পরিবারের সবাই ডায়াবেটিস ঝুঁকিতে!

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ১০:৩১, নভেম্বর ১৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩৩, নভেম্বর ১৪, ২০১৯

ফারজানা রহমান পেশায় একজন প্রকৌশলী, বয়স ২৯। দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের আগে জানা গেলো তিনি গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। তারপর থেকে সন্তান প্রসবের পুরোটা সময় তিনি চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। সন্তান জন্মের পর দেখা গেলো সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানটি খিঁচুনি রোগে আক্রান্ত। এরপর থেকে মায়ের সঙ্গে চলছে সন্তানেরও চিকিৎসা।

ফারজানা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার দাদা-দাদি ও মা ডায়াবেটিসের রোগী ছিলেন। পরে আক্রান্ত হলাম আমি। আর আমার ডায়াবেটিসের কারণে আমার সন্তানও আক্রান্ত হলো। পরিবারের সবাই এখন ডায়াবেটিস রোগী।

আজ  ১৪ নভেম্বর বৃহস্পতিবার বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। বিশ্বের ১৭০টি দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে। বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসে এবারের প্রতিপাদ্য হলো— ‘আসুন, প্রতিটি পরিবারকে ডায়াবেটিস মুক্ত রাখি।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পরিবারে বৃদ্ধ মানুষটির যেমন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি রয়েছে, তেমনি তরুণ, অন্তঃসত্ত্বা নারী এমনকি শিশুও ডায়াবেটিস ঝুঁকির বাইরে নয়। মূলত কায়িক শ্রম ও খেলাধুলা না করা, সুষম খাবার না খাওয়া ডায়াবেটিস রোগের অন্যতম কারণ।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন,পরিবারের সাহায্য ছাড়া ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা এবং ডায়াবেটিস নিয়ে ভালো থাকা সম্ভব না। প্রত্যেকটি মানুষ যেন নিয়মিত ব্লাড সুগার চেক করে— এই বিষয়টি পরিবারের সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে। এছাড়া, স্থূল স্বাস্থ্য,বেশি ওজন বা যদি কারও পরিবারে ডায়াবেটিসের রোগী থাকে এবং কায়িক পরিশ্রম করেন না— এমন মানুষের ক্ষেত্রে ৪০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করা যাবে না। তার আগেই স্ক্রিনিং শুরু করতে হবে। অন্তত ৩০ বছর বয়স হলে অবশ্যই বছর একবার করে চেকআপ করাতে হবে।

জানতে চাইলে গ্রিন লাইফ মেডিক্যাল কলেজের অ্যান্ডোক্রাইনলোজি অ্যান্ড মেটাবোলিজম বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. তানজিনা হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কবে ডায়াবেটিস হবে সেজন্য অপেক্ষা করা যাবে না। আবার কারও যদি ডায়াবেটিস ধরা পড়ে; তাহলে তার একমাত্র চিকিৎসা হচ্ছে সুশৃঙ্খল জীবন যাপন। নিয়ম মেনে সময় মতো খাবার খাওয়া,  সুষম খাবার, ব্যালেন্স ডায়েট, সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট করে হাঁটা, এগুলো করতেও পরিবারকে সাহায্য করতে হবে। কারণ, খাদ্যাভাসসহ সবকিছুই তৈরি হয় পরিবারে।’

তিনি বলেন,‘ব্যালেন্স ডায়েট নেওয়া, রিচ ফুড না খাওয়া, অতিরিক্ত শর্করা এড়ানো— এসব অভ্যাস ছোটবেলা থেকেই তৈরি করতে হবে।’

ডায়াবেটিস রোগীদের নিয়মিত ইনসুলিন বা ওষুধ গ্রহণ এবং মনিটরিংয়ের মধ্যে রাখতে হবে মন্তব্য করে ডা. তানজিনা হোসেন বলেন, ‘কিডনি, চোখ ও নার্ভ পরীক্ষার জন্য দুই থেকে তিনমাস পরপর চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। কারণ, হার্ট অ্যাটাক, কিডনি ফেইলিওর, স্ট্রোক যেকোনও ধরনের জটিলতা তৈরি হবার আগেই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীকে মুক্ত রাখতে হবে।’

তিনি আরও বলেন,‘গর্ভকালীন ডায়াবেটিস এত বেশি বেড়েছে যে, এর ওপর বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ২৪ সপ্তাহ পর প্রত্যেক নারীকে অবশ্যই ডায়াবেটিস পরীক্ষা করাতে হবে। এটা প্রত্যেক নারীর জন্য অত্যন্ত জরুরি।’

ডা. তানজিনা হোসেন বলেন, ‘এখানেও পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। ২৪ সপ্তাহ পর ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা এবং ডায়াবেটিস ধরা পরলে তার জন্য ইনসুলিন গ্রহণ করা এবং সন্তান জন্মানোর আগ পর্যন্ত নিয়মিত মনিটরিং করা অন্তঃসত্ত্বা মায়ের জন্য জরুরি।’

গর্ভকালীন সময়ে মা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে জন্মের পর সন্তানেরও ডায়াবেটিস ঝুঁকি থাকে কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জন্মের সময়ে নড়াচড়া কমে যাওয়া, পানি কমে যাওয়া, জন্মের পর হাইপোগ্লাইসেমিয়া হওয়া, খিঁচুনি হবার ঝুঁকি থাকে। তাছাড়া, জন্মের মুহূর্তে সন্তানের ডায়াবেটিস হবার ঝুঁকি না থাকলেও এসব সন্তান বড় হলে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি অন্যদের চেয়ে বেশি।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হরমোন ও ডায়াবেটিস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ইন্দ্রজিৎ প্রসাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পরিবারের সবাই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এমন রোগীর সংখ্যা কিন্তু দেশে কম না। ডায়াবেটিস এমনিতেই একটি জেনেটিক ডিজিজ, বিশেষ করে টাইপ টু ডায়াবেটিস ফ্যামিলি হিস্ট্রিতে থাকবে, এটা খুবই স্বাভাবিক। ফ্যামিলি হিস্ট্রি বিশেষ করে বাবা-মায়ের মধ্যে যদি কারও একজনের ডায়াবেটিস থাকে, তাহলে সন্তানের ডায়াবেটিস হবার ঝুঁকি থাকে শতকরা ১০ শতাংশ। আর বাবা-মা দুজনই ডায়াবেটিসের রোগী হলে তাদের সন্তানের ঝুঁকি ৬০ শতাংশ,এটা ভয়াবহ একটা বিষয়।’

এখন নতুন করে যারা আক্রান্ত হচ্ছেন তাদের মধ্যে ফ্যামিলি হিস্ট্রি বেশির ভাগই পজিটিভ। ধীরে ধীরে এ সংখ্যাটা বাড়ছে। এখন আমরা ডায়াবেটিস আছে কিনা প্রশ্ন করার আগে জিজ্ঞেস করি— পরিবারে কারও ডায়াবেটিস আছে কিনা, পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে বলেন ডা. ইন্দ্রজিৎ। তিনি বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবে ৪০ বছর বয়সের পর ডায়াবেটিস স্ক্রিনিংয়ের কথা বলা হলেও পরিবারে ডায়াবেটিস রোগী থাকেলে স্ক্রিনিংটা আমরা আরও আগে শুরু করতে বলি।’

ডা. ইন্দ্রজিৎ বলেন, ‘যত ডায়াবেটিস রোগী রয়েছে তার মধ্যে ৯৫ শতাংশ হচ্ছে টাইপ টু ডায়াবেটিস। এটা আগে হতো ৪০ বছরের পর। কিন্তু এখন ১০ বছরের শিশুদেরও টাইপ টু ডায়াবেটিস হচ্ছে। শিশুরা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার কারণ হলো— মোটা হয়ে যাওয়া, পরিবারে ডায়াবেটিস রোগী থাকা, জাঙ্ক ফুড খাওয়া, পরিশ্রম বা ব্যায়াম না করা, বিভিন্ন ডিভাইসে আসক্ত হওয়া। এটি একটি বৈশ্বিক এলার্মিং সিনারিও— যেটা আমাদের দেশেও দেখা যাচ্ছে।

ডায়াবেটিসে কত শিশু আক্রান্ত হচ্ছে জানতে চাইলে ডা. ইন্দ্রজিৎ প্রসাদ বলেন, ‘নতুন যেসব রোগী আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের মধ্যে ৫০ শতাংশের বেশি হচ্ছে ৩০ বছরের কম বয়সী। তাই পরিবারের সবাই ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে পরার আগেই চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।’

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ