লঞ্চডুবি: দুর্ঘটনা রোধে সুপারিশ বাস্তবায়ন শুরু

Send
শফিকুল ইসলাম
প্রকাশিত : ১২:০০, জুলাই ১৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:১৭, জুলাই ১৬, ২০২০

বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবিবুড়িগঙ্গায় ‘মর্নিং বার্ড’ নামে লঞ্চডুবির ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির দেওয়া ২০ দফা সুপারিশ বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থাগুলো। ইতোমধ্যেই তদন্ত কমিটির প্রথম সুপারিশ অনুযায়ী, সদরঘাট হতে ভাটিতে ৭/৮ কিলোমিটার এবং উজানে ৩/৪ কিলোমিটার না হলেও সদরঘাট সংলগ্ন এলাকায় লঞ্চগুলোর অলস বার্দিং উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই এলাকায় এখন পন্টুন ছাড়া নৌযানের নোঙর বন্ধ করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, সদরঘাটের উল্টোদিকে বুড়িগঙ্গার পাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠা শিপইয়ার্ড ও ডকইয়ার্ড উঠিয়ে দেওয়ার জন্য অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। শিপইয়ার্ড ও ডকইয়ার্ড মালিকদেরকে তাদের স্থাপনা সরিয়ে নিতে সময় দেওয়া হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ’র সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, তদন্ত কমিটির সুপারিশগুলো স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও নৌ পরিবহন অধিদফতরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থেকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে কাজ করেছে বলে মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে।

জানা গেছে, সুপারিশগুলোর মধ্যে কিছু সুপারিশ রয়েছে, যা আগে থেকেই বাস্তবায়নের কাজ চলছে। এখন সেগুলো অতি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য নতুন করে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেসব সুপারিশ বাস্তবায়নের সঙ্গে অর্থের সম্পর্ক রয়েছে, সেগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনে এর জন্য পৃথক প্রকল্প তৈরির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এসব সুপারিশ মধ্যমেয়াদি কাঠামোতে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে থাকা সুপারিশ, যেগুলো বাস্তবায়নে পৃথক মন্ত্রণালয় বা সংস্থার সহযোগিতা এবং বেশি অর্থের প্রয়োজন, সেগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় রাখার কথা বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহম্মদ মেজবাহউদ্দিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইতোমধ্যে আমরা সুপারিশগুলো ক্যাটাগরি অনুযায়ী ভাগ করে মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থাগুলোর কাছে পাঠিয়েছি। সংস্থাগুলো কাজও শুরু করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যে সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব সেগুলো অতি অল্প সময়ের মধ্যেই বাস্তবায়ন হবে। কিছু সুপারিশ রয়েছে যেগুলো বাস্তবায়নের সঙ্গে অর্থ ও সময় জড়িত, সেগুলো বাস্তবায়নে কিছুটা সময় হয়তো লাগবে। তবে পড়ে থাকবে না। আমরা কাজ শুরু করছি।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, সদরঘাট টার্মিনালের আশপাশ থেকে খেয়াঘাট সরিয়ে তা ওয়াইজঘাটের উজানে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করেছে বিআইডব্লিউটিএ। এছাড়া লঞ্চের সামনে ও পেছনে, মাস্টার ব্রিজ, ইঞ্জিন রুম, ডেকে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর জন্য প্রত্যেক লঞ্চ মালিককে নোটিশ দেওয়ার কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানা গেছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে দেশের প্রতিটি লঞ্চ মালিকের কাছে এ নোটিশ পৌঁছে যাবে বলে মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে।

সূত্র জানায়, লঞ্চের মাস্টারদের দেখার সুবিধার জন্য লঞ্চের পেছনে ব্যাক ক্যামেরা ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়টিও তাদের (লঞ্চ মালিক) জানানো হয়েছে। লঞ্চ মালিকরা তা জেনেছেন এবং ব্যাক ক্যমেরা লাগানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অনেক লঞ্চেই ওয়াকিটকি সিস্টেম চালু রয়েছে, কিন্তু যেগুলোতে নেই, সেগুলোতেও অতিদ্রুত ওয়াকিটকি সিস্টেম চালু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, লঞ্চ বা জাহাজ ঘাট ত্যাগ করার আগেই ঘাটে ডিক্লারেশন দাখিল বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি বাস্তবায়নে কাজ চলছে। লঞ্চে কত জন যাত্রী বহন করা হচ্ছে, ডেকে এবং ইঞ্জিনে কারা কারা কর্মরত আছেন—তা ডিক্লারেশনে উল্লেখ থাকার বিষয়টি নৌপরিবহন অধিদফতর দেখভাল করবে। এছাড়া ফিটনেসবিহীন লঞ্চ চলাচল বন্ধ করা এবং প্রত্যেক লঞ্চে জীবন রক্ষাকারী লাইফ জ্যাকেট ও বয়া রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করতে কিছুটা সময় লাগবে। এগুলোকে মধ্যমেয়াদি কাঠামোতে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।

সব নদীপথে বিভিন্ন নৌযানের স্পিড লিমিট নির্ধারণ করে দেওয়ার বিষয়টি আলোচনা সাপেক্ষে সমাধান করা সম্ভব। সদরঘাটে স্পিড কন্ট্রোল করার জন্য টাওয়ার স্থাপন ও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের সুপারিশ বাস্তবায়নের সঙ্গে অর্থের সম্পর্ক রয়েছে। লঞ্চে মেকানিক্যাল সিটিংয়ের পরিবর্তে ইলেক্ট্রো হাইড্রোলিক সিটিং প্রবর্তন করার বিষয়টিও অর্থের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে হয়তো কিছুটা সময় লাগবে এই সুপারিশ বাস্তবায়নে। একারণে মধ্যমেয়াদি কাঠামোতে রয়েছে এই সুপারিশগুলো। যাত্রীবাহী লঞ্চে মেইন ইঞ্জিন লোকাল কন্ট্রোল সিস্টেমের পরিবর্তে ব্রিজ কন্ট্রোল সিস্টেম পর্যায়ক্রমে চালুর কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করার বিষয়টিও আলোচনা সাপেক্ষে সমাধান সম্ভব। এগুলো অতি অল্প সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন সম্ভব বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, সানকেন ডেক লঞ্চ পর্যায়ক্রমে উঠিয়ে দিতে মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করবে মন্ত্রণালয়। তবে না ওঠা পর্যন্ত প্রশস্ত ও ব্যস্ত নদীতে এগুলোর চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এছাড়া যথাযথ সনদধারী মাস্টার ও ড্রাইভার ছাড়া নৌযান পরিচালনা করা এবং ডিসপেনসেশন সনদ গ্রহণের প্রথা বাতিল করার বিষয়টি আলোচনা সাপেক্ষ—তাই হয়তো এ সুপারিশ বাস্তবায়নে কিছুটা সময় লাগবে।

সূত্র জানিয়েছে, যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ করে শিশু, নারী ও বয়স্ক লোকদের ওঠানামার সুবিধার্থে গ্যাংওয়ে বা ব্রিজ স্থাপন করা, সদরঘাটে পন্টুনের সংখ্যা বাড়ানো, নৌপরিবহন অধিদফতরের সার্ভেয়ারের সংখ্যা ও লজিস্টিক সুবিধা বাড়ানো, নৌ-দুর্ঘটনা গবেষণার বিষয়ে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা, নৌ-ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন করা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যথাযথ লজিস্টিক সুবিধা দেওয়া, সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ পরিকল্পনা প্রণয়ন করার বিষয়ে অর্থের সম্পর্ক রয়েছে বিধায় এগুলো বাস্তবায়নে পৃথক পৃথক প্রকল্প নেওয়া যায় কিনা, তা বিচার বিশ্লেষণ করে উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়টি ভাবা হচ্ছে।

এছাড়া, নৌযানের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও পরিদর্শকদের পরিদর্শন কার্যক্রম জোরদার এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব। উৎসবসহ সব সময়ের জন্য প্রত্যেক লঞ্চে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত টিকিট বিক্রি বন্ধ করা, টিকিট প্রদর্শন ছাড়া যাত্রীকে লঞ্চে উঠতে না দেওয়া, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের সুযোগ বন্ধ করার জন্য কেবিন সংখ্যা ও ডেকযাত্রীর সংখ্যা নির্ধারণ করে দিয়ে সব টিকিট অনলাইনে বিক্রির ব্যবস্থা করার বিষয়টি মালিকদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার পর বাস্তবায়ন সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

এ প্রসঙ্গে বিআইডব্লিউটিএ’র যুগ্ম পরিচালক কে এম আরিফ উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা কাজ শুরু করেছি। ইতোমধ্যে অবৈধ ডকইয়ার্ড ও শিপইয়ার্ড তুলে দিতে অভিযান পরিচালনা করেছি। বুড়িগঙ্গায় লঞ্চগুলোর এলোমেলো নোঙর বন্ধ করা হয়েছে। বাকি কাজগুলোও পর্যায়ক্রমে করা হবে।’

লঞ্চ মালিক সংগঠনের সভাপতি মাহবুব উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘নৌপথে শৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনা রোধ করতে সরকারের যেকোনও উদ্যোগের সঙ্গে আমরা একমত। এ নিয়ে বিভ্রান্তির কোনও অবকাশ নাই। তদন্ত কমিটির সুপারিশগুলো দেখেছি। এরমধ্যে যেগুলো আমাদের পক্ষ থেকে বাস্তবায়নযোগ্য, সেগুলো আমরা নিজেরা বসে আলাপ-আলোচনা করে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই বাস্তবায়ন করবো।’

উল্লেখ্য, গত ২৯ জুন সকালে রাজধানীর শ্যামবাজার সংলগ্ন বুড়িগঙ্গা নদীতে ময়ূর-২ লঞ্চের ধাক্কায় ‘মর্নিং বার্ড’ নামে অপর একটি লঞ্চ ডুবে যায়। এই দুর্ঘটনায় ডুবে যাওয়া লঞ্চের ৩৪ যাত্রীর মৃত্যু ঘটে। পরবর্তীতে এই ঘটনা তদন্তে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব রফিকুল ইসলাম খানকে প্রধান করে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি লঞ্চ দুর্ঘটনা রোধে ২০ দফা সুপারিশ মন্ত্রণালয়ের কাছে পেশ করেছে। ইতোমধ্যে এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।

/এপিএইচ/এমএমজে/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ