কোথাও কেন নেই দীপালী-জাফরসহ ১০ শহীদ

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ২২:৩৭, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:০৭, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২০

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় গুলি ছুড়ছে পুলিশ (ছবি: ইন্টারনেট থেকে নেওয়া) একেবারে কাছের সহযোদ্ধাদের স্মৃতিতে ছাড়া কোথাও নেই ছাত্র আন্দোলনে স্বৈরাচার প্রতিরোধ আন্দোলনে ১০ শহীদ স্মরণ। ১৪ ফেব্রুয়ারি বেয়োনেটের আঘাতে খুঁচিয়ে হত্যার শিকার এই নেতাকর্মীরা হারিয়ে গেছেন উৎসব আয়োজনে। এমনকি বর্তমান ছাত্রনেতারাও বড়সড় কোনও কর্মসূচি দেন না দিনটিকে ঘিরে। সাবেক ও বর্তমান সংগঠকদের মধ্যে এই একই প্রশ্ন।

১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। মজিদ খানের ‘শিক্ষানীতির বিরোধীতাকারী শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদে আরও আগে থেকেই উত্তাল। ১৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ডাক দেয় ছাত্র জমায়েতের। সেদিন মিছিলটি হাইকোর্ট এলাকায় পৌঁছালে পুলিশ ব্যারিকেড দেয়। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা কাঁটাতারের ওপরে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা শুরু করেন। পুলিশ একশনে যায়। আকস্মিকভাবে রায়ট কার ঢুকিয়ে গরম পানি ছিটানো শুরু করে তারা। এরপর লাঠিচার্জ এবং নির্বিচারে গুলি। মিছিলে প্রথম গুলিবিদ্ধ হন জয়নাল। আহত জয়নালকে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে খুন করে পুলিশ। এরপর একে একে জাফর, কাঞ্চন, দীপালী সাহাসহ ১০ জন শহীদ হন। দিনটি এখন স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালন করা হয়। বাম সংগঠনগুলো নিজেদের মধ্যে ছোট পরিসরে দিবসটি পালন করে থাকে।
কিন্তু, কেন এখনকার রাজনৈতিক নেতারা সেই দিনটির স্মরণে বড়সড় প্রতিবাদ জারি রাখতে পারলেন না—এমন প্রশ্নে রাষ্ট্রচিন্তার সদস্য ও ঢাকা ইউনিটের সংগঠক সারোয়ার তুষার বলেন, ‘আমার মনে হয়, এটা বামসংগঠনসহ বাংলাদেশের সব প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ এবং সেই অনুযায়ী তৎপর হওয়ার অনীহাজনিত কারণে হয়েছে। স্বৈরাচার যে ভীষণভাবে বর্তমানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়, সামরিক স্বৈরাচারের বাইরেও যে ব্যবস্থাগতভাবে স্বৈরতন্ত্র বিরাজ করতে পারে, এমনকি শাসনতান্ত্রিকভাবেও; এই বোঝাপড়া এবং রাজনৈতিক চিন্তাচর্চার সামগ্রিক অভাবেই ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’কে ‘দূর অতীত’ জ্ঞান করে কোনও কর্মসূচি না নেওয়া কিংবা অনুষ্ঠানসর্বস্ব কর্মসূচির মধ্যেই ঘুরপাক খাওয়া ছাড়া কিছু করার বিষয়ে ভাবে না এই দলগুলো।’
গণবিরোধী শিক্ষানীতি প্রত্যাহারে প্রতিরোধ মিছিল (ছবি: ইন্টারনেট থেকে নেওয়া)ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি খান আসাদুজ্জামান মাসুম বলেন, ‘আমরা যখন ছাত্র রাজনীতি করছি, তখন জয়নাল, জাফর, কাঞ্চন, দীপালী সাহাদের নাম শোনা যেত বিভিন্ন কর্মসূচিতে। এরপর ধীরে ধীরে একটা নির্দিষ্ট ঘরানার বিষয় হয়ে দাঁড়ালো। এখনও এই দিনটিতে শ্রদ্ধার্ঘ অর্পণ করা হয়। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিরোধ বলতে যা বুঝায় সেটি হারিয়ে গেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের এখন অনেক বিষয়ের মধ্য দিয়ে রাজনীতি করতে হয়। এর মধ্যে একইদিনে ভালোবাসা দিবসের মতো করপোরেট উদযাপনের বিষয় ঢুকে প্রতিরোধ হারিয়ে গেছে।’ ঘুরে দাঁড়ানোর কথা জানিয়ে এই নেতা বলেন, ‘আগামীবার থেকে আমরা দিনটিকে অন্যভাবে স্মরণের উদ্যোগ নেবো। সেটার প্রস্তাব ইতোমধ্যে আনা হয়েছে। সে সময়ের ছাত্র নেতাদের সমন্বয়ে বর্তমান ও সাবেক ছাত্র নেতাদের নিয়ে একটি প্রস্তুতি কমিটি করা হবে।’
আশির দশকের তুখোড় ছাত্রনেতা বৃত্বা রায় দীপা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ লে. জে. হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখলের পর রাজপথে প্রতিরোধ ছিল। মজিদ খানের শিক্ষানীতি হলে সেটা প্রত্যাখ্যানের পক্ষে সংগঠিত হতে পেরেছিলেন নেতারা। এরপর আমরা ইতিহাসের সেই কালো দিনটির মধ্য দিয়ে গেলাম। ১৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ছাত্র জমায়েতের ডাক দিলে প্রশাসন ভয় পেয়ে যায়। সেদিন মিছিলে প্রথম গুলিবিদ্ধ হন জয়নাল। একে একে জাফর, কাঞ্চন, দীপালী সাহাসহ ১০ জন শহীদ হন। কিন্তু সেই প্রতিরোধের রজনীতি ধরে রাখা যায়নি।’
তখনকার লিফলেট (ছবি: ইন্টারনেট থেকে নেওয়া)এখন কেন এটা বড় পরিসরে স্মরণ করা হয় না—এই প্রশ্ন আমারও উল্লেখ করে এই নেতা বলেন, ‘কেবল নামেমাত্র শ্রদ্ধার্ঘ আর ছোট পরিসরে আলোচনা করে দিনটিকে জনসম্মুখে আনা যাবে না। কালের গহ্বরে প্রজন্মের কাছ থেকে হারিয়ে যাবে।’
সে সময় যারা রাজনীতি সংশ্লিষ্ট বা রাজনৈতিক সচেতন ছিলেন তারা বারবারই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিনটি ও শহীদদের স্মরণ করে আসছেন। বসন্ত ও ভালোবাসা দিবসের মাঝেও শহীদদের স্মরণ করার বার্তা দিচ্ছেন। অধিকারকর্মী নঈম গওহার ওয়ারা তার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘বসন্ত এসে গেছে, তবে আসল ফাগুনের স্বপ্ন দেখাতে গিয়ে যারা প্রাণ দিয়েছিলেন তাঁদের যেন ভুলে না যায় মৌসুমি বসন্তের বন্দনায়। বাংলায় আসুক আসল বসন্ত আসল ফাগুন, আগামী ফাগুনে আমরা যেন দ্বিগুণ হই। দীপালী-দেলোয়ার-সেলিম-বসুনিয়া তোমাদের জন্য আসুক বসন্ত আর ভালোবাসা দিবস।’

 

/ইউআই/আইএ/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ