কর্তৃত্ব ইস্যুতে আবারও ক্ষুব্ধ ইসির চার কমিশনার

Send
এমরান হোসাইন শেখ
প্রকাশিত : ০১:১৬, আগস্ট ১১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:২০, আগস্ট ১১, ২০২০

নির্বাচন কমিশনকমিশন সচিবালয়ের কর্তৃত্ব ও এখতিয়ার প্রতিষ্ঠা নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও ইসি সচিবের ওপর আবারও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চার নির্বাচন কমিশনার। কমিশনের আইন সংস্কার কমিটিকে পাশ কাটিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নির্বাচন আইনের খসড়া অনুমোদনের জন্য তোলার ইস্যুকে কেন্দ্র করে কমিশনাররা এই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। খসড়া আইনে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদের দীর্ঘদিনের প্রচলিত নাম ও পদবি পরিবর্তন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তারা। এছাড়া তাদের না জানিয়ে কেন্দ্রীয় ও মাঠ প্রশাসনের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাকে বদলি করায়ও উষ্মা প্রকাশ করেন।

সোমবার (১০ আগস্ট) আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে কমিশনের ৬৭তম সভায় চার কমিশনার ক্ষোভ প্রকাশ করেন বলে ওই বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছেন।

এর আগে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রাজনীতি দলের নিবন্ধনের বিধানের অংশটুকু আদেশ থেকে বাদ দিয়ে 'রাজনীতি দলসমুহের নিবন্ধন আইন ২০২০' নামে যে আলাদা নতুন খসড়া আইনের অনুমোদন করা হয়েছে সেটাও চার কমিশনার এবং আইন সংস্কার কমিটিকে বাইপাস করে করা হয়। গত ১ জুন কমিশন সভায় অনুমোদন দেওয়া এ খসড়া আইনটি নিয়ে চার কমিশনারের ক্ষোভ ছিল। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ বিএনপিসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দল এই আইনটির বিরোধিতা করেছে।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সভায় ‘স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নির্বাচন আইন-২০২০’ এর খসড়া অনুমোদনের বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী তার ক্ষোভের কথা জানান। এরপর অনেকটাই একই সুরে বক্তব্য দেন নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম, মো. রফিকুল ইসলাম ও মাহবুব তালুকদার। তারা বলেন, আইনের খসড়ার কপি আগে নির্বাচন কমিশনারদেরও দেওয়া হয়নি। সরাসরি অনুমোদনের জন্য সভায় তোলা হয়েছে। কমিশন সচিবালয়ের ওপর নির্বাচন কমিশনারদের নিয়ন্ত্রণ নেই বলেও মন্তব্য করেন কেউ কেউ। সভায় কথা কাটাকাটি ও উচ্চ স্বরেও বক্তব্য রাখেন কোনও কোনও কমিশনার।

বৈঠকে কমিশনার শাহাদাত হোসেন চৌধুরী সভায় বলেন, ‘কমিশন সচিবালয় ও সচিবের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। খসড়া আইনে কমিশনের ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে। আমরা কমিশন সচিবালয়ের ওপরই নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারছি না। অন্যদের ওপর কিভাবে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করবো?’

খসড়া আইনে সিটি করপোরেশনের নাম বদলে ‘মহানগর সভা’, পৌরসভার নাম ‘নগরসভা’ ও ইউনিয়ন পরিষদের নাম ‘পল্লী পরিষদ’ রাখা হয়েছে। প্রচলিত শব্দ পরিবর্তন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন কমিশনার শাহাদাত হোসেন।

আইন সংস্কার কমিটিকে পাশ কাটিয়ে স্থানীয় সরকার আইনের খসড়া করায় সভায় উস্মা প্রকাশ করেন আইন সংস্কার কমিটির প্রধান কবিতা খানম। আর আইন মন্ত্রণালয়ে ভোটিংয়ের জন্য পাঠানো গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (আরপিও) সংশোধনের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত আসার আগে নতুন আইন প্রণয়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম।

তিনি বলেন, ‘আরপিওতে প্রচলিত ইংরেজি শব্দের পরিবর্তন এনে বাংলা শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত না পাওয়া পর্যন্ত আরেকটি আইনে কেনও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে খসড়া তৈরি করছি। সরকার আরপিও সংশোধন অনুমোদন না দিলে এটিও দেবে না। এতে পুরোটাই পণ্ডশ্রম হবে।’

নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার সভায় বাংলা একাডেমির অভিধান দেখিয়ে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নাম ও পদবি প্রচলিত ইংরেজি। এর অনেক বাংলা শব্দ দুর্বোধ্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করা হলে বিদ্যমান সব আইন সংশোধন আনতে হবে। এতে সরকারের অর্থ অপচয় হবে।’

এদিকে গত বছর ১১ ডিসেম্বর কমিশনের ৫৬তম সভায় ইসি সচিবালয়ে নিম্নতর গ্রেডের কর্মচারী নিয়োগ ইস্যুতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং কমিশন সচিবালয়ের একক কর্তৃত্বের অভিযোগ তুলে চার কমিশনার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন। ওই নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে চার কমিশনার পৃথক ‌‌‌ইউও নোট দিলেও ওই সময় তার কোনও সুরাহা হয়নি। তার আগে চার কমিশনারের বিভিন্ন ইস্যুতে একক বা যৌথভাবে 'ইউও নোট' এবং কমিশনের সিদ্ধান্তের ওপর নোট অব ডিসেন্ট দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে দ্বিমত পোষণ করে কোনও কোনও কমিশনার গণমাধ্যমকে ডেকে প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করেছেন।

কমিশন সচিবালয়ের নোটিশ অনুযায়ী শনিবারের (৮ আগস্ট) মিটিংয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নির্বাচন আইন ২০২০ এর খসড়া অনুমোদনের জন্য তোলা হয়। তবে চার কমিশনারের বিরোধিতার মুখে তা অনুমোদন দেওয়া হয়নি। এটি পর্যালোচনা করে পরবর্তী বৈঠকে অনুমোদনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

কমিশন সভায় চার কমিশনারে ক্ষোভ প্রকাশের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনারগণ কিছু বিষয়ে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু সুনির্দিষ্ট বিষয়ে তারা বলেননি। তারা নির্দিষ্ট বিষয়ে বক্তব্য রাখলে তার জবাব দেওয়া যেত।’

আইন সংস্কার কমিটিকে পাশ কাটিয়ে নতুন আইনের খসড়া অনুমোদনের জন্য তোলার বিষয়ে সচিব বলেন, ‘কমিশনারদের জানানোর জন্যই কমিশন সভায় আইনের খসড়া তোলা হয়েছে। এখন তারা নির্দেশনা দেবেন সেই অনুযায়ি কাজ হবে।’



চার কমিশনারদের প্রশ্নের জবাবে যুক্তি খণ্ডন করে সিইসি কে এম নূরুল হুদা বলেন, ‘পঞ্চায়েত থেকে ইউনিয়ন পরিষদ এসেছে। তখনও নাম পরিবর্তন হওয়ায় সবাই তা মেনে নিয়েছে। এখনও মেনে নেবে। বাংলা ভাষা আন্তর্জাাতিক ভাষার মর্যাদা পেয়েছে।’

ইসির সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর কমিশনারদের ক্ষোভের প্রেক্ষিতে বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী যেসব ফাইল কমিশনের অনুমোদন করার কথা সেগুলো কমিশনে পাঠানো হয়। এমনকি যেসব ফাইল সচিব পর্যায়ে অনুমোদন দেওয়ার কথা সেসব ফাইলের অনেক কিছুই কমিশনে পাঠানো হয়।’

বৈঠক শেষে ইসি সচিব আইনের খসড়ার বিষয়ে বলেন, ‘খসড়া কমিশন সভায় উপস্থাপন করা হয়েছে। আগামী ২৩ ও ২৪ তারিখে কমিশন সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে কমিশনের মতামতের ভিত্তিতে এটি তৈরি করে ওয়েবসাইটসহ বিভিন্ন মহলে মতামতের জন্য পাঠানো হবে।’

/এনএস/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ