষিণীর দীর্ঘদিনের স্বজন খুশী কবীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এরচেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে। ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর মতো মানুষের যদি এই ভাতা পেতে বেগ পেতে হয়, তাহলে আসলে মাঠ পর্যায়ের কী অবস্থা, তা বুঝা যায়। উনি তার যোগ্য সম্মানটিও পেয়েছেন অনেক পরে।’
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই বিষয়গুলো আমরা বারবারই বলে আসছি। একজন মুক্তিযোদ্ধা জীবদ্দশায় তার প্রাপ্য সম্মানটুকু পাবেন না, এটি খুবই হতাশাজনক। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের সর্বস্ব দিয়ে এই দেশকে স্বাধীন করেছেন।’ প্রিয়ভাষিণীসহ যেসব মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাননি, তাদের দ্রুত সেই ব্যবস্থা করে ভাতা দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
তুরিন আফরোজ বলেন, ‘একে তো আমরা তাদের মর্যাদা দিতে এত সময় নিলাম, তারপর যদি ভাতার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়, সেটা একটা উপহাস। ভাতাকে আমি অর্থ দিয়ে বিবেচনা করি না। আসলে এটা তাদের সম্মান দেখানো। তার মতো মুক্তিযোদ্ধার যদি এই পরিণতি হয়, তাহলে নিভৃতচারী যে মুক্তিযোদ্ধারা আছেন, তাদের কী অবস্থা হচ্ছে, সেটা খতিয়ে দেখার বিষয় আছে।’
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ.ক.ম মোজাম্মেল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তিনি এ বিষয়ে অবহিত নন। তিনি বলেন, ‘এটা হওয়ার কথা না। যাদের গাফেলতিতে এটি হয়েছে, তাদের প্রত্যেকের শাস্তির ব্যবস্থা হবে।’
ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীকে শিল্পকলায় অবদানের জন্য ২০১০ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার হিসেবে পরিচিত ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ প্রদান করা হয় এছাড়া, তিনি ‘হিরো বাই দ্য রিডার ডাইজেস্ট ম্যাগাজিন, ‘অনন্য শীর্ষ পদক’, ‘রৌপ্য জয়ন্তী পুরস্কার (ওয়াইডব্লিউসিএ)’, মানবাধিকার সংস্থার ‘মানবাধিকার পুরস্কার’সহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।








