দেশে করোনার সংক্রমণ আগের মতোই

Send
সাদ্দিফ অভি
প্রকাশিত : ১৩:০০, আগস্ট ১২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:০৩, আগস্ট ১২, ২০২০

করোনাভাইরাসনমুনা সংগ্রহ যা-ই হোক, কিংবা পরীক্ষা যে পরিমাণেই হোক না কেন, দেশে করোনা শনাক্তের হার আগের মতোই রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তের হার ২০ দশমিক ৪৬ শতাংশ। বিগত চার মাসের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তের হার ২০-২৫ শতাংশের মধ্যেই আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকোপ কমেছে কিন্তু সংক্রমণ কমেনি। টেস্ট যা-ই হোক ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তের হার স্থিতিশীল

স্বাস্থ্য অধিদফতরের দেওয়া তথ্য মতে, ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত শনাক্তের হার ছিল ১১ দশমিক ৮৫। আর সেদিন ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হার ছিল ১১ দশমিক ৩৫। এরপর ১৫ মে পর্যন্ত শনাক্তের হার ছিল ১২ দশমিক ৫০, ২০ মে-তে শনাক্তের হার দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ১১।

২৬ মে থেকে স্বাস্থ্য অধিদফতর আনুষ্ঠানিকভাবে ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তের হার প্রকাশ করা শুরু করে। এদিন ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তের হার ছিল ২১ দশমিক ৫৬ শতাংশ। আর হিসাব করে দেখা গেছে, ওই দিন পর্যন্ত মোট শনাক্তের হার ছিল ১৪ দশমিক ২২। ৩১ মে শনাক্তের হার ছিল ২১ দশমিক ৪৩ শতাংশ, ৩০ জুন শনাক্তের হার ছিল ১৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ, ৩০ জুলাই ২০ দশমিক ৮৩ শতাংশ। বিগত ৪ মাসের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, শনাক্তের হার ২০-২৫ শতাংশের মধ্যেই আছে। শুধুমাত্র গত ৩ আগস্ট শনাক্তের হার ছিল রেকর্ড সংখ্যক ৩১ দশমিক ৯১ শতাংশ। দেশে ৮ মার্চ প্রথম করোনা শনাক্ত হওয়ার পর এ পর্যন্ত এটি ছিল সর্বোচ্চ শনাক্তের হার। স্বাস্থ্য অধিদফতরের দেওয়া তথ্য মতে, এ পর্যন্ত গড় শনাক্তের হার ২০ দশমিক ৪৬ শতাংশ।

দেশে করোনার বর্তমান পরিস্থিতি

দেশে এখন পর্যন্ত করোনার নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১২ লাখ ৮৭ হাজার ৯৮৮ জনের। এই পরীক্ষায় করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়েছেন ২ লাখ ৬৩ হাজার ৫০৩ জন। এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ৩ হাজার ৪৭১ জন এবং সুস্থ হয়েছেন এক লাখ ৫১ হাজার ৯৭২ জন। অর্থাৎ করোনা সক্রিয় রোগী আছেন বর্তমানে এক লাখ ৬ হাজার ৬৩২ জন।

গত ২ জুলাই দেশে সর্বোচ্চ সংখ্যক করোনা আক্রান্ত রোগী পাওয়া যায় ২৪ ঘণ্টায়। এদিন শনাক্তের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ১৯ জন। এরপর ধীরে ধীরে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা কমতে থাকে। ১৫ জুলাই শনাক্ত হয় ৩ হাজার ৫৫৩ জন। এরপর এ পর্যন্ত শুধুমাত্র ৩ দিন ৩ হাজারের ওপরে শনাক্ত হয়েছে। বাকি দিনগুলোতে শনাক্ত ৩ হাজারে নিচেই ছিল।

করোনা ডেডিকেটেড শয্যা খালি ৭৩ ভাগ

স্বাস্থ্য অধিদফতরের দেওয়া তথ্য মতে, ঢাকা মহানগরীতে করোনা ডেডিকেটেড সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে মোট সাধারণ শয্যা আছে ৭ হাজার ৫২টি। এতে ভর্তি রোগী আছেন ২ হাজার ১২৭ জন এবং শয্যা খালি আছে ৪ হাজার ৯২৫টি। ঢাকা মহানগরীতে আইসিইউ শয্যা আছে ৩০৫টি। বর্তমানে রোগী ভর্তি আছেন ২০২ জন এবং খালি আছে ১০৩টি বেড। সারাদেশে সাধারণ শয্যা আছে ১৫ হাজার ২৬৮টি। বর্তমানে রোগী ভর্তি আছেন ৪ হাজার ১২১ জন এবং খালি আছে ১১ হাজার ১৪৭টি শয্যা। সারাদেশে আইসিউ’র সংখ্যা ৫৪৩টি। এতে ভর্তি আছেন ৩১৩ জন রোগী এবং খালি আছে ২৩০টি।

হিসাব করে দেখা যায়, ঢাকা মহানগরীর ৬৯ দশমিক ৮৩ ভাগ সাধারণ শয্যা এবং ৩৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ আইসিইউ খালি আছে। আর সারাদেশের ৭৩ ভাগ সাধারণ শয্যা এবং ৪২ দশমিক ৩৫ শতাংশ আইসিইউ খালি পড়ে আছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনার প্রকোপ কমেছে, কিন্তু সংক্রমণ এখনও কমেনি। তাছাড়া হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা না থাকায় শয্যা খালি থাকছে বলে মনে করেন তারা।

করোনা বিষয়ক সরকারের পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজরি কমিটির সদস্য ডা. আবু জামিল ফয়সাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সংক্রমণ কিন্তু চলছে। আমরা যদি মনে করি, সংক্রমণ থেমে গেছে তাহলে সেটা ভুল হবে। তবে যেভাবে প্রকোপ ছিল সেটা হয়তো থিতিয়ে পড়েছে। তাই বলে সংক্রমণ কিন্তু কমছে না। আমরা সংক্রমণ কমানোর জন্য কোনও কাজও করছি না। বরং ঢাকা, চট্টগ্রামের মতো বড় শহর ছেড়ে সংক্রমণ এখন ছোট শহরের দিকে গেছে। সংক্রমণ রোধের জন্য কেউ কোনও কিছু করছে না। সংক্রমণ চলছে, তবে বাড়তির দিকে নেই। সংক্রমণের মাত্রা ২০-২৫ শতাংশের মধ্যেই আছে, এটা যদি কমতে শুরু করতো তাহলে একটা কথা ছিল।’

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘শনাক্তের হার জুন-জুলাই-আগস্ট একই রকম আছে। বড় বড় শহরে কিছু কমেছে জুলাইয়ের দিকে, কিন্তু একই অনুপাতে গ্রামাঞ্চলে সংক্রমণ বেড়েছে। কাজেই সংখ্যাগত হেরফের খুব একটা হয়নি। তবে কোরবানির ঈদের পর একটি ধীরগতির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখছি। আমরা যদি প্রত্যেক রোগীকে শনাক্ত করতে পারি এবং আইসোলেশন নিশ্চিত করতে পারি এবং আইসোলেশন হতে হবে সরকারি প্রতিষ্ঠানে। প্রান্তিক মানুষের পক্ষে অসম্ভব নিজে নিজে আইসোলেশনে থাকা। তাদের জীবন জীবিকা নিশ্চিত করেই কাজ করতে হবে, তা না-হলে রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলে আমরা বিপদে পড়বো। জনগণকে সম্পৃক্ত করে স্বাস্থ্যবিধি পালন করতে হবে এবং ঘরে ঘরে গিয়ে অবশ্যই করোনা রোগী শনাক্ত করতে হবে। যদি সেটা করা না যায়, তাহলে লক্ষণ উপসর্গ দেখা মাত্রই কমিউনিটি কোয়ারেন্টিন সেন্টার এবং আইসোলেশন সেন্টার করে তাদের সেখানে রাখতে হবে। এভাবেই একমাসের মধ্যে সংক্রমণ কমানো সম্ভব।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য এবং করোনা বিষয়ক জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা এখনও শুধুমাত্র লক্ষণ উপসর্গ দেখে পরীক্ষা করছি। তাতে কিন্তু উপসর্গ ছাড়া যারা আক্রান্ত তারা বাদ পড়ছেন। আইইডিসিআরের জরিপ বলছে, ঢাকা শহরে শতকরা ৯ শতাংশ লক্ষণ ছাড়াই পজিটিভ। তাতে বুঝা যাচ্ছে যে আমাদের ব্যক্তিগত সুরক্ষায় খুব বেশি জোর দিতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের শনাক্তের হার কিন্তু কমেনি। ২১ এর নিচে কোনোদিন নামেনি। ধরাই যায় আমাদের গড় শনাক্ত ২০ থেকে ২২। এটাকে কীভাবে কম বলা যাবে।’

হাসপাতালের চিকিৎসা প্রসঙ্গে ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘হাসপাতালে রোগী যাচ্ছে না। আমরা চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর অনাস্থা সৃষ্টি করেছি। করোনা টেস্ট ছাড়া রোগী ভর্তি করাইনি। এসব করে আমরা মানুষকে অনেক অপদস্থ করেছি, তাদের জন্য অনেক ভোগান্তি তৈরি করেছি। যার কারণে মানুষ এখন হাসপাতাল বিমুখ হয়ে গেছে। যার ফলে এখন খালি বেড বেশি। হাসপাতাল ব্যবস্থা যতই ভালো করা হোক, রোগী যাবে না, কারণ হাসপাতালে তাদের আস্থা নেই।’

/এপিএইচ/এমএমজে/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ