আটকে পড়া বাঙালিদের বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর বিশেষ বাণী জাতিসংঘে

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ১২:০১, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:২০, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২০

১৯৭২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারির পত্রিকাপাকিস্তানে বাঙালি নির্যাতন চলছে— এই মর্মে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশেষ বাণী নিয়ে জাতিসংঘের সদর দফতরে যান  জাতিসংঘের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল পল মার্ক হেনরি । বঙ্গবন্ধু পুরো ফেব্রুয়ারি মাসজুড়েই পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙালিদের পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন বক্তৃতা-বিবৃতিতে উল্লেখ করেন এবং বিশ্বনেতাদের ওপরে চাপ প্রয়োগের জন্য আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন।

এদিকে সেসময় কেবল যানবাহনের অভাবে জরুরি ত্রাণ কাজ ব্যাহতের খবর প্রকাশিত হয়। জাতিসংঘ বলছে, ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮৭ লাখ শরণার্থী দেশে ফিরে আসে।

পুনর্বাসন ব্যাহত

যানবাহনের অভাবে বেশিরভাগ জায়গায় ত্রাণ পাঠানো যাচ্ছে না। যেসব শরণার্থী ভারত থেকে ফিরে আসছেন এবং যারা দেশে থেকেও গৃহহীন  ও সম্বলহীন হয়ে সাহায্যের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছেন, প্রয়োজনের তুলনায় তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিতান্তই অকিঞ্চিৎকর বলে অনেকে অভিযোগ করতে শুরু করেন। দৈনিক বাংলার ২৫ ফেব্রুয়ারির পত্রিকায় এ বিষয়ে বিশেষ সংবাদ প্রকাশিত হয়।

সংবাদে বলা হয়, পুনর্বাসন ও ত্রাণ কাজে নিযুক্ত কর্তৃপক্ষ সবচেয়ে বেশি অসুবিধার মুখোমুখি হচ্ছে যানবাহনের অভাব থেকে। দেশের প্রধান প্রধান শহর ও বন্দরে যেসব পণ্য সামগ্রী রয়েছে, সেগুলো নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছানোর জন্য যে সংখ্যায় বাহন প্রয়োজন, তা নেই। বাংলাদেশ অভিবাসন দফতরের মুখপাত্র দৈনিক বাংলাকে জানিয়েছেন, আপাতত দেশে যে পরিমাণ খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে, তাতে কোনও রকম অসুবিধা হবার কথা নয়। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় খাদ্যশস্য ও ত্রাণ সামগ্রী পাঠানোর জন্য ট্রাক পাওয়া যাচ্ছে না।

১৯৭২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারির পত্রিকাবঙ্গবন্ধুর বাণী

পাকিস্তানে বাঙালি নির্যাতন চলছে, এই মর্মে বঙ্গবন্ধুর বিশেষ বাণী নিয়ে জাতিসংঘের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল পল মার্ক হেনরি জাতিসংঘের সদর দফতরে যান। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে তিনি আকস্মিকভাবে জাতিসংঘের সদর দফতরে যান। এটি ছিল নিউইয়র্কে তার অনির্ধারিত সফর। অনুমান করা হচ্ছে, জাতিসংঘ সেক্রেটারি জেনারেলের কাছে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর বাণী তিনি বয়ে নিয়ে যান। বাসস তাদের নিজস্ব খবরে প্রকাশ করে, বঙ্গবন্ধু কী বিষয়ে বার্তা দিয়েছিলেন তা বিস্তারিত জানা যায়নি। তবে পাকিস্তানে বসবাসকারী বাঙালিদের ওপর যে নির্যাতন চালানো হচ্ছিল, তা বন্ধ করার জন্য অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করতে বঙ্গবন্ধুর এই চিঠিতে অনুরোধ ছিল বলে অনুমান করা হয়।

স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারীরা এক মাসের বেতন পাবেন বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু এক বিবৃতিতে জানান, যেসব সরকারি ও আধা সরকারি কর্মচারী স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন, তারা এক মাসের বেতন পাবেন এবং তাদের চাকরির ধারাবাহিকতা থাকবে।

রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে বঙ্গবন্ধুর বাণী

পাকিস্তানে বাঙালিদের ওপর নির্যাতন বন্ধে সেদেশের সরকারের ওপর প্রভাব খাটানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিভিন্ন দেশের সরকার প্রধানের কাছে আবেদন জানান। বাসসের খবরে প্রকাশ, ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ এক বার্তায় বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রতি ঘণ্টায় পাকিস্তানে বাঙালিদের ওপর হত্যা ও নির্যাতনের খবর আসছে। সর্বশেষ খবরে জানা গেছে যে, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারীসহ আরও বহু বাঙালিকে অজ্ঞাত বন্দি শিবিরে বলপূর্বক আটকে রাখা হয়েছে।’ বঙ্গবন্ধু তাঁর বার্তায় বলেন, ‘বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের জানমালের সবরকম নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়েছে। আপনারা অবিলম্বে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলে আমি কৃতজ্ঞ হবো।’

১৯৭২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারির পত্রিকা

পররাষ্ট্রনীতি হবে জোট-নিরপেক্ষ

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরই জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি জোট নিরপেক্ষ হবে। তিনি আবারও ফেব্রুয়ারি মাসে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘তাঁর সরকার জোট নিরপেক্ষ নীতিই অবলম্বন করছে।’

শেখ মুজিব বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সোভিয়েত সরকার ও জনগণ যে মূল্যবান সমর্থন দিয়েছে, বাংলাদেশের জনগণ ও নেতারা সেজন্য তাদের প্রতি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।’ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে নস্যাৎ করতে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর ষড়যন্ত্র বানচালের ব্যাপারে সোভিয়েত প্রতিনিধি যে ভূমিকা পালন করেন, প্রধানমন্ত্রী তার জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, ‘নিপীড়িত জাতিগুলোর মুক্তির জন্য তাঁর সরকার সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অন্যান্য শান্তিপ্রিয় দেশের সঙ্গে একযোগে সংগ্রাম করে যাবে।’ শেখ মুজিব বলেন, ‘তাঁর রাশিয়া সফর দুই দেশের নেতাদের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় বিশেষ সহায়ক হবে।’

দেশে ফিরেছে ৮৭ লাখ শরণার্থী

এ যাবত ৮৭ লাখ শরণার্থী দেশে ফিরেছে। ঢাকায় জাতিসংঘ মহল থেকে জানা গেছে যে, হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতন চলাকালে বাংলাদেশ থেকে যে ৯৮ লাখ ৯৮ হাজার ৮৪৩ জন শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের মধ্যে ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮৭ লাখ ৭ হাজার ১৮ জন বাংলাদেশে ফিরেছে। সূত্র আরও  জানায়, ভারতে নাম রেজিস্ট্রি করা শরণার্থীদের মধ্যে অবশিষ্ট ১১ লাখ ৯২ হাজার ২৮৭ জন শরণার্থীও শিগগিরই দেশে ফিরে আসবে।

 

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ