‘মরার আগে দেশে ফিরতে পারবো তো’

Send
চৌধুরী আকবর হোসেন
প্রকাশিত : ১৭:২৮, জুলাই ০৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:২৮, জুলাই ০৫, ২০২০

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মালায়েশিয়া প্রবাসী জালাল সরকার৫৬ বছর বয়সী জালাল সরকার ২৬ বছরে ধরে মালয়েশিয়ায় আছেন। ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে এখন তিনি হাসপাতালে। অসুস্থতার এই সময়ে তার পাশে কেউ নেই। করোনা মহামারির কারণে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ থাকায় দেশে ফিরতে পারছেন না। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাই কমিশনের উদ্যোগে কয়েকটি বিশেষ ফ্লাইট পরিচালিত হলেও সেই ফ্লাইটে ফেরার সুযোগ পাননি তিনি। গত তিন মাস ধরে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন জালাল। এদিকে কুমিল্লার দাউকান্দিতে পরিবার তার পথ চেয়ে বসে আছে।

শনিবার (৪ জুলাই) যোগাযোগ করা হলে দেশে ফেরার কথা শুনে কাঁদতে থাকা জালাল সরকার বলেন, ‘মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে কিছু বিশেষ ফ্লাইট গেলেও সেই ফ্লাইটে দেশে আসার সুযোগ পাইনি। দেশে ফেরার অধিকারও কি প্রবাসীদের নেই। জানি না মরার আগে দেশে ফিরতে পারবো তো! মৃত্যুর জন্য দিন গুনছি। বেঁচে থাকতে যেহেতু দেশে নিচ্ছে না, তাহলে আমার লাশ দেশে নেবে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ মানবিক দৃষ্টিতে দেশে ফেরার সুযোগ করে দিন।’

মালয়েশিয়া প্রবাসীরা জানিয়েছেন, করোনার কারণে অনেক প্রবাসী কাজ হারিয়ে বেকার। আর্থিক সংকটে থাকায় খাওয়া খরচ জোগানোও সম্ভব হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে অনেকেই দেশ থেকে টাকা এনে খাওয়ার খরচ চালাচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি সংকটে আছেন যারা অসুস্থ। কর্মহীন হয়ে মালয়েশিয়ায় ব্যয়বহুল চিকিৎসা খরচ জোগাতে না পারায় দেশে ফিরতে চান তারা। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাই কমিশনের উদ্যোগে কয়েকটি বিশেষ ফ্লাইট পরিচালিত হলেও অসুস্থদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন প্রবাসীরা। অসুস্থদের জন্য বিশেষ ফ্লাইটের ব্যবস্থা করতে দূতাবাসে যোগাযোগ করেও কোনও সহায়তা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ তাদের।

নোয়াখালীর সাজ্জাদ খান চার ভাইয়ের মধ্যে সবার বড়। দুই বছর আগে পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় আসেন মালয়েশিয়ায়। তিনিও দিন গুনছেন দেশে ফেরার। গত দেড় মাস ধরে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন সাজ্জাদ খান। মালয়েশিয়ায় চিকিৎসকরা জানিয়েছেন ব্রেন ও হৃদরোগে আক্রান্ত তিনি। চাকরি না হারালেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে কাজে যেতে পারছেন না। অন্যদিকে মালয়েশিয়ায় চিকিৎসা খরচ বেশি হওয়ায় সেখানে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না সাজ্জাদ খানের। পরিবারকে টাকা পাঠাতে তো পারছেনই না, উল্টো ওষুধ ও খাওয়া খরচের টাকা দেশ থেকে এনেছেন। ২০ হাজার টাকা আনিয়েছিলেন যা এখন শেষের পথে।

সাজ্জাদ খান বলেন, ‘আমার অবস্থা খুবই খারাপ। ডাক্তাররা বলছেন ছয় হাজার মালয়েশিয়ান রিঙ্গিতেরও বেশি লাগবে চিকিৎসা করতে। এখানে থাকতে অনেক কষ্ট হচ্ছে, কাজ করতে পারি না। মনে হয় এখানেই মরে যাবো। দেশে ফিরলে তাড়াতাড়ি চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হতো। দেশে যে ফিরবো, সেই টাকাটাও নেই, বাড়ি থেকে টাকা এনে ফিরতে হবে।’

নরসিংদী জেলার রায়পুরার ছাফির উদ্দিন ১৩ বছর ধরে আছেন মালয়েশিয়ায়। ৪৪ বছর বয়সী এই প্রবাসী মে মাসে জানতে পারেন গলায় ক্যানসার হয়েছে। গলা ব্লক হয়ে খাওয়ার সমস্যাসহ শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। করোনার কারণে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ হওয়ায় দেশে ফিরতে পারছেন না তিনি।

ছাফির উদ্দিনের ছেলে মো. মুরসালিনও মালয়েশিয়া প্রবাসী। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আব্বুর গলায় ক্যানসার হয়েছে। ঠিকমতো খেতে পারেন না। মালয়েশিয়ার হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম এখন আপাতত শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করেছে। এখন হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দিয়েছে। সেখানে চিকিৎসা করালে প্রায় ২০ লাখ টাকা লাগবে। তাই আপাতত একটি সেবাকেন্দ্রে আব্বুকে রেখেছি, ওখানেও এক লাখ ৬০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে। এত টাকা খরচ করে সেখানে চিকিৎসা নেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব না। আমার বাবাকে বাঁচাতে দেশে পাঠানো খুবই জরুরি।’

মুরসালিন আরও বলেন, ‘লকডাউনের কারণে এখন তো হাইকমিশনে যাওয়া সম্ভব না। মেইলের মাধ্যমে জানানো হয়েছে এবং হাইকমিশনের ফেসবুক পেজে মেসেজ দিয়েছি। কর্মকর্তাদের হোয়াটসঅ্যাপে জানানো হয়েছে। ফার্স্ট সেক্রেটারি রুহুল আমিনের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে। হাইকমিশন বলছে, রেগুলার ফ্লাইট চালু হলে যেতে পারবে। আমরাও জানি রেগুলার ফ্লাইট চালু হলে যেতে পারবো, সেজন্য তো হাইকমিশনের দরকার নাই। বিশেষ ফ্লাইটে যাওয়ার বিষয়ে কোনও সহায়তা পাইনি।’

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের হেড শরিফুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কাজ ও থাকার পরিবেশ উন্নত না হওয়ায় প্রবাসীদের অসুস্থ হওয়ার হার বেশি। যারা অসুস্থ তারা দেশে ফিরেও যেন নিশ্চিতভাবে চিকিৎসার সুযোগ পান সেটি নিশ্চিত করা উচিত। যারা দেশে ফিরতে পারছেন না, তাদের জন্য দূতাবাস ও কমিউনিটির উদ্যোগে চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।’

এদিকে এই বিষয়ে জানতে গত কয়েকদিন ধরে মালয়েশিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করা হলেও তাদের কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

/সিএ/এনএস/এমএমজে/

লাইভ

টপ