চকবাজার ট্র্যাজেডির পর ফের তোড়জোড় কেমিক্যাল পল্লি নিয়ে

Send
শাহেদ শফিক
প্রকাশিত : ১৩:৫১, ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:২৬, ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১৯

ঢাকার বিসিক শিল্প নগরী

দীর্ঘদিন ধরেই পুরান ঢাকার কেমিক্যাল কারখানাগুলো কেরানীগঞ্জে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশনের (বিসিক) ‘ঢাকা শিল্প নগরীতে’ স্থানান্তরের কথা বলা হচ্ছে। নিমতলী ট্র্যাজেডির পর এ প্রকল্প নিয়ে কাজ শুরু হয়। এরই মধ্যে ৯ বছর পার হয়েছে। কিন্তু দৃশ্যমান কিছুই হয়নি। প্রশাসনের দাবি, কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের আপত্তির কারণে তা হয়নি। প্রশাসন-ব্যবসায়ীদের টানাটানির মধ্যে ২০ ফেব্রুয়ারি চকবাজারের চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডি ঘটে। এ ঘটনায় ফের বিসিক তোড়জোড় শুরু করেছে কেমিক্যাল পল্লির কাজ নিয়ে।

২০১০ সালে নিমতলীতে বিস্ফোরণে ১২৪ জনের প্রাণহানির পর পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক কারখানাগুলো সরিয়ে নেওয়ার জন্য তৎপর হয়েছিল সরকার। ওই সময় কেমিক্যাল পল্লি তৈরির কথা বলা হয়। এরপর মন্ত্রী ও ঢাকার মেয়রসহ সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা দফায় দফায় গুদাম সরানোর ঘোষণা দেন। কারখানা অপসারণে অভিযানও শুরু করা হয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

২০১৭ সালের মার্চে নতুন করে কেমিক্যাল পল্লি তৈরির জন্য বিসিক দুটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। কেরানীগঞ্জের কোন্ডা ইউনিয়নে ২০১ কোটি ৮১ লাখ টাকা ব্যয়ে সোনাকান্দা মৌজায় শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম পাশে শিল্পপল্লি স্থাপনের কথা বলা হয়। কিন্তু প্রকল্প দুটি অনুমোদনে সময় লেগেছে প্রায় ৮ বছর। গত ৩০ আক্টোবর একনেক বৈঠকে প্রকল্পগুলো অনুমোদন পেলেও এখন পর্যন্ত জমি অধিগ্রহণ হয়নি। ছাড় দেওয়া হয়নি অর্থ। ফলে অনুমোদনের পর চার মাস পরও প্রকল্পের কোনও কাজ শুরু হয়নি। প্রকল্প দুটির মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত।

ঢাকার বিসিক শিল্প নগরীর ফাঁকা পড়ে থাকায় জায়গাএরই মধ্যে ২০ ফেব্রুয়ারি অগ্নিকাণ্ডে ৬৭ জনের প্রাণহানি হয়। এরপর নড়েচড়ে বসেছে সরকার। কোমর বেঁধে জমির খোঁজে নেমেছেন প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তারা। প্রাথমিকভাবে শনিবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) প্রকল্প এলাকা নির্বাচন করা হলেও জমি অধিগ্রহণের কার্যক্রম শুরু করতে আরও অন্তত এক সপ্তাহ সময় লাগবে বলে জানিয়েছে বিসিক। জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। কোনও কিছুই চূড়ান্ত করা হয়নি। রাসায়নিক পল্লির প্রকল্পে শুধু দাহ্য পদার্থ ব্যবসায়ীদের গুদাম বরাদ্দ দেওয়া হবে। 

এ ব্যাপারে বিসিকের চেয়ারম্যান মোশতাক হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পুরান ঢাকার কেমিক্যাল গুদাম স্থানান্তরের জন্য কেরানীগঞ্জে একটি কেমিক্যাল শিল্প জোন গড়ে তোলার কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। আমাদের লোক শিল্প জোনের সাইট নির্বাচন করেছে। এখন ডিসি কাগজপত্র প্রস্তুত করে জমি অধিগ্রহণ করে আমাদের হস্তান্তর করবেন। এরপর আমরা কাজ শুরু করবো।’

শুরু থেকে এ প্রকল্পের সার্বিক কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বে আছেন বিসিকের উপ-মহাব্যবস্থাপক খোন্দকার আমিনুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আমি এলাকা পরিদর্শন করেছি। সেখানে কোনও ঘরবাড়ি নেই। বার্ষা মৌসুমে পানিতে ডুবে থাকে। এটি বাবুবাজার ব্রিজ থেকে ৫-৭ কিলোমিটার দূরে কেরানীগঞ্জের কোন্ডা ইউনিয়নে অবস্থিত। সেখানে ৫০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হবে। প্রথমে জমিতে মাটি ভরাট করে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে প্রকল্প প্রস্তুত করা হবে। এতে ৯৩৬টি শিল্প প্লট তৈরি করা হবে।’

ঢাকার বিসিক শিল্প নগরীর ফাঁকা পড়ে থাকায় জায়গাপুরান ঢাকার প্রায় চার হাজার কেমিক্যাল ব্যবসায়ীর মধ্যে মাত্র ৯৩৬ জনকে প্লট বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এটা অপ্রতুল না, আমরা অ্যাসেসমেন্ট করেই তালিকা চূড়ান্ত করেছি। প্রথমে দাহ্য পদার্থ ব্যবসায়ীদেরকে এই প্রকল্পে প্লট বরাদ্দ দেবো। প্রয়োজনে আরও সংযুক্ত করার সুযোগ থাকবে। আর যার যে পরিমাণ জমি লাগবে সেটা সমন্বয় করেই প্লট প্রস্তুত করবো। তবে অ্যাসেসমেন্ট নিমতলী ও আরমানিটোলার বাইরের এলাকাগুলো আমাদের হিসাবের বাইরে ছিল। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগে আমরা কেমিক্যাল সংশ্লিষ্ট তিনটি সংগঠন আমাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্লাস্টিক পদার্থের জন্য ১৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে আমরা আরও একটি শিল্পনগরী গড়ে তোলার কাজ করছি। সেই প্রকল্পটিরও জমি অধিগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। সেখানে প্লাস্টিকের কারখানাগুলো সরিয়ে নেবো।’

তিনি জানান, নিমতলীর ঘটনার পরেই কেমিক্যাল গুদামগুলো সরিয়ে নেওয়ার জন্য নির্দেশ দেন প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১১ সালের ২০ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠিত হয়। একই বছরের ২০ জুলাই কমিটি প্রতিবেদন আকারে একটি সুপারিশ জমা দেয়।

ওই সুপারিশে বলা হয়, ‘কেরানীগঞ্জ অবস্থিত বিসিকের ঢাকা শিল্প নগরীর পাশে ২০ একর জমি অধিগ্রহণ করে সেখানে ৭ তলাবিশিষ্ট ১৭টি ভবন নির্মাণ করে তাদের সরিয়ে নেওয়া সম্ভব।’ এ সুপারিশের ভিত্তিতে ২০১৫ সালে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে বিসিক ডিপিপি প্রস্তত করে। জমিও চিহ্নিত করা হয়। ওই ডিপিপিতে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৪১৮ কোটি টাকা। এতে প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন ধরা হয় ৪০০ বর্গফুট। কিন্তু কেমিক্যাল মালিকরা তাতে রাজি না হওয়ায় সেই প্রকল্প আর এগোয়নি। পরবর্তীতে প্রকল্পের ওই জমি অন্যান্য শিল্প উদ্যোক্তারা বিভিন্ন কলকারখানা গড়ে তুলেছে।

এ প্রসঙ্গে খোন্দকার আমিনুজ্জামান বলেন, ‘ওই প্রকল্পের শুরুতে কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের তিনটি সংগঠনকে আমাদের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি করতে আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু তাতে মালিকরা সাড়া দেয়নি। প্রকল্প দীর্ঘায়িত হওয়ার এটাই কারণ। পরে আমরা ব্যর্থ হয়েই বিষয়গুলো নিয়ে আরও উচ্চ পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা করে উদ্যোগ নিই। এরপর ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে আরও একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির পছন্দে এই জমি চূড়ান্ত করা হচ্ছে। আর ঢাকা শিল্পনগরীর পাশে যে ২০ একর জমি চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলোতে বর্তমানে শিল্প উদ্যোক্তরা জমি দখল করে ভবন তৈরি করে ফেলেছে। যে কারণে ওখানে আর কিছু করা সম্ভব নয়।’

ঢাকার বিসিক শিল্প নগরীর ফাঁকা পড়ে থাকায় জায়গাএ ব্যাপারে কেমিক্যাল ও পারফিউমারি মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘আমরা পুরান ঢাকায় থাকতে চাই না। সেখানে দোকান ভাড়া অনেক বেশি। সরকার কেমিক্যাল পল্লী বানিয়ে দিক এবং তারপর যদি ব্যবসায়ীরা সেখানে না যায় তখন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিক। আমাদের আপত্তি থাকবে না।’

শুক্রবার সকালে সরেজমিন কেরানীগঞ্জে বিসিকের ঢাকা শিল্পনগরী পরিদর্শন করে দেখা গেছে- প্রকল্প এলাকায় বেশ কয়েকটি প্লট খালি পড়ে আছে। সেখানে কোনও ঘরবাড়ি নেই। আর পেছনের অংশে রয়েছে ধলেশ্বরী নদী। নদী তীরের বিশাল অংশ অবৈধ দখলে রয়েছে।

 

/এসটি/এমওএফ/

লাইভ

টপ