যে কারণে অবৈধভাবে বিদেশিদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে

Send
রাফসান জানি
প্রকাশিত : ১২:১৯, ফেব্রুয়ারি ০৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৩৪, ফেব্রুয়ারি ০৮, ২০২০

গার্মেন্টে কর্মরত বিদেশিরা, ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীতদেশের বিভিন্ন সেক্টরে আড়াই লাখের বেশি বিদেশি কাজ করছেন। এর একটা বড় অংশ অবৈধভাবে কাজ করছেন। বিদেশিদের বেশিরভাগই কাজ করেন তৈরি পোশাক খাতে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে। এতে বলা হয়েছে, কাজের জন্য ভিসা, অনুমতির জটিলতা ও দেশীয় মালিকদের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতার কারণে পর্যটন ভিসা নিয়ে অবৈধভাবে বিদেশিরা কাজ করছেন।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, দেশে আন্তর্জাতিক মানের বহু শিল্প-কারখানা থাকলেও তা পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল নেই। আর দক্ষ জনবল তৈরির বড় কোনও প্রতিষ্ঠানও সেভাবে দেশে গড়ে ওঠেনি। যেসব প্রতিষ্ঠান আছে, সেগুলো থেকে শিক্ষার্থীরা বের হয়ে বিভিন্ন সেক্টরে কাজ করছেন। কিন্তু যে পরিমাণ দক্ষ জনবল প্রয়োজন হয়, তা পাওয়া যায়নি। ফলে বিদেশিদের নিয়োগ দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো।    

পোশাক শিল্পে সবচেয়ে বেশি বিদেশি কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশিদের অধিকাংশ পর্যটন ভিসায় এসে অবৈধভাবে কাজ করছেন। এজন্য প্রতিবছর বিদেশে পাচার হচ্ছে ২৬.৪ হাজার কোটি টাকা।

দক্ষ জনবল সংকটের পাশাপাশি বিদেশি কর্মীদের বৈধ প্রক্রিয়ায় নিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ অনুযায়ী, বিদেশি একজনকে বৈধভাবে নিয়োগ দেওয়ার জন্য ভিসা সুপারিশপত্র, বিদেশে বাংলাদেশ মিশন থেকে ভিসা সংগ্রহ, বিদেশি নাগরিক নিবন্ধন, কাজ করার অনুমতির জন্য আবেদন, নিরাপত্তা ছাড়পত্র নেওয়াসহ আটটি সংশ্লিষ্ট বিভাগে নিয়মবহির্ভূত অর্থ লেনদেন করতে হয়। গড়ে ২৩-৩৪ হাজার টাকা দিতে হয় বিভিন্ন বিভাগে। 

শিল্প-কারখানায় বিভিন্ন পদে কাজ করার মতো দেশীয় দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক প্রেসিডেন্ট সালাম মোর্শেদী। তিনি বলেন, ‘দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে আমাদের এখানে আন্তর্জাতিক মানের ইন্ডাস্ট্রি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিশেষ করে গার্মেন্টে টপ টু বটম আমাদের নিজস্ব শিল্প গড়ে উঠেছে। এতে নতুন নতুন বিষয়ে টেকনিশিয়ান প্রয়োজন হয়। কিন্তু সেই তুলনায় দক্ষ মানুষ আমরা দেশে পাই না।’

বিশ্বের ৪৪টির বেশি দেশ থেকে আসা বিদেশিরা বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে কর্মরত রয়েছে বলে জানিয়েছে টিআইবি। ২১টির বেশি খাত বা প্রতিষ্ঠানে এসব কর্মী কাজ করছেন। পর্যটন ভিসায় এসে কাজ করার ক্ষেত্রে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশ রয়েছে বলে দাবি করেছে টিআইবি।

তারা বলছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কর অঞ্চল-১১তে কর জমা দিয়েছেন সাড়ে ৯ হাজার বিদেশি, যাদের বার্ষিক আয় উল্লেখ করা হয়েছে ৬০৩ কোটি টাকা। তাদের এই আয়ে কর দেওয়া হয়েছে ১৮১ কোটি টাকা।

তৈরি পোশাক খাতে বিভিন্ন পদে কর্মরত বিদেশিদের মাসিক বেতন সম্পর্কে টিআইবি বলছে, তারা যে পরিমাণ বেতন পান তা আয়কর রিটার্নে কমিয়ে উল্লেখ করেন। একজন প্রধান নির্বাহী বেতন পান ১০-১২ হাজার ডলার, আয়কর রিটার্নে উল্লেখ করেন ৩-৩.৬ হাজার ডলার। সিনিয়র ম্যানেজার হিসেবে একজন বিদেশি পান ৪-৬ হাজার ডলার, কিন্তু আয়কর রিটার্নে উল্লেখ করেন ১.২৫-১.৭৫ হাজার ডলার।

এ বিষয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘যারা আয়কর রিটার্ন দিচ্ছেন তারাও মূল আয় গোপন করে অল্প পরিমাণ রিটার্ন ঘোষণা করছেন। এতে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান ও নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তি উভয়ই লাভবান হচ্ছেন। তবে রাষ্ট্র রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’ এভাবে রাষ্ট্র প্রতিবছর ১২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে টিআইবির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে চামড়া শিল্প খাতের এক ব্যবসায়ী বলেন, অবৈধভাবে বিদেশি নিয়োগ দেওয়া হলে রাষ্ট্র রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হলেও নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও কর্মী উভয়ই লাভবান হন। এসব বিষয় দেখভালের দায়িত্বে থাকা লোকজনের সমন্বয়হীনতা ও দুর্নীতির প্রবণতার কারণে বিদেশিরা অবৈধভাবে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন। তারা দেশে কাজ করে মোটা অঙ্কের টাকা আয় করছেন এবং রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে দেশ থেকে সেই টাকা পাচার করে নিয়ে যাচ্ছেন।

তৈরি পোশাক শিল্পে বড় যে পদগুলোতে বিদেশি নিয়োগ দেওয়া হয় তাদের সংখ্যা সব মিলিয়ে খুব বেশি না। গার্মেন্ট রিলেটেড বড় বড় ব্র্যান্ড বা বায়ারদের যে লিয়াজোঁ প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে, সেখানে বিদেশিরা বেশি পরিমাণে কাজ করেন বলে জানিয়েছেন বিজিএমইএ’র সাবেক প্রেসিডেন্ট সিদ্দিকুর রহমান।

দেশে কর্মরত বিদেশিদের একটা বড় অংশ অবৈধ হলেও তাদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথাযথ পদক্ষেপ নেয় না বলে জানিয়েছে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক।

তবে টিআইবির বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। যাদের ভিসা এক্সপায়ার হয়ে গেছে, তাদের আমরা পাঠিয়ে দিচ্ছি। সঙ্গত কারণ থাকলে তাদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে।’

/আরজে/এসটি/এমএমজে/

লাইভ

টপ