উন্নত জাতি গঠনে মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিদেশে পড়তে পাঠাতেন বঙ্গবন্ধু: অধ্যাপক বজলুল হক

Send
মাহবুব হাসান
প্রকাশিত : ১০:০০, জানুয়ারি ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৪৭, জানুয়ারি ২১, ২০২০

অধ্যাপক বজলুল হক

স্বাধীনতার পর দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিদেশে পাঠিয়ে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। উদ্দেশ্য ছিল বিদেশে শিক্ষাগ্রহণ করে এসব শিক্ষার্থী দেশে ফিরে উন্নত জাতি গঠনে ভূমিকা রাখবেন। এমন একটি ব্যাচে রাশিয়ায় পড়তে গিয়েছিলেন অধ্যাপক খন্দকার বজলুল হক। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু যাদের রাশিয়ায় পড়তে পাঠান তাদের অন্যতম ছিলেন তিনি। রাশিয়া যাওয়ার প্রাক্কালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন বজলুল হক। ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগ এবং শিক্ষকতা জীবনে নীল দলের রাজনীতিতে জড়িত থাকলেও রাশিয়া যাওয়ার সূত্রেই বঙ্গবন্ধুর সংস্পর্শে আসেন অধ্যাপক বজলুল হক। মুজিববর্ষ উপলক্ষে বাংলা ট্রিবিউনের কাছে তিনি তুলে ধরেছেন বঙ্গবন্ধুর কাছে যাওয়ার অভিজ্ঞতা, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তার মূল্যবান মতামত।

অধ্যাপক বজলুল হকের কাছে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা হওয়ার স্মৃতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ১৯৭৪ সালে প্রথম দেখা হয়। বঙ্গবন্ধু তখন প্রধানমন্ত্রী, সচিবালয়ে বসতেন। রাশিয়ায় পাঠানোর জন্য সে বছর যেসব শিক্ষার্থীকে চূড়ান্ত করা হয় তার মধ্যে আমিও ছিলাম। সবকিছু চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার পরে আমাদের ডাক পড়ে বঙ্গবন্ধুর দরবারে। আমরা দেখা করতে গেলে তিনি অত্যন্ত মূল্যবান একটি ভাষণ দেন। যার সারমর্ম ছিল পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে আসতে হবে, দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে। এরপর আমরা রাশিয়া চলে যাই। সেখানে থাকতেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যার খবর পাই। প্রচণ্ড কষ্ট পেলেও কোর্স শেষ করে দেশে ফিরে আসি।

অধ্যাপক বজলুল হক

অধ্যাপক বজলুল হক আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনারারি অধ্যাপক হিসেবে কাজ করছেন। ছিলেন পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান। কাজ করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য হিসেবেও। দুই বার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। এখন অধ্যাপনার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক উপ-কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবেও কাজ করছেন।

বজলুল হক বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন, ছিলেন রাষ্ট্রনায়ক। তিনি কালকে জয় করেছেন, নিজেকে নিজে অতিক্রম করেছেন। তিনি ছিলেন পুরোদস্তুর ভিশনারি রাজনীতিবিদ। ছাত্রলীগ গঠন থেকেই তার ভিশন ছিল স্পষ্ট। ধাপে ধাপে তিনি দেশকে স্বাধীনতার দিকে নিয়ে এসেছেন, কিন্তু বরাবরই তার সার্বিক লক্ষ্য ছিল বাঙালির মুক্তি। সেটা কী রাজনৈতিক, কী অর্থনৈতিক। শোষিত-বঞ্চিত বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠাই ছিল তার রাজনীতির ব্রত।

ছাত্রলীগের সাবেক এ নেতা বলেন, চারটি বৈশিষ্ট্য দিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের চরিত্র রূপায়ণ করেছিলেন। গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্নে সমাজতন্ত্র এবং অসাম্প্রদায়িকতাকে দিয়ে তিনি বাংলাদেশকে বিশ্বে পরিচিত করেছিলেন। এই প্রতিটি বৈশিষ্ট্যেরই নিজস্ব ব্যাখ্যা ছিল। বাংলাদেশকে তিনি এভাবেই চরিত্রায়ন করেছিলেন। পাশাপাশি অর্থনীতি, কূটনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামোসহ রাষ্ট্রের সবদিকেই স্বাতন্ত্র্য চিন্তা নিয়ে এগোচ্ছিলেন। কিন্তু হায়েনারা তার চিন্তা বাস্তবায়নের আগেই তাকে হত্যা করে।

অধ্যাপক বজলুল হকের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদক মাহবুব হাসানএ শিক্ষাবিদ বলেন, স্কুল জীবন থেকেই ‘শেখ মুজিব’কে জানতে শুরু করি। একটু বড় হয়ে ওঠার পর ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত হই। চট্টগ্রাম কমার্স কলেজে পড়াকালীন পুরোদমে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে যাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হই। পরে এসএম হল ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পাই। এ সময়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অনুসরণ করে নির্দেশ মেনে কাজ করতাম। মাঝে মধ্যেই বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাড়ি যেতাম। কিন্তু তিনি তখন প্রায়ই জেলে থাকতেন। তার অবর্তমানে আমাদের নির্দেশনা দিতেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব।

অধ্যাপক বজলুল বলেন, বেগম মুজিব ছাত্রলীগের অনেক বিষয়েই বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনা দিতেন, সে অনুযায়ী ছাত্রলীগ কার্যক্রম চালাতো।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম এ সদস্য বলেন, বঙ্গবন্ধুর দূরদৃষ্টি এবং সংগ্রামের কারণেই আস্তে আস্তে তিনি সামনের সারির রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠেন। শুরুতে তিনি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৫৬ তে এসে দলের সাধারণ সম্পাদক হন। আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারির পর অনেকে আপস করলেও তিনি আপস করেননি। আর ১৯৬৬-তে ছয় দফা দিয়ে তিনি আপামর বাঙালির মন জয় করে নেন। তখনও অনেকেই আপসের পথে চলেছিলেন। এমনকি আওয়ামী লীগের অনেক বড় নেতারাও ছয় দফা সমর্থন করেননি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ছয় দফা প্রশ্নে অনড় ছিলেন। ছয় দফা সারাদেশে ছড়িয়ে দিয়ে তিনি জনপ্রিয়তার পাশাপাশি স্বাধিকার আন্দোলনকে বেগবান করেন। বঙ্গবন্ধুর ১৯৬৯ সালের নির্বাচনে যোগ দেওয়া নিয়েও অনেক বড় নেতার আপত্তি ছিল বলে উল্লেখ করেন খন্দকার বজলুল হক। তিনি বলেন, তখন অনেকেই একটি অধ্যাদেশের কারণে নির্বাচনে অংশ নিতে চাচ্ছিলেন না। কিন্তু, বঙ্গবন্ধু মনে করেছিলেন, জনগণের ম্যান্ডেট আমাদের স্বাধীনতার দিকে অনেক দূর এগিয়ে নেবে। এবং হয়েছিলও তাই। ’৬৯ এর গণআন্দোলনের পথ ধরে আমরা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ পাই।

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

/টিএন/এমএমজে/

লাইভ

টপ