স্বাধীনতা পরবর্তী দুর্নীতিবিরোধী যত অভিযান

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ১০:০০, নভেম্বর ২১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৮, নভেম্বর ২১, ২০১৯

দুর্নীতিবিরোধী অভিযান

দুর্নীতির থাবা কখনোই পিছু ছাড়েনি বাংলাদেশের। সব সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠা ‘দুর্নীতি’ দূর করতে স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন সরকারের আমলে পরিচালিত হয়েছে বেশ কিছু অভিযান। তবে এসব দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে খুব একটা সাফল্য মেলেনি।  

রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, বিভিন্ন আমলে নেওয়া দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগগুলোর অপব্যবহার করা হয়েছে, যারা ক্ষমতায় ছিল তারা সুবিধা পেতে এই ‘জনপ্রিয়’ ইস্যুকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। আবার কখনও কখনও এ ধরনের অভিযান পরিচালনার ধরন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিকও হয়েছে। তারা বলছেন, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের সঙ্গে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ইন্ধন, মদত ও সহযোগিতার কারণে মূলত এসব অভিযান বারবারই মুখ থুবড়ে পড়ে। তারা আরও বলেন, দুর্নীতির সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত, তাদের সবাইকে বিচারের আওতায় আনা হয়নি বলেই সার্বিকভাবে এ ধরনের অভিযান সফল হয়নি, দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠতে না পারলে এ ধরনের অভিযান কখনোই সফল হওয়ার কোনও সুযোগ নেই।

প্রথম দুর্নীতিবিরোধী অভিযান

স্বাধীনতা উত্তর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তবে এ বিষয়ে অভিযান পরিচালনার জন্য তার নির্দেশ সম্বলিত প্রজ্ঞাপন সরকারি নথিতে সরাসরি পাওয়া যায় না। কিন্তু, বঙ্গবন্ধু যে তার শাসনামলে দুর্নীতিবাজদের অপতৎপরতায় অতিষ্ঠ ছিলেন, তার প্রমাণ মেলে ১৯৭২ সালের শেষের দিক থেকে প্রায় প্রতিটি বক্তৃতাতেই তার দুর্নীতি প্রতিরোধের ডাক দেওয়া থেকেই। আনুষ্ঠানিক অভিযান পরিচালনার নির্দেশ না দিলেও এসময় বেশ কিছু ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মাঝে মাঝে ব্যবস্থা নেওয়ার খবর তদানীন্তন পত্রিকাগুলোতে উঠে আসতো, যদিও দুর্নীতির ভয়াবহতার তুলনায় এমন পদক্ষেপ যথেষ্ট ছিল না। বিশেষ করে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে আসা ত্রাণ বিতরণে হরিলুট ঠেকাতে পদক্ষেপ নিয়েও সফল হতে পারেননি বঙ্গবন্ধু। এসব দুর্নীতিবাজের কারণেই তার শাসনামলে মরিচ ও লবণের সংকটও সৃষ্টি হয়। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ইত্তেফাক ও গণকণ্ঠ পত্রিকার প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে একের পর এক ব্যাংকের সম্পদ লুটপাট, বিভিন্ন প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ, কালোবাজারি, দুর্নীতি ইত্যাদির অভিযোগ উঠেছিল সরকারি কর্মকর্তা ও দলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে। এমনকি তৃণমূলেও সরকারের নানা উদ্যোগ কেবল দুর্নীতির কারণে মুখ থুবড়ে পড়তে বসে। এমন পরিস্থিতিতে ১৯৭৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি দেশে জরুরি ক্ষমতা আইন জারি করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্রবিরোধী কিছু কার্যকলাপ প্রতিহত করা এবং কিছু গুরুতর অপরাধের দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা। আইনটি নিরাপত্তা আইন ১৯৫২, জননিরাপত্তা অর্ডিন্যান্স ১৯৫৮ এবং বাংলাদেশ তফসিলি অপরাধ (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আদেশ ১৯৭২ (রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ৫০) এর ধারাবাহিকতায় প্রণীত হয়। সেই বিধিবিধানে নাশকতা সন্ত্রাসী ও অন্তর্ঘাতমূলক কার্যকলাপ চোরাচালানি কালোবাজারি এবং গুপ্তহত্যার মতো অপরাধের দায়ে দোষী ব্যক্তিদের প্রাণদণ্ড দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয় এবং এসব সমাজবিরোধী কাজ দমনে সরকারের হাতে পর্যাপ্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা হয়।

সর্বস্তরে দুর্নীতির এই লাগাম টেনে ধরতে ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দেওয়া ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আজকে আমি বলবো বাংলার জনগণকে—এক নম্বর কাজ হবে দুর্নীতিবাজদের বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করতে হবে। আমি আপনাদের সাহায্য চাই। কেমন করে করতে হবে? আইন চালাবো। ক্ষমা করবো না। যাকে পাবো ছাড়বো না।’ তবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হলে তার দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগ আর বাস্তবায়ন হয়নি।

 দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি দুটি সামরিক সরকার

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকে ১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত দুইবার সামরিক শাসনের অধীনে ছিল দেশ। প্রথমবার  সামরিক প্রশাসক হিসেবে লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতা গ্রহণ করে ৬ নভেম্বর ১৯৭৫ থেকে ৯ এপ্রিল ১৯৭৯ পর্যন্ত দেশে সংবিধান স্থগিত রেখে সামরিক শাসন জারি রাখেন। তাকে হত্যার পর ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ দেশে আবারও সামরিক শাসন জারি করেন আরেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল  হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। সে শাসন চলে ১৯৮৬ সালের ১০ নভেম্বর পর্যন্ত। ফলে সামরিক শাসনের ভেতরে গড়ে ওঠা এই দুই নেতার নেতৃত্বাধীন সরকার ও দল দুটি (বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি) দুর্নীতিবিরোধী তেমন কোনও উদ্যোগ নিতে পারেনি সঙ্গতভাবেই। বিভিন্ন রাজনৈতিক বই ও পত্রিকায় বিচ্ছিন্নভাবে ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেলেও অভিযান আকারে কোনও উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি। সরকারি দলিলে এ বিষয়ে তেমন কোনও তথ্যও পাওয়া যায় না। তবে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের কথা তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও পরে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ উভয়েই বিভিন্ন সময়ে বলেছেন। তবে এর কোনও কার্যকরী উদ্যোগ ছিল না। বরং জিয়া ও পরে এরশাদ সরকারের শাসনামলে কেন্দ্র থেকে শুরু করে মাঠের প্রায় সব নেতার নামেই দুর্নীতির অভিযোগ ছিল অসংখ্য।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট কলামিস্ট আব্দুল গাফফার চৌধুরী তার প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘আইয়ুব ও ইয়াহিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ও এরশাদ। এরশাদ তো ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে গুরুতর দুর্নীতির দায়ে কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। কিন্তু তাকেই ক'দিন পরে ডেকে এনে তার মন্ত্রী, এমনকি ভাইস প্রেসিডেন্ট বানিয়েছিলেন। খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভা তো ভর্তি ছিল দুর্নীতিতে দণ্ডিত এবং হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের দ্বারা (শিরোনাম: শুদ্ধি অভিযান সম্পর্কে একটু ধৈর্য ধরুন)।’

ক্ষমতা ছাড়ার পর প্রেসিডেন্ট এরশাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে একাধিক মামলাও হয়।

 

১৯৯১ সালের পরে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক সরকার আসার পরেও দুর্নীতিবিরোধী অভিযান ছিল কথার কথাই। এই দশকে দেশের বৃহত্তম দুই রাজনৈতিক দল বিএনপি (১৯৯১-৯৬) এবং আওয়ামী লীগ (১৯৯৬-২০০১) ক্ষমতায় থাকলেও দুর্নীতিবিরোধী কার্যকরী কোনও উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। যদিও দুর্নীতিবিরোধী প্রচুর বক্তব্য দিয়েছিলেন উভয় শাসনামলের নেতারা। ক্ষমতা ছাড়ার পর উভয় সরকারের অনেক মন্ত্রী ও শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলাও হয়েছিল। এগুলোতে কারও কারও শাস্তিও হয়।

দুর্নীতি দমন ব্যুরো থেকে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন

দেশে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ১৯৫৭-এর মাধ্যমে দুর্নীতি দমন ব্যুরো প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। একজন মহাপরিচালক এবং একাধিক পরিচালকের সমন্বয়ে ব্যুরো গঠিত হয়েছিল। ব্যুরোর মহাপরিচালক ও পরিচালকরা সরকারের বিভিন্ন বিভাগ প্রধানত প্রশাসন, পুলিশ ও বিচার বিভাগ থেকে প্রেষণে (ডেপুটেশন) নিয়োগপ্রাপ্ত হতেন। স্বাধীন কমিশন না হওয়ায় গ্রহণযোগ্য ও সামগ্রিক অভিযান পরিচালনা করতে দেখা যায়নি বলে জানান টিআইবি পরিচালক ড. ইফখোরুজ্জামান। তিনি বলেন, বরাবরই ব্যুরো নখদন্তহীন ছিল। তাদের কাঠামোটাই দুর্নীতি ঠেকাতে কাজ করার মতো হতে পারেনি।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য মতে, ২০০১ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে দেশের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন গঠনে অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। এর মধ্যে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কাউন্সিল গঠন করার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়। তবে ২০০৪ সালের পূর্বে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার এ বিষয়ে কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। ২০০৪ সালে সংসদ এ সংক্রান্ত আইন (২০০৪ সালের ৫ নং আইন) অনুমোদন করে এবং ফলে ঐ সময়ে বিদ্যমান দুর্নীতি দমন ব্যুরো বিলুপ্ত হয়। অনুমোদিত আইনের ভূমিকায় স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন গঠনসহ এ সংক্রান্ত প্রাসঙ্গিক বিষয় এবং দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন গঠনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়।

অপারেশন ক্লিনহার্ট: হত্যা সমাধান!

২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বে জোট সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি হলে খালেদা জিয়ার সরকার সেনা নেতৃত্বে ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ নামে অভিযান শুরু করে। ২০০২ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ নামে যৌথবাহিনীর ওই অভিযান চলে। সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, যৌথ বাহিনীর নেতৃত্বে পরিচালিত অপারেশন ক্লিনহার্টে ৪৫ থেকে ৫০ জন নিহত হয়েছেন। আর হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য অনুয়ায়ী, ক্লিনহার্ট অভিযানে কমপক্ষে ৬০ জন নিহত হয়েছেন। সরকার অবশ্য তখন গ্রেফতারের পর ‘হার্ট অ্যাটাকে' ১২ জনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছিল।

সেসময়ে প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রিকার বিবরণ অনুযায়ী, এ অভিযানে সেনা হেফাজতে নিহতদের মধ্যে অনেকে সরকারি দলের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। বিএনপির নেতৃত্বে তৎকালীন সরকার ২০০৩ সালে ঐ অভিযানের সঙ্গে জড়িতদের দায়মুক্তি দিয়ে সংসদে একটি আইন পাস করে। সেই আইনকে চ্যালেঞ্জ করে ২০১২ সালে করা রিট মামলা করা হলে ২০১৫ সালে এসে তা অবৈধও ঘোষণা করা হয়।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ পরিচালনা করলেও এটিকে ঘিরে বিতর্ক ওঠার বিষয়ে কথা হয় দলটির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদুর সঙ্গে। কেন বিএনপি একটি সফল দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে পারেনি প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার দীর্ঘ সময় সরকারে আছে। প্রথমদিকে এরকম কোনও উদ্যোগ দেখি নাই। বিএনপি প্রতিবারই এক টার্ম ছিল, দ্বিতীয় টার্ম থাকলে হয়তো শুরু করতো।’

ট্রুথ কমিশন অবৈধ

২০০৬ সালে জাতীয় নির্বাচনের জন্য বিএনপি সরকার ক্ষমতা ছাড়লে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিষয়ে নানা ঘটনার পর ২০০৭ এর ১১ জানুয়ারি দেশের ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ চলে যায় সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে। তিন মাস মেয়াদি এই সরকার সুষ্ঠু নির্বাচন দেওয়ার কথা বলে দুই বছর পাড়ি দেয়। এই সরকারের সময়ে ২০০৮ সালের জুন মাসে। একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে গঠন করা হয়েছিল ট্রুথ কমিশন।সেসময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদ জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেন, সরকার দুর্নীতিবাজ, ক্ষমতার অপব্যবহারকারী ও অন্যান্য গুরুতর অপরাধীকে জিরো টলারেন্স দেখাবে।

সে সময় তিনশ’র মতো ব্যক্তি দুর্নীতির অভিযোগ স্বীকার করে ঐ কমিশন থেকে ক্ষমা পেয়েছিলেন। তাদের বেশিরভাগই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সরকারি কর্মকর্তা। এর বাইরে কয়েকজন ব্যবসায়ীও ছিলেন। দুর্নীতি নির্মূলের নামে এই অভিনব ক্ষমা পদ্ধতিকে পরবর্তীতে স্বীকার করেননি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পরে সুপ্রিম কোর্ট সত্য ও জবাবদিহিতা কমিশন বা ট্রুথ কমিশনকে অবৈধ ঘোষণা করে। আর দুর্নীতি দমন কমিশন দায়মুক্তিপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছিল ২০১০ সালে।

চলমান শুদ্ধি অভিযান

আওয়ামী লীগ সরকার টানা তৃতীয় মেয়াদে এসে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যত একটি শুদ্ধি অভিযান শুরু করে। এর আগের দুই মেয়াদে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও দেশে দুর্নীতির অভিযোগসংক্রান্ত খবর প্রায় প্রতিদিনই হতো সংবাদমাধ্যমগুলোর শিরোনাম। আদালতেও বিচারাধীন দুর্নীতির মামলাগুলোর বেশিরভাগ দেখা গেছে বিরোধীদলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে। এই সুযোগে দলটির বেশ কিছু নেতা দলীয় পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য দুর্নীতি করছেন এমন সংবাদে ক্ষুব্ধ হন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর চাঁদাবাজির অভিযোগে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে সরিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে শুদ্ধি অভিযানের নজিরবিহীন উদাহরণ দেখান তিনি। এদিন গণভবনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে দলটির  সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের অভিভাবক হিসেবে এর শীর্ষ দুই নেতার বিরুদ্ধে নিজেই অভিযোগ তোলেন এবং তাদের বিরুদ্ধে পাওয়া চাঁদা দাবির অভিযোগ আমলে নিয়ে তাদের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। জানা গেছে, এই দুই নেতা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করেছিলেন। এসময় প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতি নির্মূলে বড় ধরনের অভিযান পরিচালনার ইঙ্গিত দেন। এরপর ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান চালানো হলে বেরিয়ে আসে দুর্নীতির নানা খবর।এরই মধ্যে তিন সংসদ সদস্যসহ ২৩ ব্যক্তির বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। একে একে গ্রেফতার হন যুবলীগের নেতা হিসেবে পরিচিত বিতর্কিত ঠিকাদার এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীম, মোহামেডান ক্লাবের ডিরেক্টর ইনচার্জ মো. লোকমান হোসেন ভূঁইয়া, ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট, কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের সভাপতি মোহাম্মদ শফিকুল আলম (ফিরোজ), অনলাইন ক্যাসিনোর হোতা সেলিম প্রধান, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান (মিজান), ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর যুবলীগ নেতা তারেকুজ্জামান রাজীব প্রমুখ। তিন সংসদ সদস্যসহ অনেকের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। এখনও নজরদারিতে আছেন শতাধিক নেতা।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন এরশাদ, খালেদা জিয়া ও সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে পরিচালিত দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের সঙ্গে এই অভিযানের একটি মৌলিক পার্থক্য হলো, আগের অভিযানের লক্ষ্য ছিল সরকারের প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি কিংবা ব্যবসায়ীরা। জিয়ার শাসনামলে রাষ্ট্রীয় টাকার বিপুল অপচয় ঘটতে দেখা যায়। এরশাদ আমলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক সাহায্য আসলেও দুর্নীতি-অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে তা জনগণের কোনও কাজে লাগেনি।

আর টিআইবি বলছে, ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানটি ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক ও বাছাইকৃত। আর তাদের বানানো ট্রুথ কমিশন ছিল সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

যা বলে দুর্নীতির সূচক

দুর্নীতি সূচকে দেশের ‘বিব্রতকর’ অবনতি ঘটে ২০১৮ সালে। ২০১৮ সালে দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশ ঠাঁই পায় ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৪৯তম অবস্থানে। অথচ ২০১৭ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৩তম। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ১০০'র মধ্যে ২৬, যেটি ২০১৭ সালের চেয়ে দুই পয়েন্ট কম। অর্থাৎ শতকরা হারে বাংলাদেশের দুই পয়েন্ট অবনতি হয়।

তথ্য ঘেঁটে জানা গেছে, দুর্নীতির বিশ্বজনীন সূচকে ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ একটানা পাঁচ বছর তালিকার সর্বনিম্ন অবস্থানে ছিল। ২০০৬ সালে এই অবস্থান হয় নিম্নক্রম অনুযায়ী তৃতীয়, ২০০৭ সালে সপ্তম, ২০০৮ সালে দশম, ২০০৯ সালে ১৩তম, ২০১০ সালে ১২তম, ২০১১ ও ২০১২ সালে ১৩তম, ২০১৩ সালে ১৬তম এবং ২০১৪ সালে ১৪তম।

বাংলাদেশে দুর্নীতি পরিস্থিতি ধারাবাহিকভাবে খারাপ হওয়ার পেছনের কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাদের দেশে দুর্নীতিকে এখনও শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে মনে করা হয় না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে অঙ্গীকার নানা সময় করতে দেখা গেলেও বাস্তবায়নের জায়গায় বিশাল গরমিল দেখা যায়। অনেক কারণে যারা ক্ষমতাবান, তারা দুর্নীতি করে পার পেয়ে যায়। এই চিন্তা ও কর্মের সীমাবদ্ধতা সূচকে প্রভাব ফেলে।

তবে শুদ্ধি অভিযান সফল হচ্ছে বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান। তিনি মনে করেন ইতোমধ্যে অভিযানের সফলতা দেখা যাচ্ছে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পৃথিবীর কোনও দেশই দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের শেষ দেখে না, কারণ দুর্নীতি চলমান প্রক্রিয়া। অতীতের সরকার দুর্নীতিবিরোধী অভিযান তো করেইনি বরং দুর্নীতিতে বাংলাদেশ বারবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আমাদের সরকারে আসার পরে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান অব্যাহত রেখেছি, দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করেছি এবং দেশের বিভিন্ন জায়গায় দুর্নীতি কমাতে ব্যবস্থা নিয়েছি। যারা দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া চলছে, আমরা ইতোমধ্যে সফলতা দেখতে পাচ্ছি। তবে আরও অনেক সফলতা আমাদের প্রয়োজন এবং সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।

টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে এ বিষয়ে আরও বলেন, এর আগেও বিভিন্ন আমলে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান দেখেছি। এবারেরটাতে গুণগত পার্থক্য ছিল, শুরু হয়েছে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে দেওয়া ঘোষণা ‘কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না’ ও ‘শুদ্ধি অভিযান নিজের ঘর থেকে’ এসব বক্তব্যের মধ্য দিয়ে। তাই ধারণা ছিল সুফল পাওয়া যাবে। এ দফায় শুরু থেকে দলের ভেতরের নেতাকর্মীরা ধরপাকড় হয়েছে। কিন্তু সেগুলো কৌশলকেন্দ্রিক কিছু না, সাময়িক কিছু ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে নেওয়া পদক্ষেপ। কোনও একটি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সকল পক্ষের বিচার না হলে সার্বিকভাবে দুর্নীতিবিরোধী  অভিযান  সফল হওয়ার সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন ছাত্রনেতাকে বহিষ্কারের ঘটনায় একধরনের স্বস্তি ছিল। কিন্তু, বহিষ্কার তো চূড়ান্ত বিচার নয়, অপরাধী হলে তার বিচার হতে হবে। আবার যে অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সেটাতে অন্য যারা পক্ষ তাদের ক্ষেত্রে কিছু ঘটেনি।

২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের অভিযানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সে সময় বিরোধী দল ছিল না। যারা ক্ষমতায় ছিল তাদের টার্গেট যারা ছিল তারা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। পরবর্তীতে যেটা হয় ক্ষমতার অপব্যবহার দেখা যায়। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের নামে অবৈধ অর্থ আদায় হয়রানি হয়েছে। সেটাও সাফল্য দেয়নি বরং অভিযান কনসেপ্টটার জন্য ক্ষতিকর হয়েছে। ট্রুথ কমিশন একটা বেআইনি বিষয় ছিল। এটাকে  অপব্যবহার করা হয়েছে, যারা ক্ষমতায় ছিল তারা সুবিধা পেতে এটা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। কোনও অভিযান সফল করতে হলে টোটাল যে নেটওয়ার্ক তার একটা অংশকে টার্গেট করে সফলতা পাওয়া সম্ভব না।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু মনে করেন, এধরনের অভিযান রাজনেতিক কমিটমেন্টের বিষয়। আইনের শাসনের পক্ষে থাকলে একরকম, গণতন্ত্রের পক্ষে থাকলে একরকম। কমিটমেন্টের জায়গা থেকে সরে গেলে যতই উদ্যোগী হই কাজে আসে না। বর্তমান যে শুদ্ধি অভিযানের উদ্যোগ, সেটা যদি কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা যায়, তাহলে সেটি থেকে সমাজ রাষ্ট্র ও দেশবাসী ভালো কিছু পাবে। মাঝপথে শেষ হলে আইওয়াশ হিসেবে হাজির হবে।

তিনি আরও বলেন, কমিটমেন্টের অভাব থাকলে চমকপ্রদ ঘটনা ঘটিয়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়।

বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক মনে করেন, বড় দুর্নীতিগুলোর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক ছত্রছায়া থাকে। যারা ক্ষমতায় থাকেন তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা থাকে বলেই দুর্নীতি সম্ভব হয়। ‘৮০ ও ’৯০ দশকে ঋণখেলাপিদের তালিকা করার উদ্যোগ নিতে দেখেছি। অভিযান শুরুর পর যখন যারা ক্ষমতায় থাকেন তাদের নীতিনির্ধারকদের সংযুক্তি বের হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয় বলেই এগুলো এগোতে পারে না। এবারও একইভাবে মাদকবিরোধী অভিযান মুখ থুবড়ে পড়েছে। বন্দুকযুদ্ধের নাম করে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ইয়াবা সম্রাট বলে যাদের তালিকা, তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। তিনি মনে করেন, সাম্প্রতিক দুর্নীতিবিরোধী অভিযান হোঁচট খেয়েছে।

/টিএন/এমএমজে/

লাইভ

টপ