বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ব্যাখ্যা দিলেন প্রধানমন্ত্রী

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৮:৩৩, অক্টোবর ০৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:০৩, অক্টোবর ০৪, ২০১৯

অনেকেই বাংলাদেশকে তিন কোটি মধ্যম ও সক্ষম শ্রেণির মানুষের ‘বাজার’ ও ‘উন্নয়নের বিস্ময়’ হিসেবে দেখে থাকেন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে আমাদের শক্তি হলো সামাজিক মূল্যবোধ ও বাংলাদেশের প্রতি মানুষের বিশ্বাস। একইভাবে মানুষের উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষা ও আমাদের নেতৃত্বের প্রতি তাদের আত্মবিশ্বাস ও প্রাণোচ্ছলতাও আমাদের শক্তি।’ শুক্রবার (৪ অক্টোবর) ‘ইন্ডিয়া ইকোনমিক সামিট ২০১৯’ উপলক্ষে  ‘বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম’-এর ওয়েবসাইটে  প্রকাশিত ‘বিকাশমান বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক নিবন্ধে ক্রমবিকাশমান বাংলাদেশের অর্থনীতি বিষয়ক ব্যাখ্যায় তিনি এই চিত্র তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমার বাবা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি সোনার বাংলা, শোষণমুক্ত ও ন্যায়পরায়ণ সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তার স্বপ্ন আমাদের ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নয়নশীল এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত করার পথে এগিয়ে যেতে আত্মবিশ্বাস যুগিয়েছে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘পোশাক উৎপাদক থেকে বাংলাদেশ দ্রুত একটি উচ্চ মূল্যবোধ, জ্ঞানভিত্তিক সমাজের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। গত বছর আমরা কোরিয়ায় ১২টি শিল্প রোবট রফতানি করেছি। বাংলাদেশে তৈরি চারটি জাহাজ ভারতে এসেছে।’

সম্প্রতি বাংলাদেশে তৈরি বিপুল পরিমাণ রেফ্রিজারেটর ভারতীয় কোম্পানি রিলায়েন্স কিনেছে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশে আরও আছে ছয় লাখ আইটি ফ্রিল্যান্সার। এগুলো সেই নীরব পরিবর্তনের কথা বলে, যেখানে মানুষ উদ্ভাবন আর প্রযুক্তিকে গ্রহণ করে ঝুঁকি নেয় আর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে। এখন বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা বিশেষ করে ভারতীয় উদ্যোক্তারা প্রথাগত খাত বাদ দিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষা, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিক্স, গাড়ি শিল্প ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো খাতে বিনিয়োগ করতে পারেন।’   

বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণ ঘটছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘২০৩০ সাল নাগাদ আমাদের মোট জনগোষ্ঠীর ৪৮ শতাংশ বিভিন্ন শহর ও নগরে বসবাস করবে। তাদের বেশিরভাগই হবে তরুণ, কর্মশক্তিবান ও ডিজিটাল-সংযুক্ত মানুষ। তারা হবে কর্মতৎপর, নতুন আইডিয়া গ্রহণে সক্ষম আর তারা সম্পদ অর্জনের নতুন পথ খুঁজবে। প্রকৃতপক্ষে এটা এখনই বাংলাদেশের ১১ কোটির বেশি সক্রিয় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মধ্যেই ঘটছে। ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা হবে মোট জনগোষ্ঠীর ৪১ শতাংশ। দ্রুত নগরায়নের কারণে বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা। আর তিন কোটিরও বেশি মধ্যবিত্ত নাগরিকের রয়েছে বিশাল বাজার।’

‘বাংলাদেশে বিনিয়োগের ঝুঁকি নিয়ে কেউ কেউ উদ্বিগ্ন’ মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘হ্যাঁ, অন্য অনেক দেশের মতো আমাদেরও কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা জানি চ্যালেঞ্জকে কীভাবে সুযোগে পরিণত করতে হয়। এই বছর আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি রেকর্ড ৮ দশমিক ১ শতাংশ ছুঁয়েছে। আমরা দুই অংকের ঘর অর্জনের কাছাকাছি চলে এসেছি। ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি আকারে বেড়েছে ১৮৮ শতাংশ। আমাদের গড় মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৯০৯ মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের কৃষি এখন আর কেবল জীবনধারণের একমাত্র অবলম্বন নয়। স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পর আমরা এখন বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম চাল উৎপাদক, দ্বিতীয় বৃহত্তম পাট উৎপাদক, চতুর্থ বৃহত্তম আম উৎপাদক, পঞ্চম বৃহত্তম সবজি উৎপাদক এবং চতুর্থ বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ মৎস উৎপাদক দেশ। আরও সামনে এগিয়ে যেতে আমরা আমাদের প্রধান শস্য ও ফলের জিন রহস্য উন্মোচন করছি।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘‘২০০৯ সাল থেকে দেশকে একটি ‘ডিজিটাল বাংলাদেশে’ রূপান্তরিত করতে আমরা তৃণমূল পর্যন্ত শতভাগ মানুষের কাছে আইসিটি সুবিধা নিশ্চিত করেছি। আমাদের লক্ষ্য হলো, সাধারণ মানুষের উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ সমাধানে প্রযুক্তি ব্যবহার করা। ফলে বাংলাদেশের রয়েছে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় পঞ্চম বৃহত্তম ইন্টারনেট ব্যবহারকারী জনগোষ্ঠী। আমরা দ্রুত একটি নগদ টাকাবিহীন সমাজের পথে এগিয়ে যাচ্ছি: গত বছর ই-কমার্স লেনদেনের পরিমাণ ২৬ কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে।’’

‘২০৩০ সালে বিশ্বের ২৬তম বৃহত্তম অর্থনীতি হবে বাংলাদেশ’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজ বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগের উদার পরিবেশ দিচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিদেশি বিনিয়োগের আইনি সুরক্ষা, উদার অর্থনৈতিক প্রণোদনা, যন্ত্রপাতি আমদানিতে ছাড়, বাধাহীন প্রস্থান নীতি, চলে যাওয়ার সময় পূর্ণ লভ্যাংশ ও মূলধন ফেরত নেওয়ার কথা। আমরা ওয়ান স্টপ সার্ভিস সুবিধাসহ বাংলাদেশজুড়ে একশোটি বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা স্থাপন করছি। এর মধ্যে ১২টিতে কাজ শুরু হয়েছে। দু’টি অর্থনৈতিক এলাকা ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। বেশ কয়েকটি হাই-টেক পার্কও প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী উদ্যোক্তাদের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।’

‘বিকাশমান বাংলাদেশ’ নিবন্ধে শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘পূর্ব ও উত্তর-পূর্বে ভারত, পশ্চিমে চীন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ বৈশ্বিক ও ভারতীয় ব্যবসায়ীদের কাছে অদ্বিতীয় অর্থনৈতিক স্থান হিসেবে মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। এই উপ-অঞ্চলে আমরা অর্থনৈতিক হাব হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারি। নিজেদের ১৬ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার বাইরেও বাংলাদেশ তিনশো কোটি মানুষের যৌথ বাজারের সঙ্গে যুক্ত ভূখণ্ড হয়ে উঠতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘গত বছর এইচএসবিসি পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ বিশ্বের ২৬তম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত পারে। এতে দুটি জিনিস গুরুত্বপূর্ণ: একটি হলো আমাদের উদার সমাজ, ধর্মীয় সহাবস্থান, উদার মূল্যবোধ ও অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি। অন্যটি হলো—আমাদের সমজাতিভুক্ত দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ তরুণ-বেশিরভাগই ২৫ বছরের নিচে। তারা দ্রুত দক্ষতা অর্জন করতে পারে, প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে পারে আর প্রতিযোগিতামূলক পারিশ্রমিকে যুক্ত হতে তারা প্রস্তুত।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘উন্নয়নের অগ্রযাত্রার পথে আমরা এখনও শিখে চলেছি। সঙ্গে আছে আমাদের আত্মবিশ্বাসী জনগোষ্ঠী, সক্ষম নেতৃত্ব ও শাসনপ্রণালী। বাংলাদেশ আপনাদের একটি স্থিতিশীল ও মানবিক দেশ উপস্থাপন করছে, যেদেশের নেতৃত্ব দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীল। এর সঙ্গে আমাদের বৃহৎ অর্থনৈতিক নীতি এবং প্রায়োগিক ও উন্মুক্ত অর্থনীতি বৈশ্বিক প্রবণতা গ্রহণ করতে থাকবে।’ একইসঙ্গে একটি শান্তিপূর্ণ ও প্রগতিশীল দেশের উদাহরণ হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন। 

 

/জেজে/এএ/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ